উন্নত জাতের ষাঁড় তৈরি, সিমেন সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, গবেষণা এবং কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রমে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য ছিল। সেই উদ্দেশ্যে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার লালদিঘী ফতেহপুরে প্রায় পাঁচ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হয় ‘বুল কাফ রিয়ারিং ইউনিট কাম মিনিল্যাব’। ব্যয় হয় ১৩ কোটি ৫২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের পর ২০২৩ সালে সেখানে ১০টি ষাঁড় দিয়ে কার্যক্রমও শুরু হয়। কিন্তু মাত্র একবার সিমেন উৎপাদনের পর ২০২৪ সালের শেষ দিকে খাদ্য ও বাজেট সংকটে ষাঁড়গুলো সাভারের কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর থেকে কার্যত বন্ধ রয়েছে ইউনিটটির উৎপাদন ও গবেষণা কার্যক্রম।
প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোটি তৈরি হলেও এর মূল সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সর্বশেষ ১ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, দানাদার খাবারের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট ও জনবল না থাকায় ইউনিটটি বন্ধ রয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
পাঁচ একর জমিতে আধুনিক স্থাপনা
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ‘কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও ভ্রূণ স্থানান্তর প্রযুক্তি বাস্তবায়ন’ প্রকল্পের আওতায় ২০১৮ সালে ইউনিটটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০২৩ সালে নির্মাণ শেষ হওয়ার পর এটি হস্তান্তর করা হয়। প্রকল্পটির আওতায় অফিস কাম ল্যাবরেটরি, সিমেন কালেকশন শেড, বুল শেড, বুল কাফ প্যান শেড, ফিড গোডাউন এবং ৩০টি আইসোলেশন শেডসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ছিল, উন্নত জাতের ষাঁড়ের বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পাশাপাশি গবেষণা এবং ভ্রূণ স্থানান্তর প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশের কৃত্রিম প্রজনন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা। রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যেও বিভাগে একটি ‘মিনি বুল কাফ রিয়ারিং ইউনিট’ থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে।
২০১৮ সালের ২২ জুলাই তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ইউনিটটির নির্মাণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছিলেন বলে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
একবার সিমেন উৎপাদন, তারপর ষাঁড় সরিয়ে নেওয়া
নির্মাণ শেষ হওয়ার পর ১০টি ষাঁড় দিয়ে ইউনিটটির কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু নিয়মিত উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার মতো খাদ্য ও পরিচালন ব্যয় নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে মাত্র একবার সিমেন উৎপাদনের পর ২০২৪ সালের শেষ দিকে ষাঁড়গুলো সাভারের কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। এরপর থেকেই পীরগঞ্জের ইউনিটটি উৎপাদন ও গবেষণার বাইরে রয়েছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে— প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি এর দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়, প্রয়োজনীয় জনবল ও পশুখাদ্যের সংস্থান কতটা নিশ্চিত করা হয়েছিল? কারণ স্থাপনা নির্মাণের পর সেটি সচল রাখতে নিয়মিত খাদ্য, পশু পরিচর্যা, কারিগরি জনবল, ল্যাব পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয়।
জাতীয় সিমেন চাহিদার বড় অংশই বেসরকারি উৎসে
সংশ্লিষ্ট প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর গবাদিপশুর কৃত্রিম প্রজননের জন্য প্রায় দুই কোটি ডোজ সিমেন প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ ডোজ উৎপাদন করে এবং আনুমানিক ১০ লাখ ডোজ প্রাকৃতিক উৎস থেকে পাওয়া যায়। বাকি চাহিদার বড় অংশ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও এনজিওর মাধ্যমে পূরণ করা হয়।
এই বাস্তবতায় সরকারি সিমেন উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই পীরগঞ্জের মতো ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। ফলে ইউনিটটি দীর্ঘদিন অচল থাকলে কাঙ্ক্ষিত সরকারি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পীরগঞ্জেই তিন হাজারের বেশি খামার
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পীরগঞ্জে তালিকাভুক্ত খামারের সংখ্যা ৩ হাজার ১৩৫টি। শুধু পীরগঞ্জ নয়, ইউনিটটি সচল হলে রংপুরসহ আশপাশের জেলা-উপজেলার খামারিরাও উন্নত জাতের গবাদিপশুর কৃত্রিম প্রজননের সুবিধা পেতে পারেন।
স্থানীয় খামারিদের অভিযোগ, সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করে আধুনিক স্থাপনা নির্মাণ করলেও সেটি বন্ধ থাকায় তাঁরা প্রত্যাশিত কোনো সুবিধা পাচ্ছেন না। প্রজাপাড়া এলাকার বিপুল সাহা, শানেরহাটের নুরনবী মণ্ডল এবং ধনশলা গ্রামের খামারি চম্পা বেগমসহ কয়েকজন খামারি দ্রুত ইউনিটটি চালুর দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকলে ভবন, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য অবকাঠামো নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
কর্মকর্তাদের বক্তব্য— মূল সংকট বাজেট ও জনবলে
কৃত্রিম প্রজনন রংপুরের উপপরিচালক সাইদুর রহমানের বক্তব্য, দানাদার খাবারের প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ না থাকায় ষাঁড়গুলো সাভারের কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে; বরাদ্দ পাওয়া গেলে ইউনিটটি পুনরায় চালুর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (কৃত্রিম প্রজনন) ডা. ফরিদা ইয়াছমিনও জানিয়েছেন, বাজেট বরাদ্দ ও জনবল স্বল্পতার কারণে রিয়ারিং ইউনিটটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে ইউনিটটিকে কার্যত অচল হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছিল, দ্রুত কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
প্রকল্প শেষ, কিন্তু সুফল কোথায়?
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত প্রকল্প-তথ্য অনুযায়ী, ‘কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও ভ্রূণ স্থানান্তর প্রযুক্তি বাস্তবায়ন (৩য় পর্যায়, ২য় সংশোধিত)’ প্রকল্পের মেয়াদ ছিল জানুয়ারি ২০১৬ থেকে জুন ২০২৪ পর্যন্ত। প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং দেশি গবাদিপশুর কৌলিকমান উন্নয়নের মাধ্যমে দুধ ও মাংসের উৎপাদন বাড়ানো।
কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও পীরগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোটি পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন কার্যক্রমে যেতে পারেনি। ফলে প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে পরিচালন সক্ষমতা নিশ্চিত করার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
শুধু ভবন নয়, দরকার স্থায়ী পরিচালনা পরিকল্পনা
প্রাণিসম্পদ খাতের এই ধরনের স্থাপনা সচল রাখতে শুধু মূলধনী ব্যয় যথেষ্ট নয়; পশু খাদ্য, চিকিৎসা, পরিচর্যা, বিদ্যুৎ, ল্যাবরেটরি কার্যক্রম, দক্ষ জনবল এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ধারাবাহিক রাজস্ব বা পরিচালন বাজেট প্রয়োজন। পীরগঞ্জের ইউনিট বন্ধ থাকার ঘটনায় সেই ব্যবস্থাপনার ঘাটতিই সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয়।
এখন প্রশ্ন হলো— সাড়ে ১৩ কোটি টাকার স্থাপনাটিকে কীভাবে দ্রুত উৎপাদনমুখী করা হবে। প্রয়োজনীয় বাজেট ও জনবল বরাদ্দ, পুনরায় উন্নত জাতের ষাঁড় সংগ্রহ, ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং একটি নির্দিষ্ট পরিচালনা পরিকল্পনা ছাড়া শুধু ভবন রেখে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
খামারি ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর দ্রুত বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নিয়ে ইউনিটটি চালু করবে। কারণ রংপুর অঞ্চলের গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন, দুধ ও মাংস উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সরকারি কৃত্রিম প্রজনন ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে পীরগঞ্জের এই অবকাঠামোটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করার সুযোগ এখনও রয়েছে।
সময়ের আলো/আতা