মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম দক্ষিণ ক্রোকচর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে কুমিল্লার একটি মালাই চায়ের ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হন কয়েকজন কলেজশিক্ষার্থী। এরপর মাত্র ৫০ হাজার টাকা মূলধন ও নিজেদের শ্রমে গড়ে তোলেন ‘চায়ের কুটির’ নামে একটি চায়ের দোকান। শুরুতে গ্রামের মানুষের হাস্যরসের শিকার হলেও দমে যাননি তারা। এক মাসের ব্যবধানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে তাদের দোকান। এখন প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চায়ের স্বাদ নিতে ভিড় করছেন শিবচরসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মানুষ। উদ্যোক্তাদের দাবি, বর্তমানে তাদের মাসিক আয় প্রায় দেড় লাখ টাকা।
উদ্যোক্তারা জানান, গ্রামের যে জায়গায় তারা বিকেলবেলা আড্ডা দিতেন, সেখানেই চায়ের দোকান গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন। প্রথম দিকে দোকানের স্থাপনা নির্মাণের সময় স্থানীয় অনেকেই তাদের নিয়ে হাস্যরস করেন। তবে এসব উপেক্ষা করে নিজেদের উদ্যোগে শুরু করেন চায়ের ব্যবসা। কয়েক দিনের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তাদের চায়ের দোকানের ভিডিও। এরপর থেকেই বাড়তে থাকে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের ভিড়।
বর্তমানে শিবচর ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ আসছেন ‘চায়ের কুটিরে’। কেউ আসছেন পরিবার নিয়ে, কেউবা বন্ধুদের সঙ্গে। চায়ের স্বাদের পাশাপাশি গ্রামীণ পরিবেশও আকৃষ্ট করছে দর্শনার্থীদের। প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে তৈরি হচ্ছে মানুষের মিলনমেলা। পড়াশোনার পাশাপাশি তরুণদের এমন উদ্যোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও প্রশংসা কুড়াচ্ছে।
চা খেতে আসা খাদিজা আক্তার বলেন, ফেসবুকে দেখেছি, এখানে একটি চায়ের দোকান হয়েছে। তখনই ভেবেছিলাম একদিন আসব। আজ ছুটির দিন, তাই পরিবারের সঙ্গে ঘুরতে এসেছি। অনেকের মুখে শুনেছি, এখানকার চা বেশ সুস্বাদু। শিবচরে ঘোরাঘুরির জায়গাও তেমন নেই। তাই চা খাওয়ার পাশাপাশি একটু ঘোরাঘুরি করতে চলে এলাম।
সৌদি আরবপ্রবাসী জুনায়েদ মিয়া বলেন, কিছুদিন আগে দেশে এসেছি। কয়েক দিন আগে ইউটিউব, টিকটক ও ফেসবুকে এই ভাইরাল চায়ের দোকানের ভিডিও দেখেছি। তাই পরিবার নিয়ে চলে এলাম। বিকেলের সময়টা পরিবারের সঙ্গে এখানে কাটাতে পেরে খুব ভালো লাগছে। এখানকার চা সত্যিই অনেক সুস্বাদু। একবার খেলে আবার খেতে ইচ্ছে করে।
আরেক দর্শনার্থী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখানকার ভাইরাল চায়ের বিষয়ে জানতে পেরেছি। তাই বন্ধুদের নিয়ে চা খেতে এসেছি। চায়ের পাশাপাশি এখানকার পরিবেশটাও বেশ সুন্দর। সব মিলিয়ে সময়টা ভালো কাটছে।
চায়ের কুটিরের উদ্যোক্তা সবুজ মিয়া বলেন, এখানে চায়ের দোকান শুরু করেছি মাত্র এক মাস হলো। প্রথম দিকে কিছুটা নার্ভাস ছিলাম। তবে আলহামদুলিল্লাহ, এখন সবকিছু ভালোভাবেই চলছে। ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এখানে চা খেতে আসছেন। আমাদের জন্য সবাই দোয়া করবেন, যেন চায়ের দোকানের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে পারি।
দোকানটির আরেক উদ্যোক্তা দ্বীন ইসলাম বলেন, টিকটকে কুমিল্লার একটি মালাই চায়ের ভিডিও দেখে আমাদের এমন একটি দোকান দেওয়ার চিন্তা মাথায় আসে। পরে নিজেদের উদ্যোগে মাত্র ৫০ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে চায়ের কুটির গড়ে তুলি। এখানে মালাই চা, পোড়া রুটি, দুধ চা ও কফি পাওয়া যায়। প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কেজি দুধ দিয়ে চা তৈরি করা হয়। পাশাপাশি ২০ থেকে ২৫ কেজি রুটি বিক্রি হয়। প্রতিদিন আমাদের আয় প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।
মাত্র ৫০ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে শুরু করা এই উদ্যোগ এক মাসের মধ্যেই তরুণ উদ্যোক্তাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। নিজেদের পরিশ্রম, উদ্ভাবনী চিন্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণাকে কাজে লাগিয়ে তারা প্রত্যন্ত গ্রামের একটি আড্ডার জায়গাকে পরিণত করেছেন জনপ্রিয় চায়ের দোকানে। তাদের এই উদ্যোগ শুধু নিজেদের আয়ের পথ তৈরি করেনি, বরং এলাকার অন্য তরুণদেরও স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
সময়ের আলো/জোই