নেতৃত্বে কি আসবেন তারেক রহমান

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

মতামত

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। রাতের আঁধার তখনও পুরোপুরি কাটেনি। আমেরিকা আর ইসরাইলের যুদ্ধবিমান একসঙ্গে ঢুকে পড়ে ইরানের আকাশে। অপারেশন এপিক ফিউরি।

2026-03-13T02:44:53+00:00
2026-03-13T02:45:21+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬,
৪ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
হুরমুজে শান্তির পতাকা
নেতৃত্বে কি আসবেন তারেক রহমান
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬, ২:৪৪ এএম  আপডেট: ১৩.০৩.২০২৬ ২:৪৫ এএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। রাতের আঁধার তখনও পুরোপুরি কাটেনি। আমেরিকা আর ইসরাইলের যুদ্ধবিমান একসঙ্গে ঢুকে পড়ে ইরানের আকাশে। অপারেশন এপিক ফিউরি। মিসাইল আর বোমার আঘাতে ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলো একে একে ধুলো হয়ে যায়। সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি পৃথিবী থেকে মুছে যান। পরদিন সকালে বিশ্বের মানুষ যখন চোখ খুলল, তারা বুঝতে পারল, রাতের মধ্যে পৃথিবীটা বদলে গেছে।

কিন্তু সেই হামলার চেয়েও বড় ধাক্কা এলো কয়েক ঘণ্টার ভেতরেই। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড হুরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করে দিল। হুঁশিয়ারি দিল, যে জাহাজ পার হওয়ার চেষ্টা করবে তাকে ডুবিয়ে দেওয়া হবে। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে যেখানে দিনে একশরও বেশি জাহাজ এই সরু পথ পেরিয়ে যেত, মার্চের শুরুতে সেই পথ কার্যত মৃত।

আমি যখন এই লেখাটা লিখছি, তখন পৃথিবীর দৈনিক তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই একটিমাত্র পথে আটকে আছে। আটকে আছে বিশ্বের ৩১ শতাংশ সমুদ্রপথের অপরিশোধিত তেল। আটকে আছে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, যা বৈশ্বিক বাজারের পাঁচ ভাগের এক ভাগ। একটা সরু জলপথ বন্ধ হয়েছে, আর তাতে পুরো পৃথিবীর অর্থনীতি টলমল করছে। শেয়ারবাজার ধসছে। জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া। আজ বিশ্ববাণিজ্য এলোমেলো। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই যুদ্ধ থামবে কীভাবে? কে থামাবে? 

উত্তর দিতে গেলে বলতে হয়, কেউ জানে না। কারণ যে দেশগুলো অতীতে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে মধ্যস্থতার ভূমিকায় নেমেছিল, তারা আজ নিজেরাই আগুনের ভেতরে। কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র পড়েছে। সৌদি আরবে মার্কিন দূতাবাসে হামলা হয়েছে। যাদের ওপর ভরসা করে দুনিয়া এতদিন শান্তির কথা শুনেছে, তারা নিজেরাই আজ কোণঠাসা। মধ্যস্থতাকারীর যে চেয়ারটা এতদিন কাতার বা আমিরাত দখল করে রাখত, সেই চেয়ারটা আজ ফাঁকা পড়ে আছে।

ঠিক এই ফাঁকা চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে আমার মনে একটাই প্রশ্ন জাগছে। বাংলাদেশ কি এগিয়ে আসতে পারে না? প্রশ্নটা শুনে অনেকে হাসবেন, জানি। ভাববেন, বাংলাদেশ আবার মধ্যস্থতা করবে? আমরা তো নিজেদের সমস্যাই সামলাতে পারি না। কিন্তু একটু থামুন। এই হাসির জবাব দেওয়ার জন্য আমাকে কোনো কল্পনার আশ্রয় নিতে হবে না। ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই উত্তর মিলবে।

১৯৭৮ সাল, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্য পদের নির্বাচন। একপাশে দাঁড়িয়ে আছে জাপান, পঞ্চাশের দশক থেকে বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি। আরেকপাশে মাত্র সাত বছর বয়সি একটি ছোট্ট দেশ, বাংলাদেশ। ভোট হলো। ফল বেরোল। বাংলাদেশ জিতে গেল। পুরো বিশ্ব হতবাক। এই অবিশ্বাস্য বিজয়ের পেছনে ছিলেন একজন মানুষ। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশের সঙ্গে এমন গভীর বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন যে সেই দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। রাজা-বাদশাহদের কাছে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শুধু আরেক রাষ্ট্রনেতা ছিলেন না, ছিলেন এক বিশ্বাসযোগ্য বন্ধুর মুখ।

তারপর এলো ইরাক-ইরান যুদ্ধ, ১৯৮০ সাল। লাখ লাখ মানুষ মরছে। আরব দুনিয়া দুই ভাগ হয়ে গেছে। সেই ভয়াবহ সংকটেও বাংলাদেশ চুপ করে বসে থাকেনি। ওআইসির শান্তি কমিটিতে সক্রিয়ভাবে যোগ দিয়েছে। জাতিসংঘের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি আনার চেষ্টায় ভূমিকা রেখেছে। পরে জাতিসংঘের ইউএনআইআইএমওজি মিশনে বাংলাদেশি সেনারা মাঠে ছিলেন পর্যবেক্ষক হিসেবে, এক পর্যায়ে সেই মিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্বও পালন করেছে বাংলাদেশ। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নীতি ছিল পরিষ্কার। সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়। এই সহজ কথাটাই তাকে আরব দুনিয়ার আস্থার কেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছিল। এই ঐতিহ্যটা কি আজ কাজে আসতে পারে? আমি মনে করি, পারে এবং পারার কারণটাও স্পষ্ট।

আজকের বাংলাদেশ আমেরিকার শত্রু নয়। ইরানের শত্রু নয়। ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও বৈরিতাও নেই। আর মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা কোনো চুক্তির কাগজে আঁকা নয়। এই সম্পর্ক লেখা আছে লাখ লাখ পরিবারের ঘামে, শ্রমে, বছরের পর বছরের বিশ্বাসে। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, আমিরাত, বাহরাইন, ওমান, জর্ডানে আমাদের ৮০ লাখেরও বেশি মানুষ কাজ করে। তারা শুধু রেমিট্যান্স পাঠায় না। তারা প্রতিদিন বাংলাদেশের হয়ে একটা বিশ্বাসের সেতু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই বন্ধনটা কোনো বড় দেশও কূটনীতির টেবিলে বসে কিনে নিতে পারবে না।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশ আজ বিশ্বের শীর্ষ অবদানকারীদের একজন। বারবার সর্বোচ্চ সৈন্য পাঠানো দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নাম উঠেছে। এই গ্রহণযোগ্যতা কেউ দেয়নি, বছরের পর বছর ধরে অর্জন করা হয়েছে। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে সংকট হলে বাংলাদেশের পতাকা সেখানে যায়। এই পরিচয়টাই আজ সবচেয়ে বড় সম্পদ। 

এমন পরিস্থিতিতে যদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এগিয়ে আসেন এবং বাংলাদেশ মধ্যস্থতার প্রস্তাব নিয়ে সামনে দাঁড়ায়, তা হলে সেটা কি বাতুলতা হবে? একেবারেই নয়। কারণ মধ্যস্থতা মানে এই নয় যে বাংলাদেশের কথায় কামান থামবে। মধ্যস্থতা মানে হলো একটি বিশ্বাসযোগ্য মুখ উভয়পক্ষকে বলছে, আলোচনার টেবিলে আসুন। সেই আহ্বান শুনতে হলে যে দেশটি ডাকছে তাকে সবপক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। বাংলাদেশ ঠিক সেই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছে আজ।

আর বাংলাদেশের নিজেরও এই যুদ্ধে সরাসরি ক্ষতি হচ্ছে। কাতার আর আমিরাত থেকে বাংলাদেশ তার বিশাল এলএনজি আমদানির জোগান পায়। হুরমুজ বন্ধ থাকলে সেই গ্যাস আর আসবে না। শিল্প কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র একে একে থমকে যাবে। লক্ষাধিক প্রবাসী কর্মী সংকটে পড়বে। মধ্যপ্রাচ্যে এই মুহূর্তে অনেক বাংলাদেশি নাবিক আটকা পড়ে আছেন, বাড়ি ফিরতে পারছেন না। বাংলাদেশ তাই শুধু নৈতিক কারণে নয়, সরাসরি নিজের স্বার্থেও এই যুদ্ধ থামাতে চায়। এই সততাটা কূটনীতির মঞ্চে অনেক দূর পর্যন্ত যায়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের একটি নতুন ভাবমূর্তি তৈরি হচ্ছে। ওআইসি ফোরামে একটা উদ্যোগ নেওয়া যায়। জাতিসংঘে একটা খসড়া প্রস্তাব রাখা যায়। ওয়াশিংটনে, তেহরানে, রিয়াদে, আম্মানে বাংলাদেশের কূটনীতিকরা ফোন তুলতে পারেন। যুদ্ধরত দুই পক্ষের মধ্যে একটা অনানুষ্ঠানিক বার্তাবাহকের ভূমিকাও বাংলাদেশের জন্য নতুন এক মর্যাদার দরজা খুলে দিতে পারে। চেষ্টা করতে ক্ষতি কী?

নোবেল পুরস্কার পাওয়া যাবে কি না, সেটা ভাবার দরকার নেই। বাংলাদেশ কখনো পুরস্কারের আশায় কারও মুখাপেক্ষী হয়নি। কিন্তু যখন একটি ছোট দেশ বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকটে নিজের কণ্ঠ তোলে, তখন সেই দেশের মানচিত্র বদলে যায়। শুধু ভূগোলের মানচিত্র নয়, বিশ্বের মনের মানচিত্রেও।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এটা জানতেন। তাই একটা ছোট, যুদ্ধবিধ্বস্ত, দরিদ্র দেশ নিয়ে তিনি বিশ্বের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন। আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে সেই একই পথ আবার খোলা। সুযোগ একবার চলে গেলে ইতিহাস ঠিকই মনে রাখে, কোন মুহূর্তে, কে এগিয়ে এসেছিল আর কে শুধু অপেক্ষা করে বসে ছিল।

লেখক : অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

এফআর
  বিষয়:   সম্পাদকীয়  হুরমুজ প্রণালি  শান্তির পতাকা  নেতৃত্বে  তারেক রহমান 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: