সীমান্তের পাহাড়, বিস্তীর্ণ হাওর আর নদী-খাল ঘেরা নেত্রকোণা। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে এই জনপদে বহুবার বদলেছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, এসেছে একাধিক সরকার, নির্বাচিত হয়েছেন প্রভাবশালী এমপি ও মন্ত্রী। কেউ পেয়েছেন মন্ত্রিসভার দায়িত্ব, কেউ এলাকার উন্নয়নে নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। তবু সড়ক যোগাযোগ, রেল, হাওর ব্যবস্থাপনা, নদীভাঙন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অবকাঠামোর অনেক পুরোনো সংকট এখনো রয়ে গেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এত বছরে নেত্রকোণা কতটা বদলেছে, আর সেই পরিবর্তনে এমপি-মন্ত্রীদের ভূমিকা কতটা?
কবি-বাউল ও সুফি-সাধকদের স্মৃতিবিজড়িত এই জনপদ ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত হয়। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অন্য অঞ্চলের মতো নেত্রকোণাকেও শুরু করতে হয় নতুন করে পথচলা। তখন এটি ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার একটি মহকুমা। ১৯৮৪ সালে জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর প্রশাসনিক গুরুত্ব বাড়লেও দীর্ঘ সময় ধরে উন্নয়ন ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল সীমান্তঘেঁষা এই অঞ্চল।
বর্ষায় দিগন্তবিস্তৃত পানিতে তলিয়ে যেত হাওরাঞ্চল। শুষ্ক মৌসুমে যোগাযোগের দুর্ভোগ ছিল নিত্যদিনের। সুপেয় পানির সংকট, নদীভাঙন, পাহাড়ি ঢল, কাঁচা সড়ক এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা ছিল মানুষের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। সময়ের সঙ্গে এসব খাতে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও জেলার অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো আসেনি বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
স্বাধীনতার পর নেত্রকোনার রাজনৈতিক ইতিহাসও কম বৈচিত্র্যময় নয়। জেলার সংসদীয় আসনগুলোর সীমানা ও বিন্যাস সময়ের সঙ্গে একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে। ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের নির্বাচন—বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা জেলার পাঁচটি আসনে নির্বাচিত হয়েছেন।
পুরোনো সময়ের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে ছিলেন অ্যাডভোকেট আবদুল মমিন খান। নেত্রকোণা-৪ (মদন-মোহনগঞ্জ-খালিয়াজুরী) এলাকার রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় প্রভাবশালী এই নেতা ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও তিনি নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু সরকারের খাদ্য, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
সীমান্তবর্তী নেত্রকোণা-১ আসনটি দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলা নিয়ে গঠিত। এ আসনের রাজনীতিতে জালাল উদ্দিন তালুকদার ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি ১৯৭৯, ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিভিন্ন নির্বাচনে এই আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। সর্বশেষ ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির ব্যারিস্টার কায়সার কামাল জয়ী হন। পরে তিনি ভূমি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং মার্চ ২০২৬-এ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন।
দুর্গাপুর-কলমাকান্দার বড় বৈশিষ্ট্য পাহাড়, সীমান্ত ও নদী। পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন, সীমান্তবর্তী যোগাযোগ ও পর্যটন সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে এলাকাটির উন্নয়ন চ্যালেঞ্জও আলাদা। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও প্রত্যাশিত অবকাঠামোগত পরিবর্তন এখনো হয়নি।
নেত্রকোনা-২ আসন জেলা সদর ও বারহাট্টা উপজেলা নিয়ে গঠিত। জেলার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের প্রভাব ছিল। ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নির্বাচনি ইতিহাসে আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ, ফজলুর রহমান খান, আশরাফ আলী খান খসরু, আরিফ খান জয় প্রমুখের নাম রয়েছে। আরিফ খান জয় ২০১৪ সালের পর যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। বীর মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ আলী খান খসরুও এই আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির অধ্যাপক ডা. আনোয়ারুল হক এ আসনে নির্বাচিত হন।
