বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয়ই যেখানে একমাত্র লক্ষ্য, সেখানে সৌন্দর্যের চেয়ে ফলাফলই শেষ কথা। তীব্র গরম, প্রতিপক্ষের দুর্ভেদ্য রক্ষণ আর কঠিন লড়াই-সব বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপের গোল। প্যারাগুয়েকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স। পুরো ম্যাচে বলের নিয়ন্ত্রণ ও আক্রমণে আধিপত্য দেখালেও গোলের অপেক্ষা ৭০ মিনিট পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত অধিনায়কের ঠান্ডা মাথার পেনাল্টিতে স্বস্তির জয় নিয়ে শেষ আট নিশ্চিত করেছে বর্তমান বিশ্বকাপ রানার্সআপরা।
ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণের লাগাম হাতে নেয় ফ্রান্স। কিলিয়ান এমবাপে, উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসেকে ঠেকাতে প্রায় পুরো দল নিয়ে নিজেদের ডি-বক্সের আশপাশে অবস্থান নেয় প্যারাগুয়ে। প্রতিপক্ষের ঘন রক্ষণভাগ ভাঙতে একের পর এক আক্রমণ চালালেও প্রথমার্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারেনি দিদিয়ের দেশমের দল। বরং প্যারাগুয়ের শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ এবং ফিলাডেলফিয়ার তীব্র গরম ফরাসিদের ছন্দ নষ্ট করে দেয়।
ম্যাচের প্রথম ২৫ মিনিটে ৮০ শতাংশের বেশি বল দখলে রাখলেও ফ্রান্স উল্লেখযোগ্য কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। মাঝেমধ্যে দূরপাল্লার শটে চেষ্টা করেন মানু কোনে, তবে তা লক্ষ্যভেদী ছিল না। প্রথম হাইড্রেশন বিরতির পর প্যারাগুয়ের রক্ষণ কিছুটা ফাঁক তৈরি করতে শুরু করলেও প্রথমার্ধে একবারও তাদের গোলরক্ষককে পরীক্ষা করতে পারেনি ফরাসিরা। ৩১ মিনিটে ম্যাচের প্রথম বড় সুযোগ আসে। ডান প্রান্ত থেকে উসমান দেম্বেলে দারুণ এক ক্রস ভেতরে পাঠান, কিন্তু প্রতিপক্ষের চাপের কারণে হেডে সংযোগই করতে পারেননি কিলিয়ান এমবাপে।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই ম্যাচের চিত্র কিছুটা বদলাতে থাকে। প্যারাগুয়ে খানিকটা ওপরে উঠে খেলার চেষ্টা করলে ফ্রান্সের আক্রমণের জন্য জায়গা তৈরি হয়। ৫২ মিনিটে এক দ্রুত পাল্টা আক্রমণে গোলরক্ষক মাইক মিয়ার লম্বা পাস ধরে এমবাপে সবাইকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যান, তবে শট নেওয়ার আগেই শেষ মুহূর্তে তা ক্লিয়ার করেন কাসেরেস। পরের মুহূর্তেই ডি-বক্সের বাইরে থেকে জোরালো শট নেন মানু কোনে, কিন্তু দারুণ এক রিফ্লেক্সে এক হাতে সেটি ফিরিয়ে দেন ওরলান্দো হিল।
অবশেষে ৭০ মিনিটে ভাঙে ম্যাচের নীরবতা। দিজিরে দুয়ে ডি-বক্সে ফাউলের শিকার হলেও প্রথমে বিষয়টি নজর এড়িয়ে যায় রেফারির। খেলা চলতে থাকে কিছুক্ষণ, পরে ভিএআরের সহায়তায় মনিটরে দেখে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন তিনি। স্পট কিকে কোনো ভুল করেননি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে, শান্তভাবে বল জালে পাঠিয়ে দলকে এগিয়ে দেন। এই গোলের সুবাদে চলতি বিশ্বকাপে ৭ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট নিয়ে আবারও গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষে উঠে আসেন এমবাপে। সমানসংখ্যক সাত গোল করেছেন লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপে এমবাপের মোট গোল সংখ্যা এখন ১৯, যেখানে এক গোল বেশি নিয়ে শীর্ষে মেসি।
গোলের পরপরই ম্যাচে উত্তেজনা বেড়ে যায়। প্যারাগুয়ের খেলোয়াড়দের তীব্র প্রতিবাদ ও কোচিং স্টাফের অসন্তোষ মাঠের পরিবেশ আরও উত্তপ্ত করে তোলে। হাইড্রেশন বিরতির সময়ও দুই দলের মধ্যে উত্তেজনার রেশ বজায় থাকে। বেশ কয়েকটি কঠিন ফাউলে খেলার তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। নির্ধারিত সময়ের এক মিনিট আগে আবারও বিপদ তৈরি করেন এমবাপে, তবে রায়ান শের্কির পাস থেকে নেওয়া তার জোরালো শট দুর্দান্তভাবে রুখে দেন গিল। ইনজুরি টাইমে আরও দুটি নিশ্চিত সুযোগ পান ফরাসি অধিনায়ক। প্রথম শটটি গোলরক্ষক ঝাঁপিয়ে ঠেকান এবং ফিরতি বলেও তার দ্বিতীয় প্রচেষ্টা সফল হতে দেননি ওরলান্দো গিল। শেষ পর্যন্ত এমবাপের একমাত্র গোলেই ১-০ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে ফ্রান্স। কোয়ার্টার-ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ মরক্কো, যাদের বিপক্ষে আগের আসরেও জয় পেয়ে ফাইনালে উঠেছিল দিদিয়ের দেশমের দল।
এমন শারীরিকভাবে আত্রমণাত্মক খেলার শিকার হয়েও প্যারাগুয়ের খেলার ধরন নিয়ে সমালোচনা করেননি ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘আমি অনেক কিছু দেখেছি। খেলোয়াড়দের সেভাবেই প্রস্তুত করেছিলাম। তারা জানত, ম্যাচটা এমন হতে পারে। প্যারাগুয়ের সমালোচনা করতে চাই না। যেকোনো দল তাদের নিজস্ব কৌশলে খেলতে পারে। তবে প্রতিপক্ষের ডাগআউট থেকে কিছু আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়েছিল, যা না হলেও পারত।’
সময়ের আলো/এসএকে