আদালতে একের পর এক জালিয়াতি

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

গাইবান্ধার আদালত পাড়ায় একের পর এক জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ্যে আসায় স্থানীয় বিচারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে সামনে এসেছে

2026-09-29T00:01:36+00:00
2026-09-29T00:01:36+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
আদালতে একের পর এক জালিয়াতি
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০১ এএম 
সংগৃহীত ছবি
গাইবান্ধার আদালত পাড়ায় একের পর এক জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ্যে আসায় স্থানীয় বিচারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে সামনে এসেছে দুটি পৃথক ঘটনা একটিতে বিচারক আদালতে না বসা সত্ত্বেও ভুয়া জামিনের আদেশ তৈরি করে আসামির হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ, অন্যটিতে প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের জাল জন্মসনদের মাধ্যমে নাবালক সাজিয়ে জামিন করানো এবং আদালতের নথি গায়েবের অভিযোগ। দুটি ঘটনাতেই জড়িয়েছে আদালতের কর্মী ও আইনজীবীদের নাম, যা নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন খোদ আইনজীবী সমাজ।

শুনানি ছাড়াই হাতে এলো জামিনের ভুয়া আদেশ : নারী নির্যাতন মামলার আসামি জান্নাতুল ইসলাম গত ২১ সেপ্টেম্বর হাতে পান নিজের জামিনের আদেশ। নিয়ম অনুযায়ী তিনি ‘রিকল’ নামে পরিচিত সেই আদেশ জমা দেন গোবিন্দগঞ্জ থানায়। কয়েক দিন পর জানতে পারেন, আদেশটি ভুয়া। জান্নাতুলের অভিযোগ, এই জালিয়াতির পেছনে রয়েছেন মুহুরি শাহীন ও আদালতের বেঞ্চ সহকারী গাজী আলী আহসান। মামলা নিষ্পত্তি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা তার কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা নিয়েছেন বলেও অভিযোগ নারী নির্যাতন মামলার আসামি জান্নাতুল ইসলামের। ভুক্তভোগীর স্বজন সাজু মিয়া জানান, পেশকারের সহায়তায় দেড় লাখের বেশি টাকা দাবি করা হলে দরকষাকষির পর তারা এক লাখ চল্লিশ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। জান্নাতুল জানান, ফোনে তাকে জানানো হয়েছিল জামিন হয়ে গেছে, কিন্তু পরে জানা যায় থানায় পাঠানো কাগজটিই ভুয়া।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর বিচারক অনুপস্থিত থাকায় গাইবান্ধার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ সেদিন বসেনি এবং কোনো মামলার শুনানিও হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে জামিনের রিকল কীভাবে ইস্যু হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুললে অভিযুক্ত দুজনই দায় অস্বীকার করেন। মুহুরি শাহীনের দাবি, তিনি দরখাস্ত জমা দিয়েছেন ২২ তারিখে এবং রিকলটি তার মাধ্যমে হয়নি। বেঞ্চ সহকারী গাজী আলী আহসানও দাবি করেন, রিকলটি তিনি দেননি, বরং অভিযুক্তরাই ভুয়া কাগজ তৈরি করে থানায় জমা দিয়েছে। তিনি জানান, এ বিষয়ে জিডির খসড়া তৈরি করলেও নানা জটিলতায় তা এখনও দাখিল করা হয়নি। ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর ২২ সেপ্টেম্বর নতুন করে জামিন আবেদন করা হয় ওই আসামির পক্ষে। এ নিয়ে জড়িতদের শাস্তি দাবি করেছেন আইনজীবীরা। এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে গাইবান্ধার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর পিপি আবু বকর সিদ্দিক ছানা বলেন, এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এ ধরনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর শুধু আদালতের নয়, পুরো গাইবান্ধা জেলার সম্মানহানি হয়েছে। রিকল-জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনার দাবিও জানান গাইবান্ধার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর পিপি আবু বকর সিদ্দিক ছানা।

উল্লেখ্য, এর আগেও গাইবান্ধার আদালতে সাবালক আসামিকে নাবালক সাজিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছিল। আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও সেই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে এখনও কোনো মামলা হয়নি।

জাল জন্মসনদে জামিন, নথি গায়েবের অভিযোগে নতুন মামলা : এদিকে অনুরূপ আরেকটি ঘটনায় গোবিন্দগঞ্জে জাল জন্মসনদ তৈরি করে প্রাপ্তবয়স্ক চার আসামিকে শিশু দেখিয়ে জামিন করানো, আদালতের অর্ডারশিটে কাটাকাটি এবং মামলার নথি গায়েবের অভিযোগে জেলা বারের এক আইনজীবী, সাবেক এক কোর্ট জিআরওসহ তিনজনের বিরুদ্ধে নতুন মামলা হয়েছে।

গাইবান্ধা শিশু আদালত-২-এর বিচারক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইফতেখার বিন আজিজের নির্দেশে গোবিন্দগঞ্জ আমলি আদালতের বেঞ্চ সহকারী সানোয়ার হোসেন বাদী হয়ে গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে গোবিন্দগঞ্জ থানায় মামলাটি করেন যা নিশ্চিত করেছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) স্বপন কুমার।

মামলার তথ্যমতে, তিনটি পৃথক মামলায় প্রাপ্তবয়স্ক চার আসামিকে শিশু দেখিয়ে জামিন করানোর অভিযোগ ওঠে জেলা বারের আইনজীবী শেফাউল ইসলাম রিপনের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে আদালতের নথি গায়েব এবং অর্ডার শিটের আদেশ কাটাকাটিরও অভিযোগ পাওয়া যায়। বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় গোবিন্দগঞ্জ আমলি আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এসএম গালিব হাসানকে। গত ১৯ আগস্ট তিনি আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন, যেখানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে আইনজীবী শেফাউল ইসলাম রিপনের সনদ বাতিল এবং তার মুহুরি হাসান আলীর নিবন্ধনপত্র বাতিলের সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে গোবিন্দগঞ্জ চৌকি আদালতের তৎকালীন জিআরও পুলিশ সদস্য আব্দুস সবুরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। তদন্ত প্রতিবেদনে এ ধরনের ঘটনাকে দেশের বিচার বিভাগের জন্য ‘কালো অধ্যায়’ আখ্যা দিয়ে একটি পর্যবেক্ষণও দেন আদালত। প্রতিবেদন পাওয়ার পর গত ৩০ আগস্ট শিশু আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইফতেখার বিন আজিজ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশ দেন। এ-সংক্রান্ত আদেশ ২ সেপ্টেম্বর গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পৌঁছালে তারই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার মামলাটি করা হয়।

একই সূত্রে গাথা দুই ঘটনা : স্বল্প সময়ের ব্যবধানে সামনে আসা এই দুটি ঘটনা গাইবান্ধার আদালত অঙ্গনে দালাল-চক্র এবং নথি-জালিয়াতির একটি বিস্তৃত বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভুয়া রিকল আদেশ থেকে শুরু করে, জাল জন্মসনদ কিংবা নথি গায়েব- প্রতিটি ঘটনাতেই সরাসরি জড়িয়েছে আদালতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মী বা আইনজীবীদের নাম। আইনজীবীরা বলছেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আর যদি তা নিশ্চিত করা না যায় তা হলে বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের আদালতের প্রতি আস্থা আরও ক্ষুন্ন হবে।


সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেআই
  বিষয়:   আদালত. গাইবান্ধা  জালিয়াতি 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: