যুক্তরাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত একটি বিমানঘাঁটির কাছে ‘সন্ত্রাসবাদ’ ও বিস্ফোরক-সংক্রান্ত অভিযোগে গ্রেপ্তার পাঁচজনকে জামিনে মুক্তি দিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে ওই ঘটনায় ইরানের সম্পৃক্ততার অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন ও বিদ্বেষপূর্ণ’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে দেশটি।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) পাঁচজনকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। তাদের সবাই ব্রিটিশ নাগরিক এবং বয়স ২০-এর কোঠার শুরুর দিকে। তারা লন্ডনের বাসিন্দা।
এর আগে রোববার তিনটি ভ্যান বিমানঘাঁটির আশপাশের গ্রামাঞ্চলে দেখা যাওয়ার পর তাদের আটক করা হয়। যুক্তরাজ্যের মালিকানাধীন রয়্যাল এয়ার ফোর্স ফেয়ারফোর্ড (আরএএফ ফেয়ারফোর্ড) ঘাঁটিটি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধে ব্যবহার করছে ওয়াশিংটন। এ ঘাঁটিকে ঘিরে আগে থেকেই যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ হয়ে আসছে।
যুক্তরাজ্যের কাউন্টার টেররিজম পুলিশের প্রধান লরেন্স টেলর বলেন, জামিনে মুক্তি দেওয়া হলেও তদন্ত শেষ হয়নি। কঠোর কিছু শর্তে তাদের জামিন দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘তদন্ত শেষ হয়েছে— এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। তারা এখনো তদন্তের আওতায় রয়েছেন। আমরা একাধিক দিক থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।’
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির পেছনে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ইরান, রাশিয়া কিংবা কোনো অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে গ্রেপ্তার পাঁচজনের সঙ্গে ইরানের সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য পুলিশ প্রকাশ করেনি।
তাদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইন এবং ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি’র সন্দেহে তদন্ত চলছে।
ইরানের ‘সম্পৃক্ততা’ নিয়ে আপত্তি
যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত ইরানি দূতাবাস সোমবার এক বিবৃতিতে বিমানঘাঁটির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরানের সম্পৃক্ততার যে ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
দূতাবাস বলেছে, কিছু ব্রিটিশ ব্যক্তি ও সংবাদমাধ্যমের করা ‘ভিত্তিহীন ও বিদ্বেষপূর্ণ জল্পনা’ ইরান ‘দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান ও নিন্দা’ করছে। এ ধরনের বক্তব্য যুক্তরাজ্যে ‘ইরানভীতি ছড়ানোর প্রচারণা’কে উসকে দেবে বলেও সতর্ক করেছে তারা।
এ ঘটনায় ‘উপযুক্ত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার’ অধিকার ইরান সংরক্ষণ করে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ঘটনাটির সঙ্গে ইরানের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘হতে পারে’ ঘটনাটি ইরানের সঙ্গে সম্পর্কিত। একই সঙ্গে সন্দেহভাজনদের জামিনে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এর আগে রোববার ট্রাম্প বলেছিলেন, ওই ব্যক্তিরা ‘বড় ধরনের ক্ষতি’ করতে চেয়েছিলেন এবং যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ তাদের বিষয়ে তদন্ত করছিল। তার এই বক্তব্যের পর বিমানঘাঁটির এত কাছে পৌঁছানোর পরও সন্দেহভাজনদের কীভাবে নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছিল, তা নিয়ে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যমে প্রশ্ন ওঠে।
কৃষকের ফোনে সতর্ক পুলিশ
রোববার এক কৃষকের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ বিমানঘাঁটির আশপাশে অভিযান শুরু করে। ওই কৃষক জানান, তিনি তিনটি সন্দেহজনক গাড়িকে বিমানঘাঁটির দিকে যেতে দেখেছেন।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, মুখোশ ও হুড পরা কয়েকজনকে মাঠের দিকে দৌড়ে যেতে দেখেছেন। তার ধারণা, সেখানে প্রায় ১০ জন থাকতে পারে। জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করার কারণেই সম্ভাব্য কোনো হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে যুক্তরাজ্যের জাতীয় সংবাদ সংস্থা পিএ সূত্র উল্লেখ না করে জানিয়েছে, পুলিশ ঘটনাস্থলে কার্যকর কোনো বিস্ফোরক খুঁজে পায়নি।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেন, ওই কৃষক তদন্তের ‘আংশিক চিত্র’ দেখেছেন। তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি।
স্ট্রিটিং বলেন, ‘আমরা জানি, ইরান ও তাদের মিত্রগোষ্ঠীগুলো আমাদের ক্ষতি করতে চায়। আমরা জানি, তারা আমাদের গণতন্ত্রকে ঘৃণা করে। আমাদের স্বার্থ কিংবা মিত্রদের বিরুদ্ধে ইরানের হুমকি প্রতিহত করতে নিয়মিতভাবে ব্যবস্থা নিতে হয়।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডও বলেন, ইউরোপ ও বিশ্বের সামনে থাকা সব ধরনের নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যকে প্রস্তুত থাকতে হবে। তিনি বলেন, ‘ইরানের মিত্রগোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব।’
এদিকে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম ঘটনাটি নিয়ে সরকারের জরুরি প্রতিক্রিয়া কমিটির বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছেন।
এর আগে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা থেকে জাহাজগুলোকে সুরক্ষায় যুক্তরাজ্য সরকার আরএএফ ফেয়ারফোর্ড থেকে বোমারু বিমান পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অনুমতি দেয়। গত জুলাইয়ে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিকে বৈধ লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
সময়ের আলো/কেএইচ