পৃথিবী শুধু মানুষের জন্য নয়। আমাদের চারপাশে বিস্তৃত রয়েছে এক বিশাল প্রাণিজগৎ— স্থলচর, জলচর, উভচর, কীটপতঙ্গ, পাখি, সরীসৃপ, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীব থেকে শুরু করে বিশাল আকৃতির প্রাণী পর্যন্ত। প্রত্যেকের জীবনধারা আলাদা, খাদ্যাভ্যাস আলাদা, চলাফেরা আলাদা, বাসস্থান আলাদা; অথচ সবাই একটি সুসংগঠিত সৃষ্টিব্যবস্থার অংশ। একটি পাখি আকাশে উড়ে, মাছ পানিতে সাঁতার কাটে, পিঁপড়া ক্ষুদ্র দেহে খাদ্য বহন করে, মৌমাছি ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে, উট মরুভূমির প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকে— প্রাণিজগতের এই বৈচিত্র্য কেবল প্রকৃতির বিস্ময় নয়; একজন মুমিনের কাছে এগুলো আল্লাহ তায়ালার অসীম কুদরত ও প্রজ্ঞার জীবন্ত নিদর্শন।
প্রাণিজগৎও আল্লাহর সৃষ্টি
পবিত্র কুরআন প্রাণীদের অস্তিত্বকে অত্যন্ত তাৎপর্যের সঙ্গে তুলে ধরেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘পৃথিবীতে বিচরণশীল এমন কোনো প্রাণী নেই এবং নিজ ডানায় উড়ে এমন কোনো পাখি নেই, যারা তোমাদের মতো বিভিন্ন সম্প্রদায় নয়। আমি কিতাবে কোনো কিছুই বাদ দিইনি। অতঃপর তারা তাদের রবের কাছে সমবেত হবে’ (সুরা আনআম, আয়াত : ৩৮)। এই আয়াত আমাদের সামনে প্রাণিজগতের একটি গভীর বাস্তবতা তুলে ধরে। প্রাণীদেরও নিজস্ব জীবনব্যবস্থা ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তারা এলোমেলো কোনো সৃষ্টি নয়; বরং আল্লাহর নির্ধারিত নিয়মের অধীন একটি সুশৃঙ্খল জগতের অংশ।
বৈচিত্র্যের মধ্যেই সৃষ্টিকর্তার মহিমা
একটি পৃথিবী, অথচ কত ধরনের প্রাণী! কেউ পানিতে বাস করে, কেউ মাটির নিচে; কেউ পাহাড়ে থাকে, কেউ গাছে; কেউ দিনে সক্রিয়, কেউ রাতে; কেউ ঘাস খায়, কেউ ফলমূল; কেউ শিকার করে, আবার কেউ অন্য প্রাণীর খাদ্য হয়। এই বৈচিত্র্যের মধ্যে রয়েছে এক অসাধারণ ভারসাম্য। একজন মানুষ যদি শুধু একটি প্রাণীর জীবনব্যবস্থাই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে, তা হলেও তার সামনে সৃষ্টির অসংখ্য রহস্য উন্মোচিত হতে পারে। আর যখন সে পুরো প্রাণিজগতের দিকে তাকায়, তখন তার বিস্ময়ের সীমা থাকে না।
পাখির উড্ডয়ন একটি জীবন্ত নিদর্শন
আকাশে পাখির উড়ে চলা আমাদের কাছে স্বাভাবিক দৃশ্য। কিন্তু একটু থেমে ভাবলে এটি এক অসাধারণ ঘটনা। একটি ক্ষুদ্র পাখির শরীর কীভাবে উড্ডয়নের উপযোগী হলো? তার ডানা, পালক, হাড়ের গঠন, ভারসাম্য রক্ষা, দিক পরিবর্তন— সবকিছু কী নিখুঁত সমন্বয়ে কাজ করছে! আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা কি তাদের মাথার ওপর পাখিদের লক্ষ করে না— কীভাবে তারা ডানা মেলে এবং গুটিয়ে নেয়? দয়াময় আল্লাহ ছাড়া কেউ তাদের ধরে রাখে না। নিশ্চয়ই তিনি সবকিছু দেখেন’ (সুরা মুলক, আয়াত : ১৯)। পাখির ডানায় তাই শুধু সৌন্দর্য নয়, রয়েছে চিন্তার আহ্বান।
প্রাণীদের মধ্যেও রয়েছে নিজস্ব সমাজব্যবস্থা
আমরা অনেক সময় প্রাণীদের শুধু প্রবৃত্তিনির্ভর জীব হিসেবে দেখি। কিন্তু তাদের জীবনযাপন পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, অনেক প্রাণীর মধ্যেও বিস্ময়কর সংগঠন, যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতা রয়েছে। পবিত্র কুরআন মৌমাছি ও পিঁপড়ার মতো প্রাণীর জীবনযাত্রার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। পিঁপড়ার প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, এক পিঁপড়া তার সঙ্গীদের সতর