নব্বইয়ের দশক থেকে অদ্যাবধি বাংলা ব্যান্ড ও আধুনিক সংগীতের গগনে এক দীপ্তিময় ও অবিসংবাদিত নাম— জেমস। নগরবাউল জেমস; যার সুরের মূর্ছনা আর গিটারের মোহনীয় জাদুকরি কথকতা সর্বদাই অনুরণিত হয়ে আসছে অগণিত ভক্তের হৃদয়ে। সম্প্রতি ‘আনন্দ সময়’-এর সঙ্গে এক প্রাণখোলা আড্ডায় তিনি সবিস্তারে আলোকপাত করেছেন বর্তমান সংগীত জগতের নানামুখী রূপান্তর, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের প্রভাব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আবহ, নস্টালজিয়ায় মোড়া সোনালি দিনের স্টুডিও সংস্কৃতি এবং প্রয়াত ব্যান্ড কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে তার সম্পর্কের নানা অধ্যায়ে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মইনুল হক রোজ।
আপনাদের সময়টাতে বাংলা ব্যান্ড সংগীত মুখরিত ছিল শিল্পীদের পদচারণে, আর শ্রোতারা পেত একের পর এক শ্রোতাপ্রিয় ও হিট গান। সেই স্বর্ণালি যুগ আজ পেছনে পড়ে আছে। আপনার অনুভবে, বর্তমানের এই বাঁক বদলের সময়ে আমাদের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ ঠিক কোন গন্তব্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে?
দেখুন, আর্ট বা শিল্প ফর্ম তো সবসময়ই পরিবর্তনশীল। একটা সময় ফটোগ্রাফি অত্যন্ত বড় একটা ব্যাপার ছিল, সময়ের বিবর্তনে আজ চারদিকে শুধু ফটোগ্রাফার আর ফটোগ্রাফার। ঠিক তেমনি মিউজিক আজ অতিরিক্ত মাত্রায় সহজলভ্য হয়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত গান রেকর্ড হয়েছে, তা দিয়ে আগামী ২০ বছর নতুন কোনো গান তৈরি না হলেও মানুষের বিনোদনের কোনো ঘাটতি হবে না। আগে যেখানে অ্যালবাম বা ক্যাসেট কিনতে হতো, আজ স্ট্রিমিংয়ের সুবাদে মিউজিক সম্পূর্ণ ফ্রি। আর মানবস্বভাবটাই এমন— যে জিনিস মানুষ একদম ফ্রিতে পায়, তার প্রতি আকর্ষণ ও মূল্যায়ন দুটোই কমে যায়।
আমাদের সময়ের মিউজিশিয়ানরা সত্যিই খুব ভাগ্যবান। আজকের প্রজন্মের মিউজিশিয়ানরা নিঃসন্দেহে অনেক বেশি মেধাবী— এমনকি আমাদের চেয়েও ট্যালেন্টেড। কিন্তু ভুল সময়ের কারণে এবং স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের দৌরাত্ম্যে তারা তাদের কাজের প্রকৃত মূল্যায়নটা পাচ্ছে না।
নব্বইয়ের দশকের কথা যদি একটু বলি— জেমস, আইয়ুব বাচ্চু এবং আপনাদের তখন তো একটা তুমুল প্রতিযোগিতা ছিল। সেই সময়টাকে এখন কেমন মিস করেন?
তখন তো একটা দারুণ সময় ছিল! প্রতিযোগিতা ছিল, সঙ্গে একে অন্যের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধাটাও ছিল। আমরা একে অন্যের রেকর্ডিং স্টুডিওতে যেতাম। দেখা যেত আমি রেকর্ডিং করছি, সেখানে আইয়ুব বাচ্চু হাজির, আবার তার রেকর্ডিংয়ের সময় আমি চলে যেতাম। এখন তো স্টুডিও কালচারটাই নেই। শিল্পীদের মধ্যেও সেই কানেকশনটা এখন আছে কি না জানা নেই। এখন সবাই নিজের স্টুডিওতে কম্পিউটারের মধ্যে মিউজিক নিয়ে ডুবে থাকে। আগে তো স্টুডিওতে যেতে হতো। সবার সঙ্গে যোগাযোগ আর ঘনিষ্ঠতা বেশি ছিল। এ ছাড়া তখনকার কনসার্ট মানেই ছিল পুরো ঢাকায় একটা উৎসবের আমেজ। এখন তো সেগুলো নেই।
আপনার খুব জনপ্রিয় দুটি গান ‘লিখতে পারি না কোনো গান’ ও ‘ভালোবেসে চলে যেও না’— এই গান দুটির সুর করেছিলেন দেশের আরেক সংগীত কিংবদন্তি লাকী আখান্দ। ‘বিতৃষ্ণা জীবনে আমার’ অ্যালবামের গান দুটি লিখেছিলেন দেশের আরেক গুণী গীতিকবি গোলাম মোর্শেদ। লাকী আখান্দের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাটা বা এরপরে আর কোনো গান কেন তার সুরে পাওয়া যায়নি সে বিষয়ে একটু জানতে চাই।
লাকি ভাইয়ের সঙ্গে আমার সরাসরি কাজ করা হয়নি। উনি গান দুটো সুর করে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আমি পরে স্টুডিওতে ভয়েস দিয়ে দিয়েছিলাম। পরে নানা কারণে হয়তো আর কাজ করা হয়ে ওঠেনি উনার সঙ্গে।
বর্তমানে তো এআইসহ নানা ধরনের অত্যাধুনিক টেকনোলজি মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে যুক্ত হয়েছে। অনেকেরই দাবি, এই প্রযুক্তিগুলো পেশাদার শিল্পীদের কাজের ক্ষেত্রকে সংকুচিত করছে এবং নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?
প্রযুক্তিকে তো আর আটকে রাখা যাবে না, একে মানিয়ে নিতেই হবে। তবে আমি বলব, আজকের যুগের মিউজিশিয়ানরা ভীষণ প্যাশনেট এবং মেধাবী। তারা কোনো ফায়দা বা লাভের লোভে গান করছে না, খাঁটি ভালোবাসা থেকেই করছে। আজকের দিনে যদি কেউ শুধু ব্যবসায়িক লাভ বা কিছু পাওয়ার আশা নিয়ে মিউজিক করতে আসে, তবে সে নিশ্চিতভাবে হতাশ হবে। তবে হ্যাঁ, এই পরিবর্তিত সময়েও যারা স্টুডিওর গণ্ডি পেরিয়ে লাইভ পারফরম্যান্সে নিজেদের প্রমাণ করতে পারবে এবং টেকনোলজিকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে পারবে, দিনশেষে তারাই টিকে থাকবে এবং উপকৃত হবে।
এই যে প্রযুক্তির বদল, এর ফলে আপনার কখনো কোনো খারাপ লাগা কাজ করেছে?
খারাপ লাগার তো কিছু নেই, এটা সময়ের পরিবর্তন। সামনে যা আসবে, তা তো মেনে নিতেই হবে। যেমন এখন এআই চলে এসেছে; মিউজিক্যাল ভিজ্যুয়াল থেকে শুরু করে কোডিং পর্যন্ত মানুষ এখন নিজেই ঘরে বসে করে ফেলছে। সময়ের পরিবর্তনে অনেক আর্ট ফর্ম হয়তো হারিয়ে যায়, আবার কিছু আর্ট ফর্ম মানুষের ভালোবাসা ও প্যাশন থেকেই বেঁচে থাকে।
আপনাদের পুরোনো গানগুলো আজও নতুন প্রজন্ম বা বিভিন্ন ব্যান্ড কভার করে। এই কভার করাটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত এবং ক্রিয়েটিভিটির জায়গাটা কি ঠিক থাকে?
মানুষ গান বানায় শোনানোর জন্য, আর মানুষ তো গাইবেই— যার যার মতো করে গাইবে। কিন্তু এখানে এসব জিনিসে বাধা দেওয়া মানেই একটা বাজে ব্যাপার। সংস্কৃতি হলো নদীর মতো, বইতে থাকবে। যে যা করছে করতে থাকুক। এখানে বাধা দিলে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যে যার মতো গান করতে পারবে, এতে কোনো সমস্যা নেই।
দীর্ঘ এই ক্যারিয়ারে প্রচুর কনসার্ট করেছেন। ভক্তরা আজও আপনাকে গিটারে দেখতে মুখিয়ে থাকে। কখনো কি নিজের কোনো একক ইন্সট্রুমেন্টাল শো করার ইচ্ছা জাগে?
ওইভাবে কোনো প্ল্যান বা একক শো করার ইচ্ছা কখনো জাগেনি। যদি কখনো জাগে, তবে নিশ্চয়ই বলব।
আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে আপনার কেমিস্ট্রিটা বাংলা সংগীতের ইতিহাসে এক কিংবদন্তি। তার সঙ্গে আপনার সম্পর্কের গভীরতার মাপ আপনি দেখিয়েছিলেন ২০১৮ সালে তিনি চলে যাওয়ার দিনে বরগুনার একটি কনসার্টে। সেদিন গিটারে আপনার অব্যক্ত বেদনার ঝড় ও চোখে জলের ধারা অন্য এক জেমসকে চিনিয়েছিল সবাইকে। সেই সম্পর্কটাকে এবং আপনাদের সেই দিনগুলোকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
(একটু থেমে) আমরা সবসময়ই ওকে মিস করি। আর উনার সেই চলে যাওয়া নিয়ে তো মনের মধ্যে এক ধরনের অভিমান আর প্রশ্ন থেকেই যায়... সবসময়ই উনাকে ভীষণভাবে মনে পড়ে। এবির (আইয়ুব বাচ্চু) সঙ্গে কথা বলা মানেই ছিল একটা তুমুল আড্ডা আর প্রচুর মজা। আমার খুব রাগ হয়, ভীষণ রাগ হয় উনার ওপর— এভাবে হঠাৎ করে চলে গেল! ঠিক হয়নি, একদমই ঠিক হয়নি।
তার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে। আর ফোনে শেষ কথা হয়েছিল উনি চলে যাওয়ার সাত দিন আগে। অনেকেই প্রশ্ন করেন কী কথা হয়েছিল। কিন্তু এটি আসলে জানতে চাওয়া উচিত নয়। এটি একেবারেই ব্যক্তিগত ব্যাপার; উনার সঙ্গে আমার শেষ যা কথা হয়েছে তা অপ্রকাশিতই থাকবে আজীবন।
জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আজ আপনি যেখানে এসে দাঁড়িয়েছেন, এই অবস্থানের পেছনের মানুষটির সঙ্গে আজকের আপনার মাঝে কি নিজের ভেতর কোনো পরিবর্তন বা পার্থক্য দেখতে পান?
(হাসি) আমি ঠিক যেমনটি ছিলাম, আজও ঠিক তেমনই আছি। নিজের মাঝে তো কোনো মৌলিক পরিবর্তন দেখি না! কেবল মাথাভর্তি চুলগুলো এখন কিছুটা পাতলা হয়ে এসেছে— ব্যস, এই তো পার্থক্য!
তবে সত্যি বলতে কী, আমার ভেতরে কোনো বদল এসেছে কি না বা এলেও তা কতটা, সেটি তো আয়নায় আমি নিজে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারব না। এই পরিবর্তনটা আসলে দৃশ্যমান হয় দর্শক-শ্রোতার চোখে। সময়ের পরিক্রমায় আমি শিল্পী হিসেবে বা মানুষ হিসেবে কতটা বদলে গেছি বা আদৌ বদলেছি কি না সেটি একমাত্র তারাই সবচেয়ে ভালোভাবে বলতে পারবে।
একাকিত্ব অনুভব করেন কখনো? জীবন নিয়ে আপনার বোধ কী?
না, একাকিত্ব অনুভব হয় না। তবে আমার সঙ্গে যারা ছিল, তাদের খুব মিস করি। যেমন এবির (আইয়ুব বাচ্চু) সঙ্গে কথা বলা শুরু করা মানেই ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়া। সে খুব আড্ডাবাজ মানুষ ছিল।
আর জীবন নিয়ে জটিলভাবে ভাবার কোনো দরকার নেই। প্রতি মুহূর্তে বাঁচ, নিজের ভালোটা দেখ। সবাই নিজের ভালো করো। সবার ভালো হলে এমনিতেই দেশের ভালো হবে।
নতুন প্রজন্মের মিউজিশিয়ানদের জন্য আপনার কোনো দিকনির্দেশনা বা পরামর্শ আছে কি?
কোনো নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই, শুধু বলব— প্যাশন বা ভালোলাগা থেকে করো। যদি একদম শুরুতেই ফায়দা বা লাভের কথা চিন্তা করো, তবে হতাশ হতে হবে। প্যাশনটাই এখানে সবকিছুর মূলে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেআই