সরকার গঠনের পর প্রথম বিদেশ সফরের অংশ হিসেবে চীনে এসেই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত সোমবার মালয়েশিয়া থেকে চীনের ডালিয়ানে আসেন তিনি। ২৩ থেকে ২৬ জুন এই চার দিনের সরকারি সফর বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর চলমান সফরে মূলত গুরুত্ব পাওয়া এজেন্ডাগুলো হচ্ছে- চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক, ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তর ইত্যাদি।
বেইজিংয়ে লালগালিচা সংবর্ধনা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের রাজধানী বেইজিং পৌঁছেছেন। বুধবার চীনের স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় ডালিয়ান থেকে হাই-স্পিড (বুলেট) ট্রেনে বিকাল ৫টা ৩৫ মিনিটে বেইজিং পৌঁছান তিনি। বেইজিং চাউমিং রেলওয়ে স্টেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান চীনের কাস্টমস মন্ত্রী (জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমস) সান মেইজুন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান লালগালিচা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় চীনের একটি সুসজ্জিত দল গার্ড অব অনার প্রদান করে।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, প্রধানমন্ত্রী এই সফরকালে বেইজিংয়ে ‘দিয়াওইতই’ রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে থাকবেন।
দুপুরে দালিয়ান রেলওয়ে স্টেশন থেকে বুলেট ট্রেনে চড়ে বেইজিং আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানসহ পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা একেএম শামসুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমানসহ সফরসঙ্গীরা।
প্রসঙ্গত, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কুয়াংয়ের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চার দিনের সফরে প্রথমে গত সোমবার রাতে দালিয়ান আসেন। সোমবার তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমি ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনের যোগ দেন। প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় সফরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হবে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে। বেইজিংয়ের গ্রেট হলে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাবেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কুয়াং।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় ডালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) আয়োজিত ‘গ্রীষ্মকালীন দাভোস’র বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেন। চীনের ডালিয়ান আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এটি অনুষ্ঠিত হয়। ১৭তম অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়নসের এই আয়োজনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, গিনির প্রধানমন্ত্রী আমাদু উরি বাহ, কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলঝাস বেকতেনভ, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী কিম মিন সেওক, মঙ্গোলিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিয়াম ওসর উচরাল এবং মন্টিনিগ্রোর প্রধানমন্ত্রী মিলোইকো স্পাইজিচ অংশ নেন।
সম্মেলনে ৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চল থেকে রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ এবং গণমাধ্যম অঙ্গনের ১,৭০০ জনেরও অধিক প্রতিনিধি অংশ নেন। সামার দাভোস বা ‘গ্রীষ্মকালীন দাভোসে’ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য একদিকে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ, অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের সেরা অনুশীলন ও অভিজ্ঞতা গ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় সক্ষমতাকে সমৃদ্ধ করবে।
শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মূল তাৎপর্য হচ্ছে- বেইজিংয়ে চীনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আগামীকাল একান্ত বৈঠক করবেন তারেক রহমান। ওই বৈঠকে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও গভীর করার বিষয়ে আলোচনা হবে।
এ ছাড়া আজ বৃহস্পতিবার চীনের প্রধানমন্ত্রী লি লি কুয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন তারেক রহমান। চীনের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে এই সফরে দুই দেশের সরকারপ্রধান পর্যায়ের বৈঠকে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। এরপর ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের (এনসিসি) চেয়ারম্যান ঝাও লেজিয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। চীনের শীর্ষ আইনপ্রণেতার সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও মুক্তবাণিজ্য চুক্তি
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ আমদানিকারক দেশ। তবে দুই দেশের মধ্যে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে বাণিজ্য ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা আরও বাড়ানোর বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একটি সম্ভাবনাময় মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা অনেক দূর এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তর
বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মহল এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, এবারের সফরের অন্যতম মূল এজেন্ডা হলো চীনের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ বাংলাদেশে নিয়ে আসা। তবে ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি তথা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চীনের উন্নত প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ চুক্তি হতে পারে।
বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও টেক্সটাইল ইনপুটের একটি বড় অংশ চীন থেকে আসে। এই খাতে সরাসরি চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভ। বুধবার (২৪ জুন) চীনের স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘গ্রীষ্মকালীন দাভোস’র সাইডলাইনে এই সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী কাজাখস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ঢাকা ও আস্তানায় স্থায়ী কূটনৈতিক মিশন স্থাপনের বিষয়ে একমত হন। এছাড়া রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য নিয়মিত বৈঠক হওয়া উচিত বলে মত দেন তারা।
কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভ উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৃহত্তর সম্পৃক্ততার সম্ভাবনাকে ইতিবাচকভাবে দেখেন। বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে কাজাখস্তানে দক্ষ শ্রমিক পাঠানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো, প্রযুক্তি, কৃষি ব্যবসা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে দুই দেশের বাণিজ্য সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
এ ছাড়া পানি কূটনীতি নিয়ে জাতিসংঘের অধীনে একটি বিশেষায়িত সংস্থা প্রতিষ্ঠার কাজাখস্তানের প্রস্তাবে বাংলাদেশের সমর্থন প্রত্যাশা করেন প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এতে বাংলাদেশের সমর্থন রয়েছে বলে জানান।
বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন।
সময়ের আলো/আআ