কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরি, পণ্য বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনকে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের খাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। তিনি বলেছেন, শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা ও আগ্রহ অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, উপকরণ, প্রশাসনিক ও আর্থিক সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
রোববার (২৬ জুলাই) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) নবাগত শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন উপলক্ষে আয়োজিত ‘কৃষিই কৃষ্টি-কৃষিই সমৃদ্ধি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে খাদ্যে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলার যে লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে, তা বাস্তবায়নে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে তিনি আশা করেন। নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের নতুন যাত্রার সঙ্গে সরকারেরও অনেক প্রত্যাশা জড়িয়ে রয়েছে। তাদের শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবন দেশের কৃষি এবং সামগ্রিক উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
বর্তমান সরকারের মেয়াদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাসের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হয়েছে। চার বছর পর তারা স্নাতক সম্পন্ন করলেও সরকারের ধারাবাহিকতার মধ্যেই সেই শিক্ষাজীবন শেষ হবে। এ সময়ে সরকারের নীতিমালা, পরিকল্পনা ও প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন-ভাবনা শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশ গঠনে প্রতিফলিত হবে বলে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের এক সপ্তাহের মধ্যেই বর্তমান গণতান্ত্রিক ও নির্বাচিত সরকার দেশের সব কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী দেশব্যাপী ‘কৃষক কার্ড’ বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে নগদ অর্থ ও ঋণ সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে বিএনপি সরকারের আগের অর্জনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হচ্ছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় কৃষি উন্নয়নের যে ভিত্তি তৈরি হয়েছিল এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে কৃষিখাতকে শক্তিশালী ও রপ্তানিমুখী করার যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছিল, বর্তমান সরকার তা অনুসরণ করেই কাজ করছে।
তিনি বলেন, কৃষকদের জীবনমান উন্নয়ন, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সহজ ও সুলভ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি এবং সেচ, বীজ, সার ও কৃষিযন্ত্রসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ আরও সাশ্রয়ী মূল্যে সহজলভ্য করতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশকে খাদ্যে আরও স্বয়ংসম্পূর্ণ করা, কৃষকের জীবনমান উন্নয়ন এবং তরুণদের কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু কৃষির উৎপাদনশীলতা ও বহুমুখীকরণ বৃদ্ধি নয়, বরং কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণ পৌঁছে দেওয়া এবং সেচ, বীজ, সার, কীটনাশক ও কৃষিযন্ত্রসহ সব ধরনের কৃষি উপকরণ কৃষকদের জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করা।
কৃষিপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ও মূল্যশৃঙ্খল গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক কৃষিপণ্য পর্যাপ্ত উৎপাদিত হলেও উৎপাদন এলাকা থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে গিয়ে দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায় এবং সংরক্ষণের অভাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্য নষ্ট হয়। এ সমস্যা সমাধানে স্থানীয় পর্যায়ে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ জোরদার করার পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরি এবং আধুনিক কৃষি বাজার গড়ে তোলা প্রয়োজন।
কৃষিপণ্যে মূল্য সংযোজন ও বৈচিত্র্য বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, কৃষিপণ্যের সাপ্লাই চেইন আরও কার্যকর করা, সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভ্যালু অ্যাডিশন এখন সময়ের দাবি। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, আম থেকে চাটনি বা জুস এবং টমেটো থেকে সস বা অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য উৎপাদন করা সম্ভব। এতে অপচয় কমবে, সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকবে এবং রপ্তানিমুখী কৃষিভিত্তিক শিল্পের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি শুধু কৃষি শিক্ষা নয়, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদসহ পুরো খাদ্যব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের এ অবদান ভবিষ্যতেও আরও সমৃদ্ধ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকার কথা স্মরণ করে মাহ্দী আমিন বলেন, আগামীর বাংলাদেশের প্রকৃত কান্ডারী শিক্ষার্থীরাই। তাদের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাতে সরকার সবসময় পাশে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়, যার ভিত্তি হবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার। সেখানে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন হবে, বৈষম্যের স্থান থাকবে না এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষ একসঙ্গে একটি সমৃদ্ধ, মানবিক ও নিরাপদ রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখবে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস এবং দেশের কৃষি উৎপাদনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অবদানের প্রশংসা করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, গবেষণা ও সাফল্যের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টির সুনাম দেশ-বিদেশে আরও বিস্তৃত হবে।
দেশের কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কৃষির বহুমুখীকরণ এবং গবেষণায় শেকৃবির সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অবদানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাইরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উচ্চমানের গবেষণা ও উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত থেকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নবীন শিক্ষার্থীরাও শিক্ষা ও গবেষণায় সাফল্যের মাধ্যমে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন।
সময়ের আলো/আরবিএন