জেলা সদর হওয়ায় এই আসনে সড়ক যোগাযোগ, নদীভাঙন প্রতিরোধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন সময়ে কাজ হয়েছে। তবে স্থানীয়দের মতে, এখনো পৌর শহরের অনেক সড়কের অবস্থা নাজুক। দীর্ঘদিনের আলোচিত মহুয়া অডিটোরিয়াম বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২৬ সালে সংসদ সদস্য আনোয়ারুল হক বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের মান ও অগ্রগতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন এবং উন্নয়নের আশ্বাস দিয়েছেন।
আটপাড়া ও কেন্দুয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত নেত্রকোণা-৩ আসনেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। এখানকার বড় সমস্যা যোগাযোগ, কৃষি, শিক্ষা এবং নদী-খাল ব্যবস্থাপনা। নদী ও খাল পুনঃখননের মতো উদ্যোগের কথা বিভিন্ন সময়ে সামনে এলেও স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করেন, এখনো কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি।
নেত্রকোণা-৪ হলো জেলার সবচেয়ে হাওর প্রধান আসনগুলোর একটি। মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুড়ি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই এলাকায় বর্ষায় নৌপথই হয়ে ওঠে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। রাজনৈতিক ইতিহাসে এই আসনের সঙ্গে মমিন পরিবারের নাম বিশেষভাবে আলোচিত। অ্যাডভোকেট আবদুল মমিন খানের পর তার স্ত্রী রেবেকা মমিন ২০০৮ সাল থেকে পরপর তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
হাওর উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, কৃষি, শিক্ষা ও যোগাযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, হাওরবাসীর জীবনমান বদলে দেওয়ার মতো টেকসই পরিবর্তন এখনো সীমিত। তাদের মতে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা এমপি-মন্ত্রীদের আরও বড় পরিসরে উন্নয়ন করার সুযোগ ছিল।
পূর্বধলা উপজেলা নিয়ে গঠিত নেত্রকোণা-৫ আসনের নির্বাচনি সীমানাও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় বৃহত্তর ময়মনসিংহের ধোবাউড়া ও পূর্বধলা নিয়ে আসনটি গঠিত ছিল। পরে শুধু পূর্বধলা নিয়ে বর্তমান আসনটি গঠিত হয়। এই আসন থেকে ডা. মোহাম্মদ আলী, জালাল উদ্দিন তালুকদার, আবদুল করিম আব্বাসী, ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল ও আহমদ হোসেনসহ বিভিন্ন নেতা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মাছুম মোস্তফা নির্বাচিত হন।
পূর্বধলার উন্নয়ন চ্যালেঞ্জের মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক যোগাযোগ ও গ্রামীণ অবকাঠামো অন্যতম। দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস ও একাধিক প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি থাকার পরও প্রত্যন্ত এলাকার যোগাযোগ ও অবকাঠামো নিয়ে মানুষের অসন্তোষ রয়েছে।
নেত্রকোণার সঙ্গে নদী ও হাওরের সম্পর্ক শুধু ভূগোলের নয়, অর্থনীতিরও। মোহনগঞ্জ, মদন, খালিয়াজুড়ি, বারহাট্টা, কেন্দুয়াসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা কৃষি, মাছ ও জলাভূমির ওপর নির্ভরশীল। নদীভাঙন রোধ, খাল পুনঃখনন, হাওরের যোগাযোগব্যবস্থা, মাছের উৎপাদন, কৃষি ও কর্মসংস্থান তাই প্রতিটি সরকারের উন্নয়ন আলোচনায় এসেছে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ক্ষেত্রে নেওয়া উদ্যোগের অনেকগুলোই এখনো প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।
তবে জেলার উন্নয়ন নিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—কোনো প্রকল্পের কৃতিত্ব এককভাবে কোনো সংসদ সদস্যের নামে দেওয়া সবসময় বাস্তবসম্মত নয়। সংসদ সদস্যরা সাধারণত এলাকার বিভিন্ন দাবি সংসদে তুলে ধরেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে সমর্থন দেন। প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদফতর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার ওপর।
স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকের বেশি সময়ে নেত্রকোণায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক, সেতু, সরকারি স্থাপনা, নদী-খাল পুনঃখনন, আশ্রয়ণ এবং হাওরকেন্দ্রিক বিভিন্ন অবকাঠামোতে উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু সেই উন্নয়নের গতি ও বিস্তার নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে সীমান্ত, হাওর ও প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদের মানুষের কাছে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কতটা পৌঁছেছে—সেটিই বড় প্রশ্ন।
এখন নেত্রকোণার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ পুরোনো সমস্যাগুলোকে টেকসই সমাধানে নেওয়া। নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি যোগাযোগব্যবস্থা, হাওর ব্যবস্থাপনা, কৃষি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোকে বাস্তব ও টেকসই প্রকল্পে রূপ দিতে পারবে? স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর সীমান্ত, হাওর ও জনপদের মানুষের কাছে সেই উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সময়ের আলো/জোই