কখনও কখনও জীবনের সবচেয়ে বড় খবর আসে সবচেয়ে সাধারণ কোনো মাধ্যম থেকে। ব্রাজিলের দরিদ্র এক কিশোরের জীবনেও তেমনই এক দিন এসেছিল। একটি ছোট্ট রেডিওতে প্রচারিত কয়েকটি বাক্য বদলে দিয়েছিল তার ভবিষ্যৎ। সেই কিশোরই পরে হয়ে ওঠেন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম- পেলে।
শৈশবটা মোটেও সহজ ছিল না তার। পরিবারের আর্থিক সংকট এতটাই প্রকট ছিল যে, একটি আসল ফুটবল কেনাও ছিল বিলাসিতা। তাই বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে সংবাদপত্র, কাপড় কিংবা ফল দিয়ে বানানো অস্থায়ী বলই ছিল তার ভরসা। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে বিভিন্ন কাজ করে সংসারে সহায়তা করতেন, আর অবসর পেলেই ছুটে যেতেন ফুটবলের পেছনে।
ফুটবলের প্রতি অসাধারণ ভালোবাসা আর স্বাভাবিক প্রতিভা খুব দ্রুতই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। স্থানীয় মাঠে তার খেলা দেখে অনেকেই ভবিষ্যতের বড় তারকার আভাস পেয়েছিলেন। সেই সম্ভাবনাই একসময় তাকে পৌঁছে দেয় ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব সান্তোসে।
মাত্র ১৫ বছর বয়সেই সান্তোসের জার্সি গায়ে তুলে নেন তিনি। ক্লাবটিতে যোগ দেওয়ার পর স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে তাকে নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণীও করা হয়েছিল- এই ছেলেটি একদিন বিশ্ব ফুটবলে আলো ছড়াবে। সময় প্রমাণ করেছে, সেই ভবিষ্যদ্বাণী মোটেও ভুল ছিল না।
আরও পড়ুন
এর কিছুদিন পর আসে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপের জন্য দল গঠন করছিল ব্রাজিল। তখনও পেলে ছিলেন কিশোর। কিন্তু তার অসাধারণ প্রতিভা নজর এড়ায়নি কোচের। বিশ্বকাপ দলে জায়গা পান মাত্র ১৭ বছর বয়সে।
মজার বিষয় হলো, জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার খবরটি প্রথমে জানতেন না পেলে নিজেই। খবরটি সবার আগে শোনেন তার বাবা। একটি রেডিও সম্প্রচারে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণার সময় পেলের নাম উচ্চারিত হয়। সংবাদটি শোনার পর উচ্ছ্বসিত বাবা দ্রুত বাড়িতে ফিরে ছেলেকে জানান সেই সুখবর।
প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি পেলে। তার কাছে বিষয়টি ছিল স্বপ্নের মতো। পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্মরণ করেছিলেন, খবরটি শুনে মনে হয়েছিল হয়তো কেউ ভুল করেছে কিংবা মজা করছে।
বিশ্বকাপ খেলতে সুইডেনে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও ছিল তার জীবনের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক যাত্রা। এর আগে কখনও বিমানে চড়েননি, দেশের বাইরেও যাননি। অথচ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি বিশ্ব ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।
সুইডেন বিশ্বকাপে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন পেলে। নকআউট পর্বে ধারাবাহিক গোল, সেমিফাইনালে হ্যাটট্রিক এবং ফাইনালে জোড়া গোল করে তিনি ব্রাজিলকে এনে দেন প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা। একই সঙ্গে ইতিহাস গড়েন সবচেয়ে কম বয়সী বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার হিসেবে।
এরপরের গল্পটা শুধুই কিংবদন্তির। তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের অনন্য কীর্তি, অসংখ্য গোল এবং কোটি মানুষের ভালোবাসা তাকে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরাদের একজনের মর্যাদা দিয়েছে।
আজও সেই পুরোনো রেডিওটি সংরক্ষিত রয়েছে ব্রাজিলে। কারণ সেটি কেবল একটি যন্ত্র নয়; সেটিই ছিল এমন এক বার্তার বাহক, যা এক কিশোরের স্বপ্নকে বিশ্বজয়ের বাস্তবতায় রূপ দিয়েছিল। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল সেদিন, একটি সাধারণ রেডিওর শব্দ তরঙ্গ থেকে।
এএডি/