দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার মান নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ যেন কাটছেই না। উড়োজাহাজ থেকে নামার পর ইমিগ্রেশন, লাগেজ সংগ্রহ, কাস্টমস পার হওয়া থেকে শুরু করে বিমানবন্দর ত্যাগ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে ভোগান্তিতে পড়ছেন এমন অভিযোগ যাত্রীদের।
বিশেষ করে লাগেজ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, লাগেজ খোলা ও ভাঙাচোরা অবস্থায় পাওয়ার অভিযোগ, দায়িত্বশীলদের অপেশাদার আচরণ এবং ইমিগ্রেশনে দীর্ঘ সারি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার শাহজালালের নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে সিনক্রিয়েট করেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান।
এতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদসহ কয়েকজনের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন তিনি। ঘটনায় ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এ ঘটনায় করা মামলায় এখন কারাগারে রয়েছেন তিনি।
এ ছাড়া গত বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে মদিনা থেকে বিজি৩৩৮ ফ্লাইটটি ঢাকায় অবতরণ করে। এরপর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও ফ্লাইটটির অনেক যাত্রী তাদের ট্যাগযুক্ত লাগেজ পাননি। বিষয়টি নিয়ে শেরপুর-১ আসনের মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ, ঢাকা-৫ আসনের মোহাম্মদ কামাল হোসেন, গাজীপুর-৪ আসনের সালাহউদ্দীন আইউবী ও খুলনা-২ আসনের জাহাঙ্গীর হুসাইন— এই চার সংসদ-সদস্য বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগে বলা হয়, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও যাত্রীরা লাগেজ পাননি। লাগেজ না পাওয়ার বিষয়ে যথাযথ কারণও জানানো হয়নি। এতে যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন এবং তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
একই দিন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দীর্ঘ ভোগান্তির অভিযোগ তুলে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন জনপ্রিয় ট্রাভেল কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও দন্ত চিকিৎসক ডা. ওরাকাতুল জান্নাত। ওমরা শেষে দেশে ফেরার পর ফেসবুক লাইভে বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ট্রলি পেতে আধা ঘণ্টা থেকে ৪০ মিনিট এবং লাগেজ পেতে প্রায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে।
বিমানবন্দরের ব্যাগেজ ক্লেইম এলাকায় দীর্ঘ লাইন ও বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় বয়স্ক ব্যক্তি ও শিশুদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, ৫০০ মিটার থেকে এক কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক দেশি-বিদেশি যাত্রী আসা-যাওয়া করেন। নতুন টার্মিনালসহ নানা অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও যাত্রীসেবার ক্ষেত্রে কাঙ্খিত পরিবর্তন না আসায় প্রশ্ন উঠছে। যাত্রীদের অভিযোগ, বিমানবন্দরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বাড়লেও সেবার ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়ে গেছে।
লাগেজ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা
যাত্রীদের সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি লাগেজ পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হওয়া। অনেক সময় উড়োজাহাজ থেকে নেমে ইমিগ্রেশন শেষ করার পরও ব্যাগেজ বেল্টের সামনে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। কোনো কোনো ফ্লাইটের যাত্রীদের দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। বিশেষ করে পরিবারের সদস্য, বয়স্ক ব্যক্তি ও শিশুদের নিয়ে ভ্রমণকারীদের জন্য এ অপেক্ষা আরও দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
যাত্রীদের অভিযোগ, উড়োজাহাজ থেকে যাত্রী নামার পর দ্রুত লাগেজ সরবরাহের কার্যকর ব্যবস্থাপনা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে ব্যাগেজ বেল্টে লাগেজ আসতে দেরি হওয়ায় যাত্রীদের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। আন্তর্জাতিক যাত্রীদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও লাগেজ না পাওয়ায় পরবর্তী পরিবহন বা সংযোগ ফ্লাইট নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
খোলা ও ভাঙ্গা অবস্থায় লাগেজ
লাগেজ নিয়ে আরেকটি বড় অভিযোগ হলো ব্যাগ খোলা, জিনিসপত্র এলোমেলো হওয়া কিংবা লাগেজ ভাঙাচোরা অবস্থায় পাওয়ার ঘটনা। যাত্রীদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, বিমানবন্দর থেকে ব্যাগ নেওয়ার পর দেখা যায় লাগেজের চেইন, তালা কিংবা হাতল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাগের ভেতরের জিনিসপত্রও এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া যায়।
যাত্রীদের প্রশ্ন, লাগেজ পরিবহন ও হ্যান্ডলিংয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে কার দায়িত্ব কোথায়— তা স্পষ্ট না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রতিকার পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। অভিযোগ জানাতে গিয়ে অনেক সময় সংশ্লিষ্ট ডেস্ক বা কর্মকর্তার কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ইমিগ্রেশনে দীর্ঘ সারি
শাহজালালে যাত্রীদের আরেকটি বড় ভোগান্তির জায়গা ইমিগ্রেশন। ব্যস্ত সময়ে একসঙ্গে একাধিক ফ্লাইটের যাত্রী আসায় ইমিগ্রেশন কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার কারণে বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থ যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ে।
যাত্রীদের মতে, আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া দ্রুত ও যাত্রীবান্ধব হওয়া প্রয়োজন। কাউন্টার সংখ্যা বাড়ানো, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা কার্যকর করা এবং ব্যস্ত সময়ে পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা গেলে এ ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
আচরণ নিয়েও অভিযোগ
সেবার পাশাপাশি বিমানবন্দরের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর আচরণ নিয়েও যাত্রীদের অভিযোগ রয়েছে। তথ্য জানতে চাইলে সহযোগিতামূলক আচরণের পরিবর্তে বিরক্তি প্রকাশ, সঠিক নির্দেশনা না দেওয়া কিংবা যাত্রীদের সঙ্গে রূঢ় আচরণের অভিযোগ পাওয়া যায়।
যাত্রীসেবা মূলত একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া। সেখানে ইমিগ্রেশন, কাস্টমস, এয়ারলাইন্স, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, নিরাপত্তা ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়। একটি পর্যায়ে সামান্য বিলম্ব বা অব্যবস্থাপনা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো যাত্রাপ্রক্রিয়ায়।
জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি
বিশ্লেষকদের মতে, বিমানবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি যাত্রীসেবার মানোন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লাগেজ সরবরাহ, ক্ষতিগ্রস্ত লাগেজের দ্রুত নিষ্পত্তি, ইমিগ্রেশনে পর্যাপ্ত কাউন্টার ও জনবল এবং যাত্রীদের সঙ্গে পেশাদার আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। কোনো যাত্রীর লাগেজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা সেবা পেতে অযথা হয়রানির শিকার হলে দ্রুত দায়ী সংস্থা বা ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। ফলে এখানে একজন যাত্রী কী ধরনের সেবা পেলেন, সেটি শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তিও জড়িত। বিমানবন্দরের অবকাঠামো আধুনিকায়নের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা, দক্ষতা, পেশাদার আচরণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে বিনিয়োগের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।
অন্যদিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের লাগেজ পেতে বর্তমানে কোনো ধরনের ভোগান্তি হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
গত শুক্রবার রাতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, উড়োজাহাজ থেকে নামার পর গড়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই যাত্রীরা লাগেজ হাতে পাচ্ছেন।
পরিদর্শনের সময় মন্ত্রী সরাসরি ব্যাগেজ বেল্ট এলাকায় যান। সেখানে লাগেজের জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে তারা কত দ্রুত ব্যাগেজ পাচ্ছেন এবং বিমানবন্দরের সার্বিক সেবার মান সম্পর্কে জানতে চান। এ সময় কয়েকজন যাত্রী দ্রুত লাগেজ পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে বর্তমান ব্যবস্থাপনায় সন্তোষ প্রকাশ করেন বলে জানানো হয়।
তবে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও অর্জনকে আড়াল করতে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বিমানবন্দরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তার ভাষ্য, একটি দলের লোক অহেতুক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সরকারের ভালো কাজগুলোকে ভুলভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে।
মন্ত্রী বলেন, যাত্রীসেবার মান আরও উন্নত করতে হবে। বিমানবন্দরের প্রতিটি কার্যক্রমে যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য ও সন্তুষ্টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
এ সময় দ্রুত বিমানবন্দরে লাগেজ বহনের ট্রলির সংখ্যা বাড়ানোরও নির্দেশনা দেন বিমানমন্ত্রী। পরিদর্শনকালে বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে