পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় অবৈধভাবে বালি ও পাথর উত্তোলনের দায়ে দায়ের করা একটি মামলায় অদ্ভুত এক জালিয়াতির চিত্র ফুটে উঠেছে। বালি উত্তোলনে জড়িত প্রকৃত ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে কয়েক দশক আগে মারা যাওয়া ৫ জন মৃত ব্যক্তি এবং বেশ কয়েকজন নিরপরাধ মানুষকে আসামি করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রশাসন ও ভূমি অফিসের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং সংশ্লিষ্ট তহশিলদারের দায়িত্ব নিয়ে জনমনে চরম ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, গত ১৫ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) উপজেলার ভজনপুর ইউনিয়নের পোহাতুগছ এলাকায় অবৈধ পাথর-বালি উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান চালান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম আকাশ। অভিযানে তিনটি ড্রেজার মেশিন জব্দ করা হয়। ওই রাতেই ভজনপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার মানিক চন্দ্র বর্মন বাদী হয়ে ২২ জনের নাম উল্লেখ করে ‘খনি ও খনিজ সম্পদ ১৯৯২’-এর ৫ ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলার এজাহার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে কাউরগছ এলাকার ফয়জুল হককে, যিনি প্রায় ৩০-৩৫ বছর আগে মারা গেছেন। ২ নম্বর আসামি করা হয়েছে তার দাদা মহর আলীকে, যিনি মারা গেছেন ৪৪-৪৫ বছর আগে। ৫ নম্বর আসামি করা হয়েছে মহামুদ্দিনকে, ১০ নম্বর আসামি রমজান আলী এবং ১৪ নম্বর আসামি মজিবর রহমান—যাঁরা প্রত্যেকেই কয়েক দশক আগে পরলোকগমন করেছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা তাদের স্বজনদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে এই মামলার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। মৃত মহামুদ্দিনের নাতি সামিউল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, আমার দাদাকে আমি জন্মের পর দেখিনি, বাবাও তাকে ছোটবেলায় হারিয়েছেন। অথচ আজ আমার মৃত দাদার নামে ড্রেজার মামলা দেওয়া হয়েছে। এটি শুধু দুঃখজনক নয়, প্রশাসনের দায়িত্বহীনতার চূড়ান্ত প্রমাণ।
এই ‘গায়েবি’ মামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে গত ১৬ সেপ্টেম্বর ভজনপুর বাজারে তেঁতুলিয়া-পঞ্চগড় মহাসড়ক অবরোধ করেন ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। এ সময় তহশিলদারকে অবরুদ্ধ করার মতো ঘটনাও ঘটে। পরে এসিল্যান্ড এসএম আকাশ এবং পুলিশের উপস্থিতিতে মামলা প্রত্যাহারের আশ্বাসে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা কর্মকর্তাদের মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তহশিলদার মানিক চন্দ্র বর্মন মোবাইলফোনে সাংবাদিকদের বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে জমির ‘হোল্ডিং’ বা খতিয়ান দেখে নাম দেওয়া হয়েছে। তবে তদন্ত না করে কেন মৃত ব্যক্তিদের নাম দেওয়া হলোতার কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।
এদিকে, অভিযানে নেতৃত্বদানকারী সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম আকাশের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। গাড়িতে ওঠার সময় তিনি বলেন, মামলায় কিছু ত্রুটি হয়েছে, প্রত্যাহারের জন্য বলা হয়েছে। পুলিশ তদন্ত করে রিপোর্ট দিলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তেঁতুলিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লাইছুর রহমান জানান, ২২ জনের নামে মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন। মামলা প্রত্যাহারের জন্য একটি আবেদন পাওয়া গেছে, যা আইন ও আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে।
তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আনোয়ার হোসাইন স্বীকার করেছেন যে, খতিয়ান দেখে নাম দেওয়ার কারণে মৃত ব্যক্তিদের নাম চলে এসেছে। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত সংশোধনের আশ্বাস দিয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় বিপুল পরিমাণ অবৈধ মেশিন চললেও মাত্র ৩টি মেশিন জব্দ করে দায় সারা হয়েছে। উপরন্তু, প্রকৃত অপরাধীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখে মৃত ও নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করার এই ঘটনা প্রশাসনের সক্ষমতা ও সততা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
সময়ের আলো/জোই