আদালত প্রাঙ্গণে রামিসা হত্যা মামলার প্রধান আসামি সোহেল। ছবি: সংগৃহীত রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় করা মামলায় যুক্তি উপস্থাপন শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু আসামি সোহেল রানার দেওয়া জবানবন্দি পড়ে শোনান।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে আসামিদের উপস্থিতিতে যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হয়। শুনানিতে এই প্রথম গোপনীয় এই আসামির জবানবন্দি প্রকাশ্যে পড়ে শোনানো হয়।
আসামি সোহেল রানা জবানবন্দিতে বলেন, ‘আমার নাম সোহেল রানা। ওই বাসার তৃতীয় দলায় ভাড়া থাকি। এ বাসার তিন তলায় তিন ফ্ল্যাটে তিনজন থাকে। সকালে তারা কাজে বাসা থেকে বের হয়। আমি নিয়মিত নেশা করি।’
সোহেল আরও বলেন, ‘পাশের বাসার ৮ বছরের শিশু রামিসা তাদের বাসার বাইরে এলে তাকে ডাক দিই। সে এলে তাকে বাথরুমে জোরপূর্বক নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করি। এরপর সে চিৎকার করলে মুখ চেপে ধরি। মুখে ওড়না বেঁধে আমি তাকে ধর্ষণ করি। এরপর সে অজ্ঞান হয়ে গেলে তাকে মৃত ভেবে রুম থেকে ছুরি আনি। লাশ গুম করতে চাই। এরপর তাকে মাথা কেটে বিচ্ছিন্ন করি। পরে হাত কেটে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করি। এ সময় শিশুটির মা খোঁজাখুঁজি করে দরজার বাইরে জুতা দেখে ডাকাডাকি করে। আমি ভয় পাই। পরে সেলাইরেঞ্জ দিয়ে গ্রিল কেটে বাইরে পালিয়ে যাই।’
এরপর রাষ্ট্র ও আসামি পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে রায় ঘোষণার জন্য ৭ জুন দিন ধার্য করেন।
গত ৩ জুন আত্মপক্ষ শুনানিতে সোহেল আদালতকে বলেন, আমি নির্দোষ খালাস চাই। আমার একটা ছাওয়াল আছে আমাকে মাফ করে দেন। আমার সঙ্গে ছিল ডলার। ওকে কেউ দেখে নাই স্যার। ওরে ধরেন স্যার। আমার পাপের শাস্তি আমারে দেন। আরেকটা কথা আমার বউ নির্দোষ। এ সময় বিচারক তাকে থামিয়ে বলেন আপনারটা আপনি বলেন। এরপর সোহেল নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
এরপর স্বপ্নার বক্তব্য শুনতে চান আদালত। স্বপ্না আদালতকে জানান, আমি কিছু করিনি। এ সময় আদালত তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, দরজা কেন খুলেননি এর কোনো ব্যাখ্যা দিতে চান কিনা। এ সময় তাকে সতর্ক করে আদালত বলেন, আপনার স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে যে শাস্তি তার হবে একই শাস্তি আপনারও হবে। এরপর স্বপ্না আবারও বলেন, স্যার আমি নির্দোষ, আমি কিছু করিনি।
গত ২ মার্চ মামলার বাদীসহ ও ভিকটিমের বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার জবানবন্দির মাধ্যমে এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এছাড়া শিশু সাক্ষী হওয়ায় রামিসার বড় বোন রাইসা আক্তারের বক্তব্য ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। এরপর ভিকটিমের মা পারভীন আক্তার, বড় বোন রাইসা আক্তার, ফুপু মাহমুদা আক্তার, চাচা মিজানুর রহমান লিটন, চতুর্থ তলার বাসিন্দা মনির হোসেন, প্রতিবেশী জাকিরুল ইসলাম রাজু, দ্বিতীয় তলার বাসিন্দা শেখ আবু সামা, ফুপা মনিরুজ্জামান শাহীন ও কনস্টেবল রোমা আক্তার, কনস্টেবল শরীফ মিয়া, সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা এসআই ইকবাল হোসেন, ময়নাতদন্ত প্রস্তুত করা ডা. নাসাদ জাবিন, আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ, এসআই রাশেদুল ইসলাম ও তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের এসআই অহিদুজ্জামান পর্যায়ক্রমে ১৬ জন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দেন।
এদিকে সকালে মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জ থেকে এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়। এ সময় তাদের ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। এরপর তাদের এজলাসে নেওয়া হয়।
গত ১ জুন আদালত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। একই দিন বিকেলে মামলার বাদীসহ সকল সাক্ষীকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমন জারি করা হয়।
উল্লেখ্য, গত ১৯ মে মিরপুর-১১ এলাকার একটি বাসা থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন তার বাবা পল্লবী থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ ডিএনএ রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং ফরেনসিক আলামতের ভিত্তিতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
সময়ের আলো/জেডি