ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ছিলেন দেশের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া থেকে শুরু করে তীব্র খাদ্য সংকট মোকাবেলা— স্বল্প সময়ের প্রধানমন্ত্রিত্বে নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। তবে মৃত্যুর পর বিপুল সম্পদ নয়, একটি ফিয়াট গাড়ির ঋণই রেখে গিয়েছিলেন এই নেতা।
ভারতে প্রতিবছর ২ অক্টোবর মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনের পাশাপাশি লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর জন্মবার্ষিকীও পালন করা হয়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থেকেও তার সাদামাটা জীবনযাপন ও ব্যক্তিগত সততার কারণে তিনি আজও স্মরণীয়।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, সন্তানদের অনুরোধে শাস্ত্রী একটি ফিয়াট গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নেন। গাড়িটির দাম ছিল প্রায় ১২ হাজার রুপি। তখন তার নিজের সঞ্চয় ছিল ৭ হাজার রুপি। বাকি ৫ হাজার রুপি তিনি পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক (পিএনবি) থেকে ঋণ নেন।
১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে তাসখন্দে আকস্মিক মৃত্যুর সময়ও ওই ঋণ পুরোপুরি পরিশোধ করা হয়নি। পরে সরকার ঋণটি মওকুফ করে দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও তার স্ত্রী ললিতা শাস্ত্রী তা গ্রহণ করেননি। পারিবারিক পেনশন থেকে তিনি ধীরে ধীরে ঋণের টাকা পরিশোধ করেন। বর্তমানে নয়া দিল্লির লাল বাহাদুর শাস্ত্রী মেমোরিয়ালে সেই ফিয়াট গাড়িটি সংরক্ষিত রয়েছে।
শৈশব থেকেই ছিল সাদামাটা জীবন
১৯০৪ সালের ২ অক্টোবর উত্তর প্রদেশের মুঘলসরাইয়ে দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। ছোটবেলাতেই বাবাকে হারান তিনি। নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন। পরে নিজের জাতিগত পদবি ‘শ্রীবাস্তব’ বাদ দিয়ে কাশি বিদ্যাপীঠ থেকে পাওয়া ‘শাস্ত্রী’ উপাধিকে নিজের নামের অংশ করেন।
রাজনীতিতে আসার পর নয়, শৈশব থেকেই অনাড়ম্বর জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন শাস্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই সততা ও নৈতিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তিনি। ১৯৫৬ সালে একটি বড় ট্রেন দুর্ঘটনার পর তৎকালীন রেলমন্ত্রী হিসেবে দুর্ঘটনার নৈতিক দায় নিজের ওপর নিয়ে পদত্যাগ করেন শাস্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু প্রথমে তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করতে না চাইলেও শাস্ত্রীর দৃঢ় অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত তা মেনে নেন।
১৯৬৪ সালের মে মাসে নেহরুর মৃত্যুর পর ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন শাস্ত্রী। সে সময় দেশটি অর্থনৈতিক সংকট, খাদ্যঘাটতি এবং নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল।
১৯৬৫ সালের যুদ্ধে কঠোর অবস্থান
শাস্ত্রীর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। ওই বছরের আগস্টে পাকিস্তান কাশ্মির দখলের উদ্দেশ্যে ‘অপারেশন জিব্রালটার’ ও ‘অপারেশন গ্র্যান্ড স্ল্যাম’ শুরু করলে ভারত পাল্টা জবাব দেয়।
৬ সেপ্টেম্বর শাস্ত্রীর নির্দেশে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাঞ্জাব সীমান্ত অতিক্রম করে লাহোরের দিকে অগ্রসর হয়। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক প্রেম প্রকাশ তার ‘রিপোর্টিং ইন্ডিয়া: মাই সেভেন্টি-ইয়ার জার্নি অ্যাজ আ জার্নালিস্ট’ বইয়ে এই সিদ্ধান্তকে যুদ্ধের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক বলে উল্লেখ করেছেন। যুদ্ধের পর শাস্ত্রীর জনপ্রিয়তাও বেড়ে যায়।
খাদ্য সংকটেও নিয়েছিলেন কঠিন সিদ্ধান্ত
যুদ্ধের পাশাপাশি সে সময় ভারত তীব্র খাদ্য সংকটে পড়েছিল। গমের উৎপাদন কম থাকায় দেশটিকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছিল। পরিস্থিতি মোকাবেলায় শাস্ত্রী দেশবাসীকে সপ্তাহে অন্তত এক বেলা খাবার না খাওয়ার আহ্বান জানান। পরে এটি ‘সোমবারের উপবাস’ নামে পরিচিত হয়।
দেশবাসীর কাছে এই আহ্বান জানানোর আগে নিজের পরিবারে তা প্রয়োগ করে দেখেছিলেন শাস্ত্রী। একই সঙ্গে দেশের নিরাপত্তা ও খাদ্য উৎপাদনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি দেন ঐতিহাসিক স্লোগান— ‘জয় জওয়ান, জয় কিষান’।
তাসখন্দেই শেষ জীবন
১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সঙ্গে তাসখন্দে বৈঠকে বসেন শাস্ত্রী। সোভিয়েত ইউনিয়নের কূটনৈতিক উদ্যোগে অনুষ্ঠিত আলোচনার পর ১৯৬৬ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি ঐতিহাসিক তাসখন্দ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন।
তবে চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক ঘণ্টা পর, ১১ জানুয়ারি তাসখন্দেই মারা যান লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১৮ মাসের মাথায় তাঁর মৃত্যু হয়।
দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েও ব্যক্তিগত জীবনে বড় কোনো সম্পদ গড়ে না তুলে একটি গাড়ির ঋণ রেখে যাওয়া এবং জাতীয় স্বার্থে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ভারতের ইতিহাসে আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন।
সূত্র : ইন্ডিয়া টুডে
সময়ের আলো/ইউএমএইচ