ছবি : সংগৃহীতবিশ্বকাপের নকআউট পর্বে অনেক সময় কৌশল, বল দখল কিংবা পরিসংখ্যান নয়। একজন ফুটবলারের জাদুই বদলে দেয় পুরো ম্যাচের গল্প। স্পেন ও বেলজিয়ামের কোয়ার্টার ফাইনালও তেমন এক লড়াই হতে চলেছে, যেখানে দুই প্রজন্মের দুই ভিন্নধর্মী তারকার ওপরই নির্ভর করছে দুই দলের ভাগ্য। একদিকে স্পেনের বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল, অন্যদিকে বেলজিয়ামের অভিজ্ঞ গোলমেশিন রোমেলু লুকাকু। এই দুই ফুটবলারের মধ্যে যে বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠবেন, তার দলই সেমিফাইনালের পথে অনেকটা এগিয়ে যাবে। এমনটাই মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
স্পেনের খেলার ছন্দের কেন্দ্রবিন্দু এখন ইয়ামাল। বয়সে তরুণ হলেও তার পায়ে রয়েছে অভিজ্ঞতার ছাপ। ডান প্রান্ত থেকে বল নিয়ে ভেতরে ঢুকে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙা, নিখুঁত পাসে সতীর্থকে সুযোগ তৈরি করে দেওয়া কিংবা দূরপাল্লার শটে গোলের হুমকি। সব মিলিয়ে স্পেনের আক্রমণের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছেন তিনি। এই বিশ্বকাপে ইয়ামালের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু গোল করা নয়, ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করা। প্রতিপক্ষ যখন রক্ষণে জমাট বাঁধে, তখন ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে সেই জট খুলে দিতে পারেন তিনি। পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচেও বারবার প্রতিপক্ষকে সমস্যায় ফেলেছিলেন তার গতি ও ড্রিবলিং। বেলজিয়ামের ডিফেন্ডারদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে এই তরুণকে জায়গা না দেওয়া।
অন্যদিকে বেলজিয়ামের সবচেয়ে বড় ভরসা রোমেলু লুকাকু। সময় যত গড়িয়েছে, তিনি যেন আরও পরিণত হয়েছেন। আগের মতো শুধু শক্তির ফুটবল নয়, এখন বল ধরে রেখে সতীর্থদের খেলায় যুক্ত করতেও সমান দক্ষ। তবে তার সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি এখনও একই। পেনাল্টি বক্সের ভেতরে সুযোগ পেলেই গোল। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে চার গোল করা বেলজিয়ামের আক্রমণে লুকাকুর প্রভাব ছিল স্পষ্ট। তিনি শুধু গোলই করেন না, প্রতিপক্ষের দুই-তিনজন ডিফেন্ডারকে নিজের দিকে টেনে এনে অন্যদের জন্য জায়গাও তৈরি করেন। স্পেনের রক্ষণে তরুণ ও গতিময় ফুটবলার থাকলেও লুকাকুর শারীরিক শক্তি ও অভিজ্ঞতা সামলানো সহজ হবে না।
এই ম্যাচে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো দুই তারকার খেলার ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইয়ামাল ম্যাচ জেতান সৃজনশীলতা, গতি ও কারিকুরিতে। আর লুকাকু ম্যাচ জেতান শক্তি, অবস্থান বোধ ও নিখুঁত ফিনিশিংয়ে। একজন উইং থেকে আক্রমণ গড়ে তোলেন, অন্যজন বক্সের ভেতরে সেই আক্রমণের শেষ পরিণতি ঘটান। স্পেন সম্ভবত বলের দখল নিজেদের কাছে রেখে ছোট ছোট পাসে খেলবে। সে ক্ষেত্রে ইয়ামালের পায়ে বল বেশি থাকবে এবং তিনিই হবেন আক্রমণের মূল চালিকাশক্তি। অন্যদিকে বেলজিয়াম অপেক্ষা করবে পাল্টা আক্রমণের। সেখানে লুকাকুর দিকে একটি নিখুঁত পাসই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
তবে ফুটবল কখনো একার খেলা নয়। ইয়ামালকে সফল হতে হলে মাঝমাঠের সমর্থন দরকার হবে, আর লুকাকুকে গোল পেতে হলে উইং থেকে মানসম্মত ক্রস ও সঠিক পাস পেতে হবে। তবু বড় ম্যাচে প্রায়ই দেখা যায়, অসাধারণ একজন ফুটবলারই পুরো ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেন। কোয়ার্টার ফাইনালের এই মহারণ তাই কেবল স্পেন বনাম বেলজিয়াম নয়, এটি ভবিষ্যতের এক সুপারস্টারের সঙ্গে বর্তমানের এক প্রতিষ্ঠিত গোলশিকারিরও দ্বৈরথ। একদিকে বিশ্বফুটবলের আগামী দিনের প্রতীক লামিন ইয়ামাল, অন্যদিকে বেলজিয়ামের ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকু।
শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালের দরজা খুলবে মাত্র একটি দলের জন্য। আর সেই দরজা খুলে দেওয়ার চাবি হয়তো থাকবে এই দুই তারকার একজনের পায়েই। যে নিজের মুহূর্তটিকে সবচেয়ে নিখুঁতভাবে কাজে লাগাতে পারবেন, তিনিই হয়ে উঠবেন ম্যাচের নায়ক, আর তার দলই একধাপ এগিয়ে যাবে বিশ্বকাপের স্বপ্নপূরণের পথে।
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে মনে করেন, নকআউটের প্রতিটি ম্যাচই নতুন পরীক্ষা। তার ভাষায়, বেলজিয়ামের মতো প্রতিপক্ষকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে রুডি গার্সিয়া বলেছেন, স্পেন টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা দল হলেও তার খেলোয়াড়দের মধ্যে ভয় নেই; বরং তারা নিজেদের সামর্থ্যে বিশ্বাসী। এই ম্যাচে সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে লামিনে ইয়ামালের ওপর। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই ইউরোপের সবচেয়ে ভয়ংকর উইঙ্গারদের একজন হয়ে উঠেছেন তিনি। তার গতি, ড্রিবলিং ও সৃজনশীলতা প্রতিপক্ষের রক্ষণকে বারবার বিপদে ফেলছে। মাঝমাঠে রদ্রি ও ফ্যাবিয়ান রুইজের নিয়ন্ত্রণ স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি। সামনে গোলের দায়িত্বে থাকবেন মিকেল ওইয়ারসাবাল।
অন্যদিকে বেলজিয়ামের আশা কেভিন ডি ব্রুইনের অভিজ্ঞতা, চার্লস ডি কেটেলারের দুর্দান্ত ফর্ম, রোমেলু লুকাকুর গোল করার সহজাত ক্ষমতা এবং গোলবারের নিচে থিবো কোর্তোয়ার বিশ্বমানের উপস্থিতি।
সময়ের আলো/আআ