জ্বালানি তেল বিক্রিতে নতুন সীমা, রফতানি খাতে শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে

2026-03-12T02:25:47+00:00
2026-03-12T02:25:47+00:00
 
  রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬,
১১ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
জ্বালানি তেল বিক্রিতে নতুন সীমা, রফতানি খাতে শঙ্কা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২৬, ২:২৫ এএম 
সংগৃহীত ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় দেশে জ্বালানি তেল বিক্রিতে নতুন সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ অনিশ্চয়তার প্রভাবে বাংলাদেশের রফতানি খাতেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে কিছু আন্তর্জাতিক ক্রেতা নতুন ক্রয়াদেশ স্থগিত বা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন রফতানিকারকরা।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে অকটেন ও পেট্রোল বিক্রির পূর্বে ঘোষিত ২৫ শতাংশ কমানোর পরিবর্তে এখন ১৫ শতাংশ কমিয়ে সরবরাহ করা হবে। বুধবার জারি করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। বিপিসি বলেছে, নির্ধারিত বরাদ্দ অনুযায়ী ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিপণন কোম্পানির ডিপো সুপার, বিক্রয় কর্মকর্তা এবং ডিলার-এজেন্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় দেশে জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য ব্যাংকগুলোকে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেল ব্যবহারে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বুধবার জারি করা এক সার্কুলারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী নীতি অনুসরণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এ কারণে ব্যাংকগুলোর প্রধান কার্যালয়, শাখা, উপশাখা ও অন্যান্য অফিসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে মিতব্যয়িতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়, অফিসের ভেতরে বৈদ্যুতিক বাতি, ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনারসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে এবং প্রয়োজন না হলে বন্ধ রাখতে হবে। এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা যাবে না।

এ ছাড়া যানবাহনের জ্বালানি খরচ কমাতে ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার এবং সম্ভব হলে শেয়ারিং ব্যবস্থা অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত সীমিত রাখারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক ভবনের আলোকসজ্জা ও ডিজিটাল বোর্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত সময়সূচি অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজধানীতে ব্যবহৃত ব্যক্তিগত গাড়ির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যাংকারদের। এই খাতে জ্বালানি ব্যবহার কমানো গেলে সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবহারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এদিকে দেশজুড়ে জ্বালানি তেল সরবরাহে রেশনিং ব্যবস্থা চালুর পর পেট্রোল পাম্পগুলোতেও অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। পাম্প মালিকরা অভিযোগ করেছেন, সরকার একদিকে দেশে পর্যাপ্ত তেলের মজুদ থাকার কথা বলছে, অন্যদিকে বিক্রিতে সীমা নির্ধারণ করছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

বুধবার রাজধানীর সিদ্বেশ্বরী সার্কুলার রোডে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ায় মানুষ আতঙ্কে পাম্পে ভিড় করছেন। অনেকেই গাড়ির ট্যাঙ্ক পূর্ণ করে রাখার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। এতে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানে পাম্পে তেল সরবরাহ কমে যাওয়ায় উত্তেজনা বাড়ছে এবং কোথাও কোথাও হামলার ঘটনাও ঘটেছে। সম্প্রতি সুনামগঞ্জে এক পাম্প কর্মচারীকে ছুরিকাঘাতের ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করা হয়।

পাম্প মালিকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের বিক্রির তুলনায় ১০ শতাংশ কম সরবরাহ দেওয়ার নির্দেশ থাকলেও বাস্তবে তার চেয়েও বেশি কম দেওয়া হচ্ছে। অথচ এই সময়ে যানবাহনের সংখ্যা এবং তেলের ব্যবহার প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিটি পাম্পে পুলিশের পাশাপাশি সেনা সদস্য মোতায়েনসহ আট দফা দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পাম্প পরিচালনা বন্ধ রাখার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।

রফতানি খাতে বাড়ছে উদ্বেগ : মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বাড়ায় বাংলাদেশের প্রধান রফতানি বাজারগুলোতে ভোক্তাদের ব্যয় আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন রফতানিকারকরা। তাদের মতে, জ্বালানি, খাদ্য ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে মানুষ পোশাকের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় নয় এমন পণ্যে কম ব্যয় করবেন।

বাংলাদেশের নিট পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পর রফতানি আদেশ বাড়বে বলে উদ্যোক্তারা আশা করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। তিনি জানান, কিছু ক্রেতা ইতিমধ্যে প্রি-অর্ডার নিয়ে আলোচনা স্থগিত করেছেন। পণ্য পরিবহনে সময় বেশি লাগছে এবং চার্জও বেড়েছে।

পাটজাত পণ্য ও লাইফস্টাইল পণ্যের রফতানিকারক ক্রিয়েশন্স প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাশেদুল করিম মুন্না বলেন, জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক মেলায় অংশ নেওয়ার পর কিছু ক্রেতা নতুন অর্ডার নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে। তার ভাষায়, ইউরোপজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। ফলে ভোক্তারা এসব খাতে বেশি ব্যয় করছেন। এর ফলে আমাদের রফতানি হওয়া পণ্যের চাহিদা কমে যেতে পারে।

চামড়াজাত ও সিনথেটিক জুতাপণ্য রফতানিকারকরাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বেঙ্গল লেদার কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিপু সুলতান বলেন, এপ্রিল থেকে নতুন ক্রয়াদেশ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ক্রেতারা আপাতত আলোচনা স্থগিত করেছেন।

শিল্পমালিকরা বলছেন, হুরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহে ব্যাঘাত এবং দেশে জ্বালানি বিতরণে বিধিনিষেধের কারণে কিছু কারখানায় ডিজেলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিকেএমইএর পরিচালক মিনহাজুল হক বলেন, সংগঠনের কয়েকজন সদস্য ইতিমধ্যে ডিজেল সংগ্রহে সমস্যার কথা জানিয়েছেন। ডিজেল না পেলে অনেক কারখানার জেনারেটর চালানো কঠিন হয়ে পড়বে এবং তাতে রফতানির শিপমেন্ট বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

বাংলাদেশের শিল্পখাত মূলত গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অনেক কারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। শিল্প নেতাদের মতে, ডিজেল না পাওয়া গেলে বা এর দাম বেড়ে গেলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের রফতানিকারকদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা দুর্বল হবে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, টানা সাত মাস ধরে বাংলাদেশের রফতানি কমছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.১৫ শতাংশ কমেছে। শুধু ফেব্রুয়ারিতেই রফতানি কমেছে ১২ শতাংশের বেশি।

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   জ্বালানি  তেল  বিক্রি  নতুন  সীমা  রফতানি  শঙ্কা 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: