এক দশকে বদলে গেছে চীন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

প্রায় এক দশক পর আবারও যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। তবে এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে

2026-09-26T11:47:55+00:00
2026-09-26T11:49:35+00:00
 
  শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১১ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
এক দশকে বদলে গেছে চীন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৪৭ এএম  আপডেট: ২৬.০৯.২০২৬ ১১:৪৯ এএম
ছবি : সংগৃহীত
প্রায় এক দশক পর আবারও যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। তবে এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠকে তিনি আসছেন আগের চেয়ে ভিন্ন এক অবস্থান থেকে। ২০১৭ সালে দুই নেতার শেষ বৈঠকের সময় যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রযুক্তি ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল চীন। এরপর ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ ও বাণিজ্যসংঘাতের মধ্য দিয়ে দেশটির অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতে বড় পরিবর্তন এসেছে।

চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতেও গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশটির নিজস্ব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল তৈরি করছে, মহাকাশ কোম্পানিগুলো পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট নিয়ে কাজ করছে। এ ছাড়া জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবট ও মেমোরি চিপ খাতের বেশ কয়েকটি চীনা কোম্পানি গত এক বছরে বড় ধরনের শেয়ারবাজার অভিষেক করেছে।

চীনের উৎপাদন খাতের বৈশ্বিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত গত বছর ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। বৈদ্যুতিক গাড়ি, সৌর প্যানেল ও চিপের বাড়তি চাহিদা এতে ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি বিরল খনিজসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় চীনের নিয়ন্ত্রণ বেইজিংকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় বাড়তি প্রভাব দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও চীনের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। সাংহাইয়ের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের ডিন উ শিনবো বলেন, প্রায় এক দশক আগের তুলনায় চীন এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। তাঁর মতে, বেইজিং এমন একটি উপায়ও খুঁজে পেয়েছে, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে ভারসাম্যের মধ্যে রাখা সম্ভব।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সি চিন পিংয়ের জন্য এবারের সফরের ঝুঁকি কম। বুধবার সন্ধ্যায় ওয়াশিংটনের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে পৌঁছান তিনি। সেখানে তাকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানান ট্রাম্প। চীনের ধীরগতির অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে প্রযুক্তিগত রূপান্তরকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ বজায় রাখাই এবারের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হতে পারে।

চীনের আত্মবিশ্বাসের বড় একটি কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাণিজ্যকে বহুমুখী করা এবং প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভরতার সক্ষমতা বাড়ানো। প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের চাপের পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবট, জৈবপ্রযুক্তি, মহাকাশ, নতুন জ্বালানি ও চিপের মতো খাতে বিপুল অর্থ ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা দিয়েছে বেইজিং।

তবে এই প্রবৃদ্ধির সুফল সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। গত মাসে চীনে তরুণদের বেকারত্ব সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কয়েক কোটি শ্রমিক জীবিকার প্রধান উৎস হিসেবে খাদ্য সরবরাহ বা রাইড শেয়ারিংয়ের মতো গিগ অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। একই সময়ে ভোক্তা ব্যয় দুর্বল, স্থানীয় সরকারগুলো ঋণের চাপে এবং আবাসন খাতের সংকটও অব্যাহত রয়েছে।

তারপরও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিয়ে দেশটির মানুষের মধ্যে এক ধরনের গর্ব রয়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

এর উদাহরণ হিসেবে হুয়াওয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের সময় মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা এই চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি জানিয়েছে, তাদের পরবর্তী প্রজন্মের অ্যাসেন্ড কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপ আগামী বছর নির্ধারিত সময়ের আগেই বাজারে আনা হবে। হুয়াওয়ের ঘূর্ণায়মান চেয়ারম্যান এরিক শু বলেছেন, চীনের চিপ সরবরাহ অন্যের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে— এমন পরিস্থিতি তারা মেনে নিতে পারে না।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন— দুই দেশেই আলোচনা বাড়ছে। ট্রাম্প বলেছেন, নিরাপত্তার কারণে এ প্রযুক্তির বিকাশ ধীর করা যাবে না; বরং চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হবে। এ পরিস্থিতিতে সি চিন পিংয়ের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর আরও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ আরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বিরত রাখা।

বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও পূর্বানুমেয় পরিবেশ চায়। চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সান ছেংহাওয়ের মতে, তাইওয়ান ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের মতো সংবেদনশীল বিষয় যেন দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্ককে অস্থিতিশীল না করে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিও চায় চীন।

দুই দেশের মধ্যে নতুন করে বাণিজ্যসংঘাত শুরু হলে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হতে পারে। গত বছরের বাণিজ্যযুদ্ধের এক পর্যায়ে দুই দেশের অর্থনীতি প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। পরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যাপকভাবে বাড়ানোর হুমকি দেয় বেইজিং। এর পরই দুই পক্ষের মধ্যে একটি সাময়িক সমঝোতা হয়।

দ্য এশিয়া গ্রুপের ব্যবস্থাপনা অংশীদার কার্ট টংয়ের মতে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কোনো পক্ষেরই একক প্রাধান্য নেই; দুই দেশের প্রভাব ও পাল্টা চাপ দেওয়ার সক্ষমতা অনেকটাই সমান। তাঁর ভাষ্য, এই ভারসাম্যের কারণেই দুই পক্ষ এমন পদক্ষেপ থেকে পিছিয়ে আসছে, যার কারণে উভয়েরই ক্ষতি হতে পারে।

সম্প্রতি পিউ রিসার্চ সেন্টারের ৩৬ দেশের জরিপে দেখা গেছে, এসব দেশের অধিকাংশেই যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বেশি। এমনকি প্রেসিডেন্ট হিসেবে সি চিন পিংয়ের প্রতি আস্থার ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের তুলনায় সামান্য এগিয়ে থাকার তথ্য উঠে এসেছে ওই জরিপে।

চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল, বৈদ্যুতিক গাড়ি, টেলিভিশন ও সাংস্কৃতিক পণ্যের বৈশ্বিক বিস্তার দেশটির সফট পাওয়ারও বাড়াচ্ছে। লাবুবুর মতো জনপ্রিয় পণ্য, চীনা নাটক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘চায়নাম্যাক্সিং’ প্রবণতা দেশটিতে পর্যটন ও আগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে সি চিন পিং একাধিক আন্তর্জাতিক সফরে চীনের নেতৃত্বের ধারণা তুলে ধরেছেন। চলতি মাসে ভারতের নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে তিনি সদস্য দেশগুলোকে স্মার্ট কারখানা স্থাপন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল তৈরিতে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন। একই মাসে মিসরে রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল নয়—এমন একটি ‘নতুন নিরাপত্তা কাঠামো’র প্রস্তাব দেন তিনি।

ইরান ইস্যুতেও চীনের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ানোর কথা বলেছে। ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হওয়ায় চীনও এ চাপের আওতায় পড়তে পারে।

এর মধ্যেই চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বেইজিংয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকের একটি উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রে সি চিন পিং ও ট্রাম্পের আলোচনার আগে ইরান ইস্যুতে কিছু বিষয় স্পষ্ট করা।

ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের উ শিনবোর মতে, ওয়াশিংটনকে চীন স্পষ্টভাবে জানাতে পারে— ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা চীনা ব্যাংক বা কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করতে এবং ইরান সংকটের সমাধানে সামরিক পদক্ষেপ বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে আলোচনার পথ বেছে নিতে।


সময়ের আলো/কেএইচ
  বিষয়:   সময়ের আলো  যুক্তরাষ্ট্র  চীন 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: