মস্কোর রোদ ঝলমলে অলস দুপুর হঠাৎ ছেয়ে গেল এক চেনা শব্দে। ভেসে এলো ড্রোনের গুঞ্জন আর তার পরপরই বিকট বিস্ফোরণের ধাক্কা। যে যুদ্ধ এতদিন টেলিভিশনের পর্দায় দূরের কোনো দৃশ্য ছিল, তা এবার নিজের দোরগোড়ায়। গত রোববার দুপুরের ওই হামলায় প্রাণ হারান তিনজন। তাদের একজন আবার ভারতের নাগরিক।
রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ২৪ ঘণ্টায় তারা প্রায় এক হাজার ড্রোন ভূপাতিত করেছে। অথচ মাত্র কয়েক দিন আগেই প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন স্মিত হেসে বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ এবার শেষের দিকে।’ তবে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন করছেন, সত্যিই কি শেষের সুর বাজছে, নাকি এই কথাগুলো কেবল এক সুচতুর অভিনয়? মস্কোর পোড়া আসফল্টে দাঁড়িয়ে একটা প্রশ্ন মনের কোণে ধিকিধিকি জ্বলে ওঠে। তা হলো, আসলেই কি শান্তির দরজায় টোকা পড়তে চলেছে, না কি কেবলই কালক্ষেপণের জটিল কূটচাল?
রাশিয়ার বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ এবার ছিল অন্যবারের তুলনায় জাকজমকহীন। ট্যাঙ্কের সারি ছোট, আকাশে জঙ্গিবিমানের সংক্ষিপ্ত মহড়া। সেই মঞ্চেই পুতিন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সংঘাত নাকি শেষপর্বে। এমনকি জেলেনস্কির সঙ্গে কোনো নিরপেক্ষ দেশে এক টেবিলে বসতেও তার আপত্তি নেই। সঙ্গে তার সেই চিরচেনা হাসি, চোখে স্থির দৃষ্টি, আর মুখে এক বাক্য ‘বিজয় সবসময়ই আমাদের ছিল, এবং থাকবেও।’ তার এ ভাষণের কদিন আগেই কিয়েভে রুশ হামলায় ২৪টি প্রাণ ঝরেছে, হাসপাতাল-আবাসন ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। এমন প্রেক্ষাপটে পুতিনের মুখে শান্তির বুলি শুনে অনেক শান্তিকামীর গা শিরশির করে ওঠাই স্বাভাবিক।
বার্লিনের সেন্টার ফর লিবারেল মডার্নিটির বিশেষজ্ঞ সিমন শ্লেগেল পুতিনের এই আচরণের নাম দিয়েছেন ‘অনুকরণ কূটনীতি’। তিনি বলছেন, ঘোষিত যুদ্ধবিরতির কাগজে কালি শুকানোর আগেই পুতিনের বন্দিবিনিময়ের প্রতিশ্রুতি বাতাসে মিলিয়ে গেছে। আসলে রাশিয়া ইচ্ছা করেই কূটনীতির নামে সময় টানছে। কারণটা পরিষ্কার। ময়দানে যখন রুশ সৈন্যরা পিছু হটছে, তখন আলোচনার আবহ তৈরি করে একটু নিশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা ছাড়া আর কী-বা করার আছে? শ্লেগেল আরও বলেন, এটা এক ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ। আর এই মুহূর্তে রাশিয়া জিতছে না।
অন্যদিকে ইউক্রেনও যেন নিজের হাতের তাসগুলো অনেকখানি গুছিয়ে নিয়েছে। তারা এখন রুশ তেল-শোধনাগার, অস্ত্রভান্ডার আর সরবরাহ লাইনে তীব্র আঘাত হানতে সক্ষম। ড্রোনের লড়াইয়ে ইউক্রেনের ‘গভীর আঘাত’ করার ক্ষমতা রাশিয়ার অর্থনীতির শিরায় কাঁপন ধরিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক বছর আগে যখন ট্রাম্প বলেছিলেন ‘ইউক্রেনের হাতে কোনো তাস নেই’ তখনকার চেয়ে আজ কিয়েভের অবস্থান ঢের শক্ত। এখন তারাও নিজেদের শর্তে আলোচনার টেবিলে বসার স্বপ্ন দেখতে পারে। কিন্তু রাশিয়ার হাতে আছে এক অফুরন্ত অস্ত্র। তা হলো এর বিশাল জনবল। তারা বারবার খাপ খাইয়ে নিচ্ছে, ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। শ্লেগেল তাই ইঙ্গিত দিচ্ছেন, কূটনীতির অভিনয় করে কালক্ষেণের মাধ্যমে এই জনবলের জোরকে কাজে লাগাতে চাইছে ক্রেমলিন।
পুতিনের চাল শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ইউরোপীয় রাজনীতির দাবার ছকেও নিঃশব্দে গুটি সাজাচ্ছেন। সম্প্রতি তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন, জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর গেরহার্ড শ্রোয়েডারকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে মধ্যস্থতাকারী করার। অথচ শ্রোয়েডারকে সবাই চেনেন একসময়কার রুশ রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর উচ্চপর্যায়ের লবিস্ট হিসেবে। ইইউর পররাষ্ট্র-প্রধান কায়া কালাস তাই বিদ্রুপ মেশানো স্পষ্টতায় বলে দিয়েছেন, ‘পুতিন তাকে কেন চান, তা বোঝাই যাচ্ছে। তিনি একই সঙ্গে টেবিলের দুই পাশে বসতে পারবেন, এটাই তো দরকার।’
তবে মস্কোর ঘরোয়া ভাষ্য অবশ্য ভিন্ন সুরে বাঁধা। ‘ডিগোরিয়া এক্সপার্ট ক্লাবের’ আলেক্সি নেচায়েভ বলছেন, আমরা আলোচনায় রাজি। কিন্তু উল্টোদিকের লোকজন যখন এক হাতে সংলাপের ডালি সাজান, আর অন্য হাতে ইউক্রেনের জন্য অস্ত্রের বরাত দেন, সীমান্তে ন্যাটোর অবকাঠামো বাড়ান, তখন বিশ্বাসের জায়গাটা কোথায়? তার দাবি, যদি ইউরোপীয় নেতারা সত্যিই রাশিয়ার নিরাপত্তা-উৎকণ্ঠাগুলো বোঝার চেষ্টা করেন, তবেই মস্কো ইতিবাচক সাড়া দেবে।
কিন্তু যুদ্ধের ক্যানভাস তো কেবল ক্ষেপণাস্ত্র আর সেনা-সংখ্যার হিসাবে আঁকা নয়। এর রং ছড়িয়ে আছে ইউরোপের ভোটকেন্দ্র, সংসদীয় বিতর্ক আর জনমতের উত্তাল স্রোতে। ফ্রান্সে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যদি ‘ন্যাশনাল র্যালি’ জেতে, জার্মানিতে ‘এএফডি’ আরও শক্তিশালী হয়, কিংবা ব্রিটেনে ‘রিফর্ম পার্টি’ লেবারকে কোণঠাসা করে ফেলে তা হলে ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমা সহায়তার ধারা হঠাৎ থমকে যেতে পারে। পুতিন যদি ততদিন সময় টানতে পারেন, তা হলে ইউরোপের রাজনৈতিক পালাবদলের সুবাতাসা তার পক্ষেই বইবে।
তবে সময় কি কেবল রাশিয়ার পক্ষেই বইছে? মোটেও না। ইউক্রেন এখন দূরপাল্লার আঘাত হানার এক নীরব শক্তি অর্জন করেছে। শ্লেগেল নিজেই বলছেন, এখন এমন একটা জায়গায় পৌঁছাচ্ছি, যেখানে ইউক্রেন হয়তো নিজের শর্তে আলোচনায় বসতে পারবে। এ-বাক্যটির ভেতর কিয়েভের রক্তাক্ত বুকের ভেতর জন্ম নেওয়া এক নতুন আত্মবিশ্বাসের প্রতিধ্বনি শোনা যায়।
আর পুতিন? বার্কলেতে অবস্থিত ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রুশ সমাজবিজ্ঞানী ইলিয়া বুদ্রাইৎস্কি মনে করেন, পুতিনের কাছে যুদ্ধটা এখন ব্যক্তিগত টিকে থাকার ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। ২০২২ সালে তিনি যে লক্ষ্যগুলো নিয়ে অভিযান শুরু করেছিলেন, তার অন্তত একটা অর্জন করাটা তার জন্য অপরিহার্য। তা না হলে তাকে দুর্বল ও পরাজিত দেখাবে। আর সে জন্য তিনি হাজার হাজার রুশ তরুণকে বলি দিতেও পিছপা হবেন না।
কিন্তু বুদ্রাইৎস্কি এক গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য টেনেছেন। তা হলো, পুতিন সরকারের স্বার্থ আর রাশিয়ার স্বার্থ এক নয়। সাধারণ রুশ নাগরিক নিষেধাজ্ঞার চাপে, পাল্টা-আক্রমণের আতঙ্কে আর দৈনন্দিন জীবনের অনিশ্চয়তায় ক্লান্ত-অবসন্ন। মস্কোর এক চল্লিশোর্ধ বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটু আর্তনাদ মেশানো গলায় বলে গেলেন, আমি শুধু চাই সব শেষ হোক, মানুষ মরা বন্ধ হোক। আশা করছি, এ বছরের শেষ নাগাদ অন্তত একটা চুক্তিতে পৌঁছানো যাবে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, সত্যি বলতে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব এখন বাতাসে দোলা দিচ্ছে। একদিকে রাজনীতির মঞ্চে নাটক চলছে, অন্যদিকে বারুদের গন্ধে সাধারণ মানুষের বুক ফেটে যাচ্ছে। পুতিনের শান্তিচেষ্টাকে ‘অনুকরণ কূটনীতি’ বলে অভিহিত করে বিশ্লেষকরা যে সতর্কতা শোনাচ্ছেন, তার মানে ভুল বোঝার অবকাশ নেই। যখন ময়দানে কোনো পক্ষই জিততে পারছে না, ঠিক তখনই কূটনীতির রেশমি পোশাকে কালক্ষেপণের রাজনীতিটা জোরালো হয়। ক্রেমলিনের মুখপাত্র পেশকভ যখন বললেন, ‘শান্তি প্রক্রিয়া এখন স্থগিত’ তা আসলে চিৎকার করে বলছে, ‘আমাদের আরও সময় চাই।’
ফ্রিল্যান্সার সাংবাদিক এবং ডোপওয়ার্ল্ড বইয়ের লেখক নিকো ভোরোবিয়োভের লেখা ‘ইজ রাশিয়া সিমুলেটিং ডিপ্লোম্যাসি বিকজ অব ওয়্যার লুজেজ ইন ইউক্রেন?’ শিরোনামে আলজাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধ অবলম্বনে সময়ের আলোর পাঠকদের জন্য ভাবানুবাদকৃত।
সময়ের আলো/আআ