তেল খালাসের সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পাচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিষ্ঠান পিটি পারতামিনা ট্রান্স কন্টিনেন্টাল। পাঁচ বছরের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়োগ দিতে ১ হাজার ৯৪৬ কোটি ২২ লাখ ২৭ হাজার ২৭ টাকার ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নিজস্ব তহবিল থেকে এ অর্থ পরিশোধ করা হবে। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে প্রস্তাবটি অনুমোদন দেওয়া হয়। অর্থমন্ত্রী দেশের বাইরে থাকায় অনলাইন সভায় যুক্ত হন। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রস্তাবের ভিত্তিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিংয়ের সঙ্গে ডাবল পাইপলাইন স্থাপন’ প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একজন ঠিকাদার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য এক ধাপ দুই খাম দরপত্র পদ্ধতিতে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয়।
এতে তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়। যাচাই-বাছাই শেষে দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব কারিগরিভাবে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়। পরবর্তী প্রক্রিয়া শেষে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিষ্ঠান পিটি পারতামিনা ট্রান্স কন্টিনেন্টালকে নির্বাচনের সুপারিশ করে।
প্রস্তাব অনুযায়ী কর ও মূল্য সংযোজন কর ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির দর ১২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। কর ও মূল্য সংযোজন করসহ বাংলাদেশি মুদ্রায় এর আনুমানিক মূল্য ১ হাজার ৯৪৬ কোটি ২২ লাখ ২৭ হাজার ২৭ টাকা। এই অর্থে পাঁচ বছরের জন্য সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিংয়ের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পাবে প্রতিষ্ঠানটি। সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং ব্যবস্থা সমুদ্রপথে আমদানি করা অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল দ্রুত খালাস করে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল স্থলভাগে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
কাতার থেকে আসছে আরও দুই কার্গো এলএনজি : এদিকে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের আওতায় সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের জন্য গ্যাস অয়েল (ডিজেল) ও জেট এ-১ আমদানির কার্যক্রম বাতিলের প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। একই সঙ্গে কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বিদ্যমান চুক্তি মূল্যের চেয়ে ভিন্ন মূল্যে আরও দুই কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির প্রস্তাবেও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের আহ্বান করা আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের আওতায় গ্যাস অয়েল (ডিজেল) ও জেট এ-১ আমদানির কার্যক্রম বাতিলের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ের জন্য আহ্বান করা ওই দরপত্রের প্যাকেজ-১, প্যাকেজ-২, প্যাকেজ-৩ ও প্যাকেজ-৪-এর আওতায় এসব জ্বালানি আমদানির কথা ছিল। তবে সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবে ওই আমদানি কার্যক্রম বাতিলের সুপারিশ করা হয়। বৈঠকে কমিটি প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে।
এদিকে বৈঠকের বিবিধ আলোচনায় জিটুজি ভিত্তিতে কাতার এনার্জি ট্রেডিং এলএলসি থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আরও দুই কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস কেনার প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী আগামী ৬ ও ২২ নভেম্বর ২০২৬ সময়ে এই দুই কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস কেনা হবে। এ ক্ষেত্রে চুক্তিতে বিদ্যমান মূল্যের পরিবর্তে নতুন মূল্যে গ্যাস কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
কানাডা-রাশিয়া-সৌদি আরব থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার টন সার কিনবে সরকার : কানাডা, রাশিয়া ও সৌদি আরব থেকে রাষ্ট্রীয় ও জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) পদ্ধতিতে ১ লাখ ৫৫ হাজার টন সার আমদানির চারটি প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। এতে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ৯৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে কানাডা থেকে ৮০ হাজার টন ও রাশিয়া থেকে ৩৫ হাজার টন মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) এবং সৌদি আরব থেকে ৪০ হাজার টন ডিএপি সার আমদানি করা হবে। প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। সার আমদানির অর্থ পরিশোধ করা হবে কৃষি ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ বাজেট থেকে।
কানাডা থেকে ৮০ হাজার টন এমওপি : বৈঠকে কানাডার কানাডিয়ান কমার্শিয়াল করপোরেশন (সিসিসি) থেকে জিটুজি পদ্ধতিতে এমওপি সার আমদানির দুটি প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তৃতীয় লটে ৪০ হাজার টন এবং চতুর্থ লটে আরও ৪০ হাজার টন এমওপি সার আমদানি করা হবে। প্রতিটি লটের জন্য ব্যয় হবে ১৮৯ কোটি ৬৭ লাখ ৩৯ হাজার ৬০০ টাকা। অর্থাৎ দুই লটে মোট ৮০ হাজার টন এমওপি সার আমদানিতে ব্যয় হবে ৩৭৯ কোটি ৩৪ লাখ ৭৯ হাজার ২০০ টাকা।
প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতি টন এমওপি সারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৮৩ দশমিক ৮০ মার্কিন ডলার। তৃতীয় ও চতুর্থ লটের প্রতিটির সার আমদানির মূল্য ১ কোটি ৫৩ লাখ ৫২ হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৮৯ কোটি ৬৭ লাখ ৩৯ হাজার ৬০০ টাকা।
রাশিয়া থেকে আরও ৩৫ হাজার টন এমওপি : এদিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের চুক্তির আওতায় রাশিয়ার জেএসসি ফরেন ইকোনমিক করপোরেশন (প্রডিনটর্গ) থেকে সপ্তম লটে ৩৫ হাজার (+১০ শতাংশ) টন এমওপি সার আমদানির প্রস্তাবও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হবে ১৬৫ কোটি ৮৯ লাখ ৭৫ হাজার ৫০০ টাকা। এর বিপরীতে সারটির মোট আমদানি মূল্য ১ কোটি ৩৪ লাখ ৩৩ হাজার মার্কিন ডলার। প্রতি টন এমওপি সারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৮৩ দশমিক ৮০ মার্কিন ডলার।
রাশিয়া থেকে এমওপি সার আমদানির প্রস্তাবের আগে অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়। পূর্ববর্তী চুক্তির কার্যক্রম শেষ হওয়ায় গত ২৪ মে চুক্তিটি পুনরায় নবায়ন করা হয়। চুক্তিতে নির্ধারিত প্রাইসিং ফর্মুলা অনুযায়ী বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরের ভিত্তিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সপ্তম লটের সারের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে বিএডিসির এমওপি সার আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ৭ লাখ ১৬ হাজার টন। এর মধ্যে রাশিয়া থেকে ৫ লাখ ৯৫ হাজার টন এমওপি সার আমদানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এরই মধ্যে দেশটি থেকে ১ লাখ ৭৫ হাজার টন এমওপি সার আমদানি করা হয়েছে।
সৌদি আরব থেকে ৪০ হাজার টন ডিএপি : অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের মা’আদেন থেকে ২০২৬ সালের চতুর্থ লটে ৪০ হাজার (+১০ শতাংশ) টন ডিএপি সার আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের ব্যয় হবে ৪৩৭ কোটি ৩৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা। সারের মোট আমদানি মূল্য ৩ কোটি ৫৪ লাখ মার্কিন ডলার। প্রতি টন ডিএপি সারের দাম ৮৮৫ মার্কিন ডলার।
বিএডিসি সৌদি আরব থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের চুক্তির মাধ্যমে ডিএপি সার আমদানি করে থাকে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের ডিএপি সার আমদানির জন্য গত ১৫ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে বিএডিসি ও সৌদি আরবের মা’আদেনের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তিতে নির্ধারিত প্রাইসিং ফর্মুলা অনুযায়ী বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরের ভিত্তিতে চতুর্থ লটের সারের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাবটি প্রত্যাশামূলক অনুমোদনের জন্য সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ডিএপি সার আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ৯ লাখ ৯১ হাজার টন। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে ৬ লাখ টন ডিএপি সার আমদানি করা হবে।
মোট ব্যয় প্রায় ৯৮৩ কোটি টাকা : চারটি প্রস্তাবের মধ্যে কানাডা থেকে দুই লটে ৮০ হাজার টন এমওপি সার আমদানিতে ব্যয় হবে ৩৭৯ কোটি ৩৪ লাখ ৭৯ হাজার ২০০ টাকা। রাশিয়া থেকে ৩৫ হাজার টন এমওপি আমদানিতে ব্যয় হবে ১৬৫ কোটি ৮৯ লাখ ৭৫ হাজার ৫০০ টাকা। আর সৌদি আরব থেকে ৪০ হাজার টন ডিএপি সার আমদানিতে ব্যয় হবে ৪৩৭ কোটি ৩৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে ১ লাখ ৫৫ হাজার টন সার আমদানিতে সরকারের ব্যয় হবে ৯৮২ কোটি ৬১ লাখ ২৪ হাজার ৭০০ টাকা। এসব সার আমদানির অর্থ কৃষি ভর্তুকি বাবদ বাজেট থেকে ব্যয় করা হবে।
আমন সংগ্রহে ১ কোটি পাটের বস্তা কিনবে সরকার : তা ছাড়া আসন্ন আমন সংগ্রহ মৌসুমে খাদ্যশস্য বস্তাবন্দিকরণের জন্য ১ কোটি পাটের বস্তা কিনবে সরকার। এতে ব্যয় হবে ১০৬ কোটি ৬০ লাখ ৩৫ হাজার ২০০ টাকা। খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, খাদ্য অধিদফতর উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে ই-জিপি সিস্টেমের মাধ্যমে ৫০ কেজি ধারণক্ষমতার ১ কোটি পাটের বস্তা কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করে। এতে ৩৩টি প্রতিষ্ঠান থেকে মোট ১ হাজার ১৬৮টি দরপত্র দাখিল হয়।
দরপত্র যাচাই-বাছাই শেষে ২২টি প্রতিষ্ঠানের ৮৮৫টি দরপত্র রেসপনসিভ হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তী সময়ে দরপত্রের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে টেন্ডার ইভ্যালুয়েশন কমিটি (টিইসি) ১৩টি রেসপনসিভ সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে বস্তা সরবরাহের জন্য সুপারিশ করে।
চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো নির্মাণে ৩৬৩০ কোটি টাকা অনুমোদন : অন্যদিকে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের অবকাঠামো নির্মাণে ৩ হাজার ৬২৯ কোটি ৯৫ লাখ ৮১ হাজার ৭৫ টাকা ব্যয়ের একটি ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকার। চীন সরকারের ঋণ ও সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটির আওতায় সড়ক, পানি সংরক্ষণাগার, গ্যাস সঞ্চালন লাইন, বর্জ্য শোধনাগার, বহুমুখী জেটি ও বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের জন্য সহায়ক অবকাঠামো প্রকল্প’-এর আওতায় এসব পূর্ত কাজ করা হবে। প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণ ও উপযোগ সেবার সংস্থান সংক্রান্ত কাজ চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের জন্য ২০২৩ সালের ১৬ আগস্ট সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও