সিন্ডিকেটের দাপটে কোরবানির চামড়ার বাজার অস্থির

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

প্রতি বছরের মতো এবারও কোরবানির ঈদে গাইবান্ধার সাধারণ মানুষ তাদের পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য পাননি। সরকার নির্ধারিত দাম থাকলেও বাস্তবে সেই

2026-05-30T18:39:43+00:00
2026-05-30T18:39:43+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
সিন্ডিকেটের দাপটে কোরবানির চামড়ার বাজার অস্থির
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬, ৬:৩৯ পিএম 
গাইবান্ধা জেলা শহরের চামড়ার আড়তে কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে কাজ করছেন একজন শ্রমিক। ছবি : সময়ের আলো
প্রতি বছরের মতো এবারও কোরবানির ঈদে গাইবান্ধার সাধারণ মানুষ তাদের পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য পাননি। সরকার নির্ধারিত দাম থাকলেও বাস্তবে সেই দাম কার্যকর হয়নি কোথাও। অভিযোগ রয়েছে, আড়তদার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চামড়ার বাজার কার্যত জিম্মি হয়ে পড়ে, যার ফলে কোরবানিদাতারা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন।

সরকার ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করেছিল। সেই হিসাবে একটি মাঝারি গরুর (প্রায় ২৫ বর্গফুট) চামড়ার দাম দাঁড়ায় অন্তত ১,৪২৫ টাকা। কিন্তু বাস্তবে গাইবান্ধার বিভিন্ন আড়তে একটি চামড়াও ৩০০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হয়নি। গ্রামাঞ্চলে অনেক কোরবানিদাতা তারও কম মূল্য পেয়েছেন—মাত্র ১০০ থেকে ৩০০ টাকা।

ছাগলের চামড়ার পরিস্থিতি আরও করুণ। ক্রেতা না থাকায় অনেক জায়গায় এটি প্রায় অচল অবস্থায় পড়ে থাকে। যেখানে বিক্রি হয়েছে, সেখানে দাম মিলেছে মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকা।

জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গাইবান্ধার সাত উপজেলায় এ বছর প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০টি পশু কোরবানি হয়েছে। এত বিপুল পরিমাণ চামড়া সংগ্রহ ও বাণিজ্যের পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত স্থানীয় আড়তদারদের নিয়ন্ত্রণে থাকে।

চামড়ার বাজারে কোরবানিদাতার হাত থেকে আড়তে পৌঁছানোর আগে একাধিক স্তরে হাতবদল হয়—মৌসুমী ব্যবসায়ী, ফড়িয়া, পাইকার হয়ে শেষ পর্যন্ত আড়তদারের কাছে যায়। প্রতিটি স্তরেই মুনাফা ভাগ হয়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত প্রকৃত উৎপাদক বা কোরবানিদাতারা সবচেয়ে কম লাভ পান।

মৌসুমী ব্যবসায়ী আফসারউদ্দিন জানান, তিনি গ্রাম থেকে মাঝারি গরুর চামড়া ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় কিনলেও আড়তে বিক্রি করতে গিয়ে একই দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে পরিবহন খরচও উঠে আসে না, লাভ তো দূরের কথা।

আড়ত কর্মচারীদের দাবি, সরকার লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও কাঁচা চামড়ার কোনো নির্দিষ্ট দাম নেই। লবণ, শ্রম ও পরিবহন খরচ যোগ করলে প্রতি বর্গফুটে ৬৫ থেকে ৭৫ টাকা খরচ পড়ে। এই যুক্তিতেই কম দামে চামড়া কেনার ব্যাখ্যা দেন তারা।

চামড়ার দাম কম হওয়ায় অনেক কোরবানিদাতা বিক্রির ঝামেলা এড়াতে সরাসরি চামড়া এতিমখানা বা মাদরাসায় দান করেছেন। তবে সেখানেও শেষ পর্যন্ত চামড়া কম দামে আড়তদারদের কাছেই বিক্রি করতে হয়, ফলে প্রকৃত উপকারভোগীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন।

স্থানীয় মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও চামড়া সংগ্রহকারীরা জানান, তারা যে দাম আশা করেন তার অর্ধেকও পান না। বাজারে কার্যত নিয়ন্ত্রণ থাকে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের হাতে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যার পেছনে কাঠামোগত দুর্বলতাও বড় কারণ। কাঁচা চামড়া দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে তা সংরক্ষণের জন্য দ্রুত লবণ দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ে সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় কোরবানিদাতারা বাধ্য হয়ে যেকোনো দামে চামড়া বিক্রি করেন।

এই দুর্বলতার সুযোগ নেয় আড়তদার চক্র। সময়ের অভাবে কোরবানিদাতারা দরকষাকষির সুযোগ না পেয়ে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন।

সরকার প্রতিবছর চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও মাঠ পর্যায়ে কার্যকর তদারকির অভাব রয়েছে। গাইবান্ধার আড়তগুলোতে কোনো ভ্রাম্যমাণ আদালত বা পর্যবেক্ষণ টিমের উপস্থিতি দেখা যায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ফলে নির্ধারিত দাম কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। এতে প্রশ্ন উঠছে—প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার এই সম্ভাবনাময় শিল্পে যদি ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হয়, তাহলে সরকারি মূল্য নির্ধারণের কার্যকারিতা কতটা বাস্তবসম্মত?

বাংলাদেশের চামড়া শিল্প রপ্তানিমুখী অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলেও কোরবানির মৌসুমে সেই চামড়ার ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার বাস্তবতা বছরের পর বছর ধরে অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।

/এসএকে
  বিষয়:   সিন্ডিকেট  দাপট  কোরবানি  চামড়া  বাজার  অস্থির  গাইবান্ধা 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: