ফ্রান্সের ঐতিহাসিক ভার্সাই প্রাসাদে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বহুল আলোচিত সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করছিলেন, তখন অনিচ্ছাকৃতভাবেই ইতিহাস এক অদ্ভুত বৃত্ত সম্পূর্ণ করল। ট্রাম্প ঠিক সেই স্থানে বসেই এই শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, যেখানে প্রায় ১০৭ বছর আগে অন্য একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট এমন এক ঐতিহাসিক চুক্তিতে সই করেছিলেন, যা তার রাজনৈতিক পতন ডেকে এনেছিল এবং পরবর্তীতে এডলফ হিটলারের উত্থান ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৯১৯ সালের ২৮ জুন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটাতে ফ্রান্সের এই ভার্সাই প্রাসাদেই ‘ভার্সাই চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র ফ্রান্স ও ব্রিটেনের উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি জার্মানি ও তার মিত্রদের সঙ্গে চার বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি টেনেছিল।
তবে শুরু থেকেই এই চুক্তিটি ছিল নানা সমস্যায় জর্জরিত। দুই পক্ষের আলোচনার পরিবর্তে চুক্তির কঠোর শর্তগুলো মূলত জার্মানির ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। শর্তগুলোর মধ্যে ছিল— যুদ্ধের সমস্ত দায় জার্মানিকে স্বীকার করতে হবে, ২৬ হাজার বর্গমাইলেরও বেশি ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে হবে, প্রায় ৫০০ কোটি ডলার যুদ্ধক্ষতিপূরণ দিতে হবে, সমস্ত উপনিবেশ বাজেয়াপ্ত হবে এবং জার্মানির সামরিক বাহিনীর ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপিত হবে।
জার্মান প্রতিনিধিরা সে সময় এই অন্যায্য চুক্তির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। কিন্তু মিত্রবাহিনী হুমকি দিয়েছিল যে, চুক্তিতে সই না করলে এক সপ্তাহের মধ্যে জার্মানি আক্রমণ করা হবে। বাধ্য হয়েই সেদিন জার্মানি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। পরবর্তীতে এই চুক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ জার্মান জনগণের মনে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অপমানকে পুঁজি করেই ক্ষমতায় আসেন এডলফ হিটলার। ক্ষমতায় বসার পর হিটলার এই চুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জার্মানির সামরিক বাহিনীকে নতুন করে পুনর্গঠন করেন, যা বিশ্বকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।
খোদ যুক্তরাষ্ট্রের বুকেও এই চুক্তি উইলসনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। চুক্তির অন্যতম প্রধান অংশ ‘লিগ অব নেশনস’ (জাতিপুঞ্জ) গঠনে উইলসনের যে ভূমিকা ছিল, তা মার্কিন কংগ্রেস এবং সাধারণ জনগণ ভালোভাবে নেয়নি। তাদের আশঙ্কা ছিল, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে আবারও কোনো বিদেশি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। ফলশ্রুতিতে, ১৯১৯ এবং ১৯২০ সালে মার্কিন কংগ্রেসে দুই দুইবার চুক্তিটি পাসের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রে ভার্সাই চুক্তিকে অকার্যকর করে দেয়। পরবর্তীতে ১৯২১ সালে ওয়াশিংটন জার্মানির সঙ্গে পৃথক একটি শান্তি চুক্তি সই করতে বাধ্য হয়।
ভার্সাই চুক্তি অনুমোদনের পক্ষে জনমত গড়তে ১৯১৯ সালের গ্রীষ্মে উড্রো উইলসন যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে প্রায় ১০ হাজার মাইল পথ ভ্রমণ করে ব্যাপক প্রচারণা চালান। কিন্তু এই অতিরিক্ত পরিশ্রম তার শরীর ভেঙে দেয়। ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার মিলার সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরের ২ অক্টোবর তিনি এক ভয়াবহ স্ট্রোকের শিকার হন এবং প্রেসিডেন্টের বাকি মেয়াদে পুরোপুরি শয্যাশায়ী ও অক্ষম হয়ে পড়েন।
সময়ের আলো/কহু