ব্যাংকের শাখা বা ওয়েবসাইটে লগইন করে নয়, এখন স্মার্টফোনের একটি অ্যাপ থেকেই ব্যাংকিংয়ের বড় অংশ সেরে ফেলছেন কোটি কোটি গ্রাহক। আর এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে আন্তঃব্যাংক ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবস্থা বাংলা কিউআর। ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) অ্যাপ দিয়ে সহজে কিউআর পেমেন্টের সুযোগ তৈরি হওয়ায় দ্রুত বাড়ছে অ্যাপভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহারকারী প্রায় তিন গুণ হয়ে গত জুলাই শেষে ২ কোটি ৯ লাখ ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের আগস্টে ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহারকারী ছিল প্রায় ৭১ লাখ ৬৬ হাজার। এক বছরের ব্যবধানে ব্যবহারকারী বেড়েছে প্রায় ১ কোটি ৩৮ লাখ। অর্থাৎ শুধু নতুন গ্রাহক যুক্ত হওয়া নয়, ব্যাংকিং সেবার ধরনেও বড় পরিবর্তন আসছে।
কিউআর থেকে অ্যাপে, অ্যাপ থেকে ব্যাংকিংয়ে
দেশে আন্তঃব্যাংক কোডভিত্তিক লেনদেনের জন্য ২০২৩ সালে বাংলা কিউআর চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক সেবার মধ্যে কোডভিত্তিক লেনদেনকে একটি অভিন্ন ব্যবস্থার আওতায় আনা। সময়ের সঙ্গে এই ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়তে থাকে। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে সব প্রতিষ্ঠানের কোডভিত্তিক লেনদেন বাংলা কিউআরের মাধ্যমে করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর ফলে কিউআরভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে।
বাংলা কিউআরের বিশেষ সুবিধা হলো, কোনো একটি নির্দিষ্ট ব্যাংকের গ্রাহককে শুধু সেই ব্যাংকের মাধ্যমেই লেনদেন করতে হচ্ছে না। যেকোনো ব্যাংক কিংবা এমএফএস অ্যাপ ব্যবহার করেও কিউআর কোড স্ক্যান করে অর্থ পরিশোধ করা যাচ্ছে। ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে সাধারণ ক্রেতা— দুই পক্ষের জন্যই ডিজিটাল লেনদেন সহজ হয়েছে।
এর পাশাপাশি বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেনের অর্থ দ্রুত হিসাবে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকায় ব্যবসায়ীদের আগ্রহও বাড়ছে। ফলে কিউআরভিত্তিক লেনদেন শুধু গ্রাহকের সুবিধা নয়, ব্যবসায়ীদের জন্যও একটি কার্যকর ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে।
এক বছরে ব্যবহারকারী বেড়েছে প্রায় তিন গুণ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, বাংলা কিউআর ও ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তারের সময়েই ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। গত বছরের নভেম্বরেও অ্যাপভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহারকারী ছিল ৮৫ লাখ ৭২ হাজারের মতো। মাত্র এক মাস পর ডিসেম্বরেই তা বেড়ে ১ কোটি ৪৯ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এরপর ধারাবাহিকভাবে ব্যবহারকারী বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত গত জুলাইয়ে অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২ কোটি ৯ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি।
ব্যবহারকারীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ১ কোটি ৬৭ লাখ ৭২ হাজারের বেশি। আর নারী ব্যবহারকারী রয়েছেন ৩৮ লাখের বেশি। অর্থাৎ ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও মোট ব্যবহারকারীর তুলনায় এখনও পুরুষের অংশগ্রহণ অনেক বেশি।
অ্যাপের সঙ্গে বাড়ছে লেনদেনও
শুধু ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়েনি, ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে ১ লাখ ৭৪ হাজার ১২৯ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এক বছর আগে, গত আগস্টে এ ধরনের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা।
তবে একক মাস হিসেবে জুলাইয়ে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়নি। গত জুনে ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছিল ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। ওই মাসে কুরবানির ঈদ থাকায় কেনাকাটা ও অন্য আর্থিক কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় অ্যাপভিত্তিক লেনদেনও বেশি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। অর্থাৎ গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি অ্যাপের ব্যবহারও এখন দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
ব্রাউজারভিত্তিক ব্যাংকিংয়ে উল্টো চিত্র
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের এই পরিবর্তনে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাচ্ছে প্রচলিত ব্রাউজারভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যাংকিং। ব্যাংকের ওয়েবসাইটে গিয়ে সেবা নেওয়া গ্রাহকের সংখ্যা এখন অ্যাপ ব্যবহারকারীদের তুলনায় অনেক কম। গত জুলাই শেষে ব্রাউজারভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহারকারী ছিল ২৪ লাখ ৮৯ হাজার। বিপরীতে অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২ কোটি ৯ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি।
অ্যাপ ও ব্রাউজার— দুই পদ্ধতি মিলিয়ে মোট ইন্টারনেট ব্যাংকিং গ্রাহকের সংখ্যা গত জুলাই শেষে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৩৪ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি। গত বছরের আগস্টে এ সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৯ লাখ ৬৭ হাজারের মতো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মোট ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহারকারীর সংখ্যাও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে এই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হচ্ছে মোবাইল অ্যাপ।
ব্যাংকগুলোর ডিজিটাল রূপান্তরও ত্বরান্বিত
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, একটা সময় অ্যাপভিত্তিক লেনদেনকে মূলত এমএফএসের সঙ্গে সম্পর্কিত মনে করা হতো। কিন্তু বাংলা কিউআর চালুর পর ব্যাংক ও এমএফএসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এর গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেছে।
তার মতে, যেসব ব্যাংকের নিজস্ব অ্যাপ ছিল না তাদেরও এ ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফলে একদিকে ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে এসব অ্যাপের মাধ্যমে লেনদেনও বাড়ছে।
এতে বোঝা যায়, বাংলা কিউআর শুধু একটি পেমেন্ট ব্যবস্থা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে ব্যাংকের ডিজিটাল সেবা, অ্যাপের ব্যবহার এবং গ্রাহকের দৈনন্দিন আর্থিক কর্মকাণ্ড— সবকিছুরই একটি যোগসূত্র তৈরি হচ্ছে।
বদলে যাচ্ছে ব্যাংকিংয়ের হিসাব
একসময় ব্যাংকিং সেবার প্রধান কেন্দ্র ছিল শাখা। এরপর এটিএম ও ওয়েবভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেই নির্ভরতা কিছুটা কমায়। এখন সেই পরিবর্তনের পরবর্তী ধাপ হিসেবে সামনে এসেছে মোবাইল অ্যাপভিত্তিক ব্যাংকিং।
বাংলা কিউআরের বিস্তার এই পরিবর্তনকে আরও দ্রুত করছে। একটি কিউআর কোড ব্যবহার করে একাধিক ব্যাংক ও এমএফএসের অ্যাপ থেকে অর্থ পরিশোধের সুযোগ গ্রাহকের সামনে ডিজিটাল লেনদেনকে সহজ করে তুলছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের হিসাবেও অর্থ দ্রুত জমা হওয়ায় তারা কিউআরভিত্তিক লেনদেনে উৎসাহিত হচ্ছেন।
ফলে ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭১ লাখ থেকে এক বছরের ব্যবধানে ২ কোটি ছাড়িয়ে যাওয়াকে কেবল প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবৃদ্ধি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর মধ্য দিয়ে গ্রাহকের ব্যাংকিং অভ্যাসেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।
আগামী দিনে বাংলা কিউআর আরও বিস্তৃত হলে ব্যাংক ও এমএফএস অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। আর তাতে ব্যাংকের শাখা বা ওয়েবসাইটের পরিবর্তে গ্রাহকের হাতে থাকা স্মার্টফোনই হয়ে উঠতে পারে দৈনন্দিন ব্যাংকিংয়ের প্রধান মাধ্যম।
সময়ের আলো/জেডআই