করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা, ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যবাধকতার নিয়ম প্রত্যাহারসহ আরও বেশ কিছু বিষয়ে সংশোধনী আনা হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে। গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে অর্থ বিল ২০২৬ পাসের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করাসহ বেশ কিছু বিষয়ে সংশোধনী আনার অনুরোধ করেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়। এর ফলে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা তাদের আয়ের ওপর আগামী অর্থবছরে সাড়ে তিন লাখ টাকার পরিবর্তে চার লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত সুবিধা পাবেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বাজেটকে জীবনবান্ধব বাজেট হিসাবে সজ্ঞায়িত করে বলেন, ‘আমরা যে বাজেট উপস্থাপন করছি সরকারি দলের সদস্য হিসেবে একে আমি একটি নামকরণ করতে চাই। আর সেটি হচ্ছে এ বাজেট ‘জীবনবান্ধব’। আমরা দেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক আলোচনা করেছি, অনেক বক্তব্য রেখেছি। অতীতে ভালোমন্দ কি হয়েছে আমি সে বিতর্কে আর যাব না। আমাদেরকে অবশ্যই সামনে চলতে হবে।’
এই জীবনবান্ধব বাজেট আসলে জনজীবনে কতটা স্বস্তি দেবে সে প্রশ্ন সামনে আসছে। এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেট থেকে চূড়ান্ত বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোসহ বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু নতুন বাজেটে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিশাল এই ঘাটতির বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রার নির্ধারণ করা হয়েছে বিশাল। ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করাই এই বাজেটের বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে আনাও কঠিন হবে।
এদিকে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হলেও প্রস্তাবিত বাজেটে আয়করের ৫ শতাংশ যে ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছিল চূড়ান্ত বাজেট থেকে সে সুুবিধা বাদ দেওয়া হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, যারা আয়কর রিটার্ন অনলাইনে জমা দেবেন তাদের করযোগ্য আয়ের ওপর ৫ শতাংশ ছাড় দেওয়া হবে। ডিজিটাল রিটার্নে সবাইকে আনার জন্য এই প্রণোদনা। তবে এই প্রস্তাবের পর সংসদীয় কমিটি ও এনবিআর থেকে এ বিষয়ে আপত্তি আসে। কারণ এতে সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাবে। অথচ এবারের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যই বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন ৫ শতাংশ ছাড়ের সুবিধা বাদ দেওয়া হলো, কিন্তু অনলাইন রিটার্ন বাধ্যতামূলকই থাকছে করদাতার জন্য। জরিমানা মওকুফ ও ইউজার-ফ্রেন্ডলি পোর্টালের সুবিধা আগের মতোই বহাল থাকল। বাজেট পাসের সময় ৫ শতাংশ ছাড়ের সুবিধা বাতিল করা হয়েছে মূলত ঘাটতি কমাতে। তবে এ বাতিলের কারণে মধ্যবিত্ত করদাতাদের ওপর চাপ আরও বাড়ল। সুতরাং করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হলেও ৫ শতাংশ ছাড়ের সুবিধা বাতিল করায় সাধারণ করদাতাদের তেমন একটা সুবিধা হবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকার প্রস্তাব করেছেন তার বক্তৃতায়। সিপিডির পক্ষ থেকে আমাদেরও প্রস্তাব ছিল করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর জন্য। মূল্যস্ফীতি হারের সঙ্গে সমন্বয় করে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হয়েছে এটি ভালো দিক। তবে এ বাজেটে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের দিক হলো ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য পূরণ করা। এটি খুবই দুরুহ কাজ হবে, তাই নতুন বাজেট বাস্তবায়ন করাও কঠিন হবে। তবে যদি রাজস্ব আদায় বাড়াতে পারে সরকার তা হলে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে। আর রাজস্ব বাড়ানোর জন্য এনবিআরকে আধুনিকায়ন করতে হবে, এর সক্ষমতা বাড়াতে হবে।’
তিনি বলেন, অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলে ৫ শতাংশ কর ছাড়ের সুবিধা চূড়ান্ত বাজেট থেকে বাদ দেওয়ায় মধ্যবিত্তের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। এ ছাড়া কিছু পণ্যে শুল্ক কমানো হলেও বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ না করলে এর সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না এবং মূল্যস্ফীতিও কমবে না। তাই বাজার তদারকি জোরদারের পাশাপাশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে পেশ করা নতুন বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বাজেটে ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট ছিল এটি।
বাজেট পেশের পর থেকে গতকাল পর্যন্ত সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যরা বাজেটের ওপর আলোচনা করেছেন। সাধারণ আলোচনা শেষে গতকাল সোমবার বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রস্তাবিত বাজেট থেকে বেশ কিছু বিষয়ের ওপর ভ্যাট কমানোসহ অনেক প্রস্তাব রাখেন অর্থমন্ত্রীর কাছে।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় বাজেটকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করে বলেন, ‘বাস্তবতা অনেক কঠিন। তারপরেও বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে যে বাজেটটি আমরা এখানে উপস্থাপন করেছি, অবশ্যই আমরা চেষ্টা করেছি আমাদের সর্বোচ্চ বুদ্ধি, বিবেক ও জ্ঞান দিয়ে এমন একটি বাজেট উপস্থাপন করতে যাতে শ্রেণি-পেশা ও সমাজের সব মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তির শ্বাস ফেলতে পারে।’
সংসদে বাজেট উপস্থাপনের পরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বাড়েনি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা অতীতে লক্ষ্য করেছি যে বাজেট উপস্থাপনের আগে ও পরে অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম হঠাৎ করে কোনো কারণ ছাড়াই বেড়ে যেত। তবে এ বছর আমরা সে রকম কোনো দৃশ্য দেখিনি।’
তিনি বলেন, ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় বলতে আমরা সাধারণত যা বুঝে থাকি এ রকম ৬১টি পণ্যের ওপর থেকে পূর্বের নির্ধারিত ট্যাক্স প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তি করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা আরও বাড়ানোর প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ কর বছরের জন্য ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হলেও প্রধানমন্ত্রী তা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার অনুরোধ জানান।
দেশের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতের উন্নয়নেও প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পেশ করেন। বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর প্রযোজ্য ১০ শতাংশ কর হ্রাস করে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন।
যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে চূড়ান্ত বাজেটে : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগের বিধান প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান ব্যক্তি করদাতার করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব প্রত্যাহার, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করহার ১০ থেকে ৫ শতাংশে নামানো এবং পাহাড়ি ও সমতলের সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর করসুবিধা সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেন।
তিনি চিংড়ি শিল্প, উৎপাদনশীল শিল্প ও স্থানীয় শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর কমানো বা প্রত্যাহার, মধু, পিভিসি, পিইটি রেজিন, রিফাইন্ড কপার, অপরিশোধিত কাজুবাদামসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালে শুল্ক হ্রাস এবং এলইডি ল্যাম্প ও প্রি ফেব্রিকেটেড বিল্ডিং শিল্পের রেয়াতি সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী স্টার্টআপ ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিলকে যুগান্তকারী উদ্যোগ উল্লেখ করে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ করা, বিটিআরসির রাজস্ব ভাগাভাগির ভ্যাট ও মাছ সরবরাহে আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহার, স্থানীয়ভাবে ডাবল কেবিন পিকআপ ও মাইক্রোবাস উৎপাদনে ভ্যাট কমানো এবং স্বর্ণালংকারসহ কয়েকটি খাতের ভ্যাট কাঠামো পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি সুশাসন, জবাবদিহি, আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্বারোপ করে সুপ্রিম কোর্টের জন্য অতিরিক্ত ১০০ কোটি এবং আইন মন্ত্রণালয়ের জন্য অতিরিক্ত ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দেন।
অন্যান্য দিক : ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব, ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, বিদ্যুৎ, গ্যাস সংযোগ, মোবাইল আর্থিক সেবার মার্চেন্ট হিসাব এবং প্রতিষ্ঠানের নামে যানবাহন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিদেশ থেকে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ভ্যাট আদায়ের দায়িত্ব ব্যাংক ও অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর দেওয়া হয়েছে। প্রতি তিন কর মেয়াদ শেষে একবার রিটার্ন দাখিলের বিধান করা হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও বীমা কোম্পানির জন্য আলাদা সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া যৌথ উন্নয়ন চুক্তির আওতায় জমির মালিক ডেভেলপারের কাছ থেকে ফ্ল্যাট, নগদ অর্থ বা অন্য সুবিধা পেলে সেটিকে মূলধনী প্রাপ্তি হিসেবে গণ্য করে কর আরোপের বিধান করা হয়েছে।
সময়ের আলো/আরবিএন