কেন এত দুর্যোগপ্রবণ নেপাল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

নেপালে ভয়াবহ বন্যা কোনো বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। হিমালয়ের দ্রুত উষ্ণায়ন, হিমবাহ গলে অস্থিতিশীল হ্রদ তৈরি, পাহাড়ধস এবং ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয়

2026-08-27T08:36:37+00:00
2026-08-27T08:36:37+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬,
১২ ভাদ্র ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬
কেন এত দুর্যোগপ্রবণ নেপাল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ৮:৩৬ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
নেপালে ভয়াবহ বন্যা কোনো বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। হিমালয়ের দ্রুত উষ্ণায়ন, হিমবাহ গলে অস্থিতিশীল হ্রদ তৈরি, পাহাড়ধস এবং ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় অঞ্চলে দেশটির অবস্থান— সব মিলিয়ে নেপাল বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগঝুঁকিপূর্ণ দেশ।

গতকাল বুধবারের সকাল ৯টার দিকে নেপালের রাসুয়া জেলার ভোতে কোশি নদীতে হঠাৎ বিপুল পানির ঢল নামে। এতে চীন-তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি বেশ কিছু বসতি ধ্বংস হয়ে যায়। পরে সেই পানি ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে মেশে। বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশটিতে ১৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায় এবং প্রায় ৪০০ জন নিখোঁজ ছিলেন।

একই ৩০ কিলোমিটার নদীপথে মাত্র ১৩ মাসের ব্যবধানে এটি দ্বিতীয় ভয়াবহ বন্যা। ফলে এবারের ঘটনাকেও বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্যোগ হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা।

কীভাবে শুরু হলো বিপর্যয়
এবারের বন্যার কারণ নিয়ে এখন পর্যন্ত কয়েকটি ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল পার্লামেন্টে জানান, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ভূমিকম্পের মতো কম্পন একটি বড় ভূমিধসের সৃষ্টি করে। এতে নদীর গতিপথ বন্ধ হয়ে যায়। পরে সেই বাধ ভেঙে জমে থাকা পানি প্রবল বেগে নিচের দিকে নেমে আসে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) প্রথমে ওই সময় তিব্বতের প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পের তথ্য দেয়। পরে সংস্থাটি জানায়, কম্পনটি আসলে ভূমিকম্পের কারণে নয়, ভূমিধসের কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্র— আইসিমডের বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভোতে কোশির উপনদী লেন্দে খোলায় হিমবাহ থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল ধস নেমে নদী আটকে দিতে পারে। পরে পানি জমে সেই বাধ ভেঙে ভয়াবহ ঢল তৈরি হয়।

নেপাল ও চীনের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে আলোচনা করে একই ধরনের প্রাথমিক ধারণা দিয়েছেন কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবিজ্ঞানী রিজান ভক্ত কায়স্থও। গত বছরও একই নদীপথে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল।

অর্থাৎ, কারণ নিয়ে কিছুটা মতপার্থক্য থাকলেও ঘটনাপ্রবাহ মোটামুটি একই—হিমালয়ের কোনো অংশ ধসে নদী আটকে যায়, পেছনে পানি জমে এবং একপর্যায়ে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ ঢল সৃষ্টি করে।

শত শত হিমবাহ হ্রদ
হিমালয়ের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত গলছে হিমবাহ। এর ফলে বরফের ওপর ও আশপাশে তৈরি হচ্ছে অসংখ্য হ্রদ। এসব হ্রদের পানি প্রাকৃতিকভাবে তৈরি বরফ, পাথর ও মাটির বাঁধের পেছনে আটকে থাকে। বাঁধ ভেঙে গেলে মুহূর্তের মধ্যে বিপুল পানি নিচের দিকে নেমে আসে। এ ধরনের ঘটনাকে বলা হয় হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা বা জিএলওএফ।

আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের বরফ হারানোর হার দ্বিগুণ হয়েছে। এর ফলে এসব হিমবাহ ও নদীর নিচের দিকে বসবাসকারী প্রায় ২০ লাখ মানুষের ঝুঁকি বেড়েছে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির ২০২০ সালের একটি তালিকায় কোশি, গণ্ডক ও কর্ণালী অববাহিকায় ৩ হাজার ৬২৪টি হিমবাহ হ্রদের সন্ধান পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৪৭টিকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এসব হ্রদের ২৫টি তিব্বতে, ২১টি নেপালে এবং একটি ভারতে অবস্থিত।

তবে তালিকা করেও সব ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব নয়। কারণ হিমবাহের ওপর তৈরি অস্থায়ী হ্রদ কয়েক মৌসুমের মধ্যেই তৈরি, বড় ও আবার হঠাৎ উধাও হয়ে যেতে পারে। ২০২৫ সালের বন্যার জন্য দায়ী হ্রদটিও আগে শনাক্ত করা যায়নি।

অতীতেও ঘটেছে ভয়াবহ বন্যা
নেপালে এ ধরনের দুর্যোগ নতুন নয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে দেশটির ইতিহাসে বড় ধরনের হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার অন্তত ২৪টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৪টি ঘটেছে নেপালের ভেতরে এবং ১০টির উৎপত্তি তিব্বতে।

১৯৮১ সালের জুলাইয়ে তিব্বতের ঝাংঝাংবো উপত্যকার একটি হ্রদ হঠাৎ পানি ছেড়ে দেয়। ওই ঘটনায় ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। ধ্বংস হয় ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় সান কোশি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র। ১৯৬৪ ও ১৯৮৩ সালের বড় বন্যার সঙ্গেও একই হ্রদব্যবস্থার যোগসূত্র পাওয়া গেছে।

এমনকি প্রায় ৪৫০ বছর আগেও নেপালের সেটি খোলা নদী অববাহিকায় একটি হিমবাহ হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ধসে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। এতে পোখারা উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকা ৫০ থেকে ৬০ মিটার পুরু পাথর ও ধ্বংসাবশেষে ঢেকে যায়।

আগাম সতর্কতা কেন নেই
নেপালের জন্য বড় সমস্যা হলো, সীমান্তের ওপারে তিব্বতে তৈরি হওয়া এসব হিমবাহ হ্রদ সম্পর্কে সময়মতো তথ্য পাওয়া কঠিন।

২০২৫ সালের বন্যার পর নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগের মহাপরিচালক জানিয়েছিলেন, তিব্বত অঞ্চল থেকে নিয়মিত তথ্য পাওয়ার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। চীন থেকে বৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়া গেলেও হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ বৃষ্টিনির্ভর নয়।

গত বছরের ঘটনায় নেপালের কর্মকর্তারা জানান, সীমান্তরক্ষীদের কাছ থেকে বন্যার পানি নেপালে প্রবেশের প্রায় এক ঘণ্টা আগে খবর পাওয়া গিয়েছিল। কোনো পূর্বাভাসব্যবস্থা থেকে এই সতর্কতা আসেনি।

এরপর নেপাল ও চীন আগাম সতর্কতা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সহযোগিতার সিদ্ধান্ত নেয়। জাতিসংঘের গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডও ২০২৫ সালের জুলাইয়ে নেপালকে এ ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের সহায়তা অনুমোদন করে। কিন্তু সীমান্তজুড়ে এখনো কার্যকর রিয়েল-টাইম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

শুধু হিমবাহ নয়, নড়ছে পুরো হিমালয়
নেপালের ঝুঁকির আরেকটি কারণ আরও গভীরে। দেশটি ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষস্থলে অবস্থিত। দুটি প্লেট প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ২১ মিলিমিটার করে পরস্পরের দিকে এগিয়ে আসছে।

প্রায় ৫ কোটি বছর আগে এই সংঘর্ষের ফলেই হিমালয় পর্বতমালার সৃষ্টি শুরু হয়। সংঘর্ষ এখনো চলছে। ফলে হিমালয় পৃথিবীর সবচেয়ে নবীন ও দ্রুত বিকাশমান পর্বতমালাগুলোর একটি।

প্রতি বছর পর্বতমালাটি প্রায় ৫ মিলিমিটার করে উঁচু হচ্ছে। এই চলমান ভূতাত্ত্বিক চাপই বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি তৈরি করে।

ভূমিকম্প ছাড়াও ছোট কম্পন বা ভূমিধস পাহাড়ের দুর্বল ঢালকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর নেপালের বহু পাহাড়ি ঢাল এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

এবারের ঘটনাতেও বড় কোনো ভূমিকম্পের প্রয়োজন হয়নি। ভূমিধসের কারণে সৃষ্ট কম্পনই একটি পাহাড়ি ঢাল ধসিয়ে নদীর পথ বন্ধ করে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নদীর পাশে অপরিকল্পিত নির্মাণ
প্রাকৃতিক ঝুঁকির সঙ্গে মানুষের তৈরি অবকাঠামোও নেপালের ক্ষয়ক্ষতি বাড়াচ্ছে। চীন-নেপাল বাণিজ্যপথের বিভিন্ন এলাকায় নদীর সমতল ও সম্ভাব্য বন্যাপ্রবণ এলাকায় শুষ্ক বন্দর, কাস্টমস অফিস ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।

২০২৪ সালের এক গবেষণায় বলা হয়, হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার ঝুঁকিতে চীন-নেপাল সীমান্তের প্রায় ১০৩ কিলোমিটার মহাসড়ক, ১০৩টি সেতু, দুটি বড় শুষ্ক বন্দর এবং ৩ হাজার ৩০১টি ভবন রয়েছে।

রাসুয়াগাধি সীমান্তের কাছে তিমুরে কাস্টমস পোস্টটি মাত্র ১৩ মাসের মধ্যে দুবার ধ্বংস হয়েছে।

এবারের বন্যায় রাসুয়াগাধি সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ সেতুটিও ভেসে গেছে। ওই এলাকায় থাকা পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন।

বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় ধাক্কা
নেপালের জলবিদ্যুতের বড় অংশই পাহাড়ি নদীর ওপর নির্ভরশীল। সরু ও গভীর উপত্যকার মধ্য দিয়ে দ্রুতগতিতে প্রবাহিত এসব নদীতে তৈরি হয়েছে বহু জলবিদ্যুৎকেন্দ্র।

তাই বুধবারের দুর্যোগে শুধু মানুষের জীবন ও অবকাঠামো নয়, দেশটির বিদ্যুৎব্যবস্থাও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। জাতীয় গ্রিড থেকে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়, যা দেশের মোট সক্ষমতার দশমাংশেরও বেশি।

আর এই বিপদের প্রভাব শুধু নেপালেই সীমাবদ্ধ নয়। হিমবাহ হ্রদ থেকে নেমে আসা প্রবল ঢল ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে মেশে। পরে দেবঘাটে এই নদী নারায়ণী নামে প্রবাহিত হয়ে ভারতে প্রবেশ করে গণ্ডক নামে।

অর্থাৎ, তিব্বতের পাহাড়ে তৈরি হওয়া একটি অস্থির হ্রদ বা ভূমিধসের প্রভাব কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা পেরিয়ে ভারতের সমতলভূমি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এ কারণেই হিমালয়ের এই অঞ্চলে হিমবাহ, ভূতত্ত্ব, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সীমান্তপারের আগাম সতর্কতাকে একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।


সময়ের আলো/কেএইচ


  বিষয়:   সময়ের আলো  নেপাল  বন্যা  মৃত্যু 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: