মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের টানা পাঁচ দফা আলোচনার পর অবশেষে একটি ত্রিপক্ষীয় কাঠামোর অধীনে চুক্তিতে সম্মত হয়েছে লেবানন ও ইসরায়েল। গত শুক্রবার ওয়াশিংটনে এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের ঠিক আগে সাংবাদিকদের দেওয়া বক্তব্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একে ‘শুরুর সূচনা’ বলে অভিহিত করেছেন।
পরবর্তীতে এক লিখিত বিবৃতিতে রুবিও জানান, এই চুক্তির আওতায় জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থার সাথে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ১০০ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা) ‘মানবিক সহায়তা’ প্রদান করবে। তবে এই অর্থ কেবল লেবাননের জন্য নাকি ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত শহরগুলোর জন্যও বরাদ্দ, তা তিনি স্পষ্ট করেননি। এছাড়া লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীকে শক্তিশালী করতে ট্রাম্প প্রশাসন আরও ৩০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩৬০ কোটি টাকা) অর্থ ফেরত দেবে বলেও জানান তিনি।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, এই চুক্তিটি লেবাননের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার, হিজবুল্লাহর অস্ত্রভাণ্ডার ও তাদের সন্ত্রাসী অবকাঠামো ভেঙে দেওয়া এবং ইসরায়েলি নাগরিকদের ওপর থেকে হুমকি দূর করে তাদের নিজ সীমান্তে ফিরে যাওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়া তৈরি করবে। এছাড়া ওয়াশিংটনের তত্ত্বাবধানে লেবাননের জন্য একটি ‘মিলিটারি কোঅর্ডিনেশন গ্রুপ’ গঠন করা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
টানা তিন দিনের নিবিড় বৈঠকের পর অনুষ্ঠিত এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে রুবিও হিজবুল্লাহর নাম উল্লেখ না করে বলেন, ইসরায়েলিরা বারবার লেবাননের ভূখণ্ড থেকে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছে। তবে এই হামলা লেবাননের জনগণ বা সরকার করেনি, করেছে একটি বহিরাগত শক্তি (হিজবুল্লাহ), যারা এই ভূখণ্ডকে ব্যবহার করতে চেয়েছে।
উল্লেখ্য, হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের সাথে সরাসরি কোনো আলোচনায় বসতে রাজি না হলেও ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে পরোক্ষ বা ব্যাকচ্যানেল যোগাযোগ রক্ষা করেছে বলে জানা গেছে। লেবাননের আনুষ্ঠানিক সামরিক বাহিনীর চেয়ে হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা অনেক বেশি।
ওয়াশিংটনে নিযুক্ত লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদেহ মোয়াদ এই বৈঠকগুলোকে ‘দীর্ঘ এবং কঠিন’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আজকের এই চুক্তিটি লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা পুনরুদ্ধার, স্থায়ীভাবে বৈরিতা অবসান এবং আমাদের সাধারণ মানুষকে নিজ ভূমিতে শান্তিতে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রথম পদক্ষেপ।
অন্যদিকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ইয়েকিয়েল লেইটার লেবাননের নারী রাষ্ট্রদূতের প্রশংসা করে বলেন, আলোচনার টেবিলে মোয়াদ তার দেশের জন্য ‘সিংহের মতো’ লড়াই করেছেন। তিনি দাবি করেন, এখন ইরান ও হিজবুল্লাহ এই প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ বাইরে এবং ইসরায়েল-লেবানন শান্তির পথ উন্মুক্ত।
চুক্তি হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র এখনই খুব বেশি বদলাচ্ছে না বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—হিজবুল্লাহ সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের ‘নিরাপত্তা অঞ্চলে’ অবস্থান করবে এবং এটি আমাদের জন্য একটি বড় অর্জন।
নেতানিয়াহু আরও জানান, ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের লিটানি নদীর দক্ষিণে এবং উত্তরে দুটি পাইলট জোন বাস্তবায়ন করবে। ইসরায়েলি বাহিনী পর্যায়ক্রমে সেসব এলাকা থেকে সরে গেলে লেবাননের সেনাবাহিনী সেখানে নিয়ন্ত্রণ নেবে। তবে প্রয়োজনীয় যুদ্ধাস্ত্রের অভাবে ভুগতে থাকা লেবাননের সেনাবাহিনী কীভাবে এই দায়িত্ব পালন করবে বা তারা হিজবুল্লাহর মুখোমুখি হতে প্রস্তুত কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। ইতিমধ্যে ইসরায়েল লেবাননের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অঞ্চল দখল করে নিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধ অবসানে চলতি সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ১৪ দফার চুক্তি সই হয়। এর পরপরই লেবাননের সাথে এই চুক্তিটি সম্পন্ন হলো। নেতানিয়াহু একে ইরানের জন্য বড় ধাক্কা উল্লেখ করে বলেন, ইরান আমাদের জোরপূর্বক দক্ষিণ লেবানন থেকে তাড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু মূলত ইসরায়েল, লেবানন ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে তাদের জানিয়ে দিয়েছে যে—এটি সম্পূর্ণ আমাদের বিষয়, এখানে তাদের নাক গলানোর কোনো সুযোগ নেই।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চের পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত ৪ হাজার ২০০-এর বেশি লেবাননি নাগরিক নিহত হয়েছেন।
সময়ের আলো/কহু