বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আজ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক। সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমানের চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এটি প্রথম বৈঠক। স্বাধীনতার ঘোষক, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে বর্তমান বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পর্যন্ত চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্বাধীনতার পর দুই দেশের সম্পর্ক সহজ ছিল না। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, শীতল যুদ্ধের প্রভাব ও তৎকালীন ভূরাজনৈতিক কারণে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে কিছুটা সময় লাগে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
এই নতুন সম্পর্ককে বাস্তব ভিত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ১৯৭৬ সালে ২ জানুয়ারি থেকে ৬ জানুয়ারি প্রথম চীন সফর করেন। তার কূটনৈতিক দূরদর্শিতার কারণে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে আবারও চীন সফর করেন। সেই সফরের মধ্যে দিয়ে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য থেকে শুরু করে প্রযুক্তি, সামরিক সহযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি ভিত গড়ে ওঠে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে তিনি আবার ১৯৮০ দেশটি সফর করেন।
প্রতিটি সফরের উদ্দেশ্য ছিল সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া। যেখানে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণূ বিষয়ে চুক্তি হয়। এতে কৃষি থেকে শুরু করে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত হয়। সেই থেকে চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বাংলাদেশের।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি বহুমুখী করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল তার অন্যতম লক্ষ্য ছিল বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক অবস্থান সুদৃঢ় করতে হলে শুধু নির্দিষ্ট একটি শক্তির ওপর নির্ভর না করে বহুমাত্রিক কূটনীতি অনুসরণ করতে হবে।
দেশের ইতিহাস বলে, জিয়াউর রহমানের শাসনকালে চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সফরের মধ্যে দিয়ে বাণিজ্যিক ও সামরিক সহযোগিতা সম্প্রসারিত হতে শুরু করে। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে চীনের সম্পৃৃক্ততা মূলত সেই সময় থেকে। এটি পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত সহযোগিতার ভিত তৈরি করে।
জিয়াউর রহমানের পর বিএনপির রাজনৈতিক ধারার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বাস্তবাবদী পররাষ্ট্রনীতি। বিএনপির রাজনীতিতে এখন যার প্রতিফলন দেখা যায়। তবে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক কখনোই শুধু রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়নি। এর সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা।
১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর খালেদা জিয়া নেতৃত্বে সরকার গঠন করা হয়। সে সময় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার হয়। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়ে। অবকাঠামো থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারিত হয়। চীন সে সময় বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে অবস্থান শক্তিশালী করতে শুরু করে।
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট চীনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হু জিনতাওয়ের আমন্ত্রণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া চীন সফর করেন। তার সফরসঙ্গী হিসেবে সে সময়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও ছিলেন। তখন বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। খালেদা জিয়ার সফরের দুই মাস পর বর্তমান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সঙ্গে নিয়ে তৎকালীন কৃষি প্রতিমন্ত্রী চীন সফর করেন।
২০১৬ সালে ১৪ অক্টোবর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঢাকায় এলে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাতে চীনের প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, আমরা ভৌগোলিক দিক থেকে বেশি দূরে নয়। যে কারণে আমরা চাই দুই দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় থাকুক।
উত্তরে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, চীন আমাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেশ। দুই দেশে আমরা যদি পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে চলতে পারি তা হলে হয়তো সম্পর্ক আরও গভীর হবে। খালেদা জিয়া দেশপ্রেমে উদ্ভূত হয়ে বলেছিলেন, আমরা জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা পেতে চাই। তিনি আরও বলেছিলেন, আমরা চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে আরও নিবিড় সম্পর্ক বাড়াতে চাই।
তবে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় যেসব বিষয়ে চুক্তি হয়েছে তা শুধু দুই দেশের জন্য উন্নয়নের অভিযাত্রা নয়। এটি সমগ্র অঞ্চলের স্থিতিশীলতা সংযোগ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বায়নের যুগে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যেমন সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠে, তেমনি বিশ্বরাজনীতির গতিপথ পরির্বতন হতে শুরু করে। সে সময় বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন পণ্য চীনে রফতানির পরিমাণ বাড়তে থাকে।
তারেক রহমান যখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন থেকেই বাংলাদেশ চীন সম্পর্ক আলোচনায় উঠে আসে। এ সময় তিনি সরকারের দায়িত্বে না না থাকলেও দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা হিসেবে তার রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি কূটনৈতিক মহলে আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে তারেক রহমান বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন। রক্তের প্রবাহমান ধারা ও রাজনৈতিক নীতির উত্তরাধিকার সূত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থনৈতিক কূটনীতিকে বেশ গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিয়ে আসেন।
এ কথা আজ অস্বীকার করার উপায় নেই, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের সময় থেকে শুরু হওয়া চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আজ নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। এটি শুধু কূটনৈতিক যোগাযোগ নয়, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা ও আঞ্চলিক সংযোগের বহুমাত্রিক অংশীদারত্বে পরিণত হয়েছে।
জিয়াউর রহমান যে বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতির ওপর ভিত স্থাপন করেছিলেন তার প্রভাব বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাজনীতির ধারায় বিদ্যমান। ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক এখনও অটুট। আগামীতে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার পথ ধরে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক আরও উচ্চতায় নিয়ে যাবেন- এমন প্রত্যাশা দেশবাসীর।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও