কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রো। ছবি : রয়টার্স সাবেক কিউবান প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এটি কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের ওপর ওয়াশিংটনের চাপ আরও বাড়ানোর বড় পদক্ষেপ বলে দেখা হচ্ছে।
বুধবার (২১ মে) এই অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র।এই মামলার মূল ঘটনা ১৯৯৬ সালের। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী কিছু কিউবান নির্বাসিত একটি সংগঠন গড়ে তোলে, যার নাম ছিল “উদ্ধারকারী ভাইদের সংগঠন”। তারা ছোট বিমান ব্যবহার করে সমুদ্রপথে পালিয়ে যাওয়া কিউবানদের খুঁজে বের করে সাহায্য করত। একদিন তাদের দুটি ছোট বিমান কিউবার কাছাকাছি আকাশে উড়ছিল। তখন কিউবার যুদ্ধবিমান সেগুলোকে গুলি করে ভূপাতিত করে। এতে বিমানে থাকা চারজন মারা যান।
বর্তমানে ৯৪ বছর বয়সী রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে যে, তিনি মার্কিন নাগরিকদের হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এছাড়া চারজনকে হত্যার দায় এবং দুটি বিমান ভূপাতিত করার অভিযোগও আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধ।
ধারণা করা হচ্ছে, তিনি এখনও কিউবাতেই অবস্থান করছেন। তাই তিনি নিজে থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে আত্মসমর্পণ করবেন— এমন সম্ভাবনা খুব কম। ফলে তাকে আদৌ যুক্তরাষ্ট্রে এনে বিচার করা যাবে কি না, সেটিও এখনো নিশ্চিত নয়।
বিশ্ব রাজনীতিতে সাধারণত কোনো দেশের সাবেক শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে অন্য দেশ এভাবে ফৌজদারি মামলা করে না। তাই এই পদক্ষেপকে খুবই ব্যতিক্রমী ও কড়া বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই মামলা এমন সময়ে হলো, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবায় সরকার পরিবর্তনের জন্য আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। ১৯৫৯ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে বিপ্লবের পর থেকেই কিউবায় কমিউনিস্ট শাসন চলছে।
বুধবার এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, হাভানার উপকূল থেকে পানামা খাল পর্যন্ত—আইনহীনতা, অপরাধ ও বিদেশি প্রভাব দূর করতে আমরা কাজ করব।
অন্যদিকে, ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ মায়ামিতে নিহতদের স্মরণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেন, রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। তিনি আশা করেন, একদিন না একদিন কাস্ত্রোকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
তবে কিউবা এই অভিযোগ সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে। কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, এটি একটি রাজনৈতিক নাটক, যার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।
তিনি আরও বলেন, ১৯৯৬ সালে কিউবা নিজেদের আকাশসীমা রক্ষার অধিকার প্রয়োগ করেছিল। তার মতে, এই মামলা হয়তো ভবিষ্যতে কিউবার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের অজুহাত তৈরির চেষ্টা।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবার জনগণের জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কিউবার বিদ্যুৎ, খাদ্য ও জ্বালানি সংকটের জন্য দেশটির নেতারাই দায়ী।
কিন্তু কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ এই সহায়তার প্রস্তাবকে ভণ্ডামি বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ অর্থনৈতিক অবরোধই কিউবার বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ।
রাউল কাস্ত্রো কিউবার ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তিনি তার বড় ভাই ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে মিলে কিউবার বিপ্লবে অংশ নেন এবং মার্কিন সমর্থিত শাসক ফুলহেনসিও বাতিস্তার সরকার উৎখাতে ভূমিকা রাখেন।
১৯৬১ সালের বে অব পিগস হামলায় যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত বাহিনীকে প্রতিহত করতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরে বহু বছর প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন। ২০০৮ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর স্থলাভিষিক্ত হয়ে প্রেসিডেন্ট হন এবং ২০১৮ সালে পদ ছাড়েন। যদিও এখনও তিনি কিউবার রাজনীতিতে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত।
১৯৯৬ সালের বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় কিউবা দাবি করেছিল, বিমানগুলো তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা পরে জানায়, ঘটনাটি আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় ঘটেছিল।
মায়ামিতে নিহত চারজনের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাদের ছবি প্রদর্শন করা হয়। বহু কিউবান-আমেরিকান সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
১৯৭১ সালে কিউবা ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়া ৬২ বছর বয়সী সংগীতশিল্পী ববি রামিরেজ বলেন, আমরা অনেক বছর ধরে এই দিনের অপেক্ষায় ছিলাম। অবশেষে সেটা ঘটল।
/ইউএমএইচ