একই দিনে দেশের তিন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। পঞ্চগড় সীমান্ত দিয়ে পুশইনের পর জেলা শহরে এসে বাসে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতিকালে ছয় বাংলাদেশিকে আটক করেছে পুলিশ। একই সময়ে জয়পুরহাটে তিনজন এবং নওগাঁর দুই সীমান্ত দিয়ে আরও সাতজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা ঠেকিয়ে দিয়েছে বিজিবি। পঞ্চগড়ে আটক ছয়জনের দাবি, তারা প্রায় পাঁচ-ছয় মাস আগে অবৈধভাবে ভারতে গিয়ে জম্মু-কাশ্মিরের শ্রীনগরে বিভিন্ন শ্রমের কাজ করছিলেন। সেখানে ভারতীয় পুলিশের হাতে আটক হয়ে পাঁচ-ছয় মাস কারাগারে থাকার পর বিএসএফের মাধ্যমে তাদের বাংলাদেশে পাঠানো হয়।
পঞ্চগড়ে ছয়জন আটক : ভারত থেকে পুশইনের শিকার হয়ে পঞ্চগড় সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা ছয় বাংলাদেশিকে আটক করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার বিকালে পঞ্চগড় জেলা শহরের শের-ই-বাংলা পার্ক সংলগ্ন শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টার থেকে তাদের আটক করা হয়। আটককৃত ব্যক্তিরা হলেন— সুনামগঞ্জের রঙ্গারচর এলাকার বাচ্চু মিয়া (৬০), তার স্ত্রী আমিনা বেগম (৫৫), মেয়ে দিলারা বেগম (৩০), জামাতা মফিজ উদ্দিন (৩২), সুনামগঞ্জের কান্দিসুমতনগর এলাকার সুমন মিয়া (২০) ও তার ফুফাতো ভাই সজিব মিয়া (১৯)।
পুলিশ ও আটককৃতদের সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৫-৬ মাস আগে সুনামগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে দালালের মাধ্যমে জনপ্রতি ১৫ হাজার টাকা খরচ করে তারা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেন। তারা ভারতের জম্মু-কাশ্মিরের শ্রীনগর এলাকায় ফলের বাগানসহ বিভিন্ন শ্রমসাধ্য কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। সেখানে অবস্থানকালে ভারতীয় পুলিশের হাতে আটক হয়ে তারা ৫-৬ মাস কারাগারে ছিলেন।
আটককৃতরা জানান, সম্প্রতি কারাগার থেকে তাদের ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে তুলে দেওয়া হয়। মঙ্গলবার ভোরে বিএসএফ সদস্যরা তাদের পঞ্চগড় সীমান্ত এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয় (পুশইন)। সীমান্ত পার হয়ে তারা জেলা শহরে এসে নাশতা করেন এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা আনিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে বাসের টিকেট কাটতে যান।
এ সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পঞ্চগড় সদর থানা পুলিশ তাদের আটক করে। পঞ্চগড় সদর থানার ওসি মোখলেছুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘আটককৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নিজেদের বাংলাদেশি নাগরিক বলে দাবি করেছেন। আমরা তাদের দেওয়া নাম-ঠিকানা ও পরিচয় যাচাই করছি। সঠিক পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের বিষয়ে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জয়পুরহাটে তিনজনকে পুশইনের চেষ্টা : জয়পুরহাট সীমান্তে তিন যুবককে বাংলাদেশে জোরপূর্বক পুশইনের চেষ্টা চালিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে স্থানীয় গ্রামবাসী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) দৃঢ় বাধায় তাদের সেই প্রচেষ্টা পণ্ড হয়ে গেছে। মঙ্গলবার সকালে জয়পুরহাট সদর উপজেলার রামকৃষ্ণপুর সীমান্তে এ ঘটনা ঘটে।
বিজিবি-১৪ পত্নীতলা ব্যাটালিয়নের কড়িয়া ক্যাম্প ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকালে সীমান্তের ২৭৬ নম্বর মূল পিলার এলাকা দিয়ে বিএসএফ ওই তিন যুবককে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী আজিম হোসেন জানান, সকালের দিকে সীমান্তঘেঁষা মাঠে কাজ করার সময় তিনি বিএসএফ সদস্যদের ওই তিন যুবককে সীমান্তের ২৭৬ নম্বর পিলারের কাছে এনে রাখার দৃশ্য দেখতে পান।
ঘটনাটি টের পেয়ে বিজিবি সদস্যরা দ্রুত তৎপরতা চালান। খবর পেয়ে স্থানীয় পশ্চিম রামকৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দারাও বিজিবির সঙ্গে যোগ দেন। ২৭৬ নম্বর মূল পিলার থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে সড়কপথে বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসী সতর্ক অবস্থান নিয়ে পাহারা শুরু করেন। ফলে পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং ফেরত পাঠানো তিন যুবক বর্তমানে ভারতীয় সীমান্তের অভ্যন্তরে অবস্থান করছেন।
ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিএসএফ-১২৩ ব্যাটালিয়নের দুর্গাপুর ক্যাম্প এবং বিজিবি-১৪ পত্নীতলা ব্যাটালিয়নের কড়িয়া ক্যাম্পের মধ্যে বেলা ১১টার দিকে এক পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে প্রথম ঘণ্টার এই পতাকা বৈঠকে কোনো চূড়ান্ত সুরাহা মেলেনি।
বিজিবির কড়িয়া বিওপির কমান্ডার মহাতাব উদ্দিন জানান, বিএসএফ অন্যায়ভাবে ওই তিন যুবককে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছিল। বিজিবি তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে তাদের আবার ভারতীয় সীমান্তের অভ্যন্তরে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। প্রথম দফার পতাকা বৈঠকে কোনো সমাধান না হওয়ায় এ বিষয়ে আরও একটি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
নওগাঁয় পুশইনের শিকার সাতজন : নওগাঁর সাপাহার ও পত্নীতলা উপজেলা সীমান্ত দিয়ে নারী-পুরুষসহ সাতজনকে পুশইনের চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষা বাহিনী-বিএসএএফ। তবে পুশইন চেষ্টা ঠেকিয়ে দিয়েছে বিজিবি। মঙ্গলবার সকালে সাপাহার উপজেলার সোনাডাঙা এবং পত্নীতলা উপজেলার কড়িয়া সীমান্ত এলাকা দিয়ে এই পুশইনের চেষ্টা চালানো হয়।
এ বিষয়ে পত্নীতলা ব্যাটালিয়নের (১৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এহসান হাবিব জানান, মঙ্গলবার সকালে বিএসএফ সদস্যরা পত্নীতলার কড়িয়া সীমান্ত দিয়ে তিনজনকে এবং সাপাহারের সোনাডাঙা সীমান্ত দিয়ে চারজনকে পুশইনের চেষ্টা চালায়। খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিজিবির টহল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে ওই সাতজনকে ভারতীয় শূন্য রেখার অভ্যন্তরে শনাক্ত করে। সাতজনের মধ্যে একজন নারী এবং ছয়জন পুরুষ। এর মধ্যে সাপাহারে পুশইন চেষ্টার শিকার চারজন একই পরিবারের সদস্য বলে জানা গেছে। বর্তমানে ওই সাতজন সীমান্তের শূন্য লাইনে অবস্থান করছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে ওই এলাকায় বিজিবির কড়া নজরদারি ও সতর্ক অবস্থান বজায় রয়েছে। তাদেরকে পুশব্যাক করাতে বিএসএফের সঙ্গে আলোচনা চলছে। অবৈধভাবে কাউকে অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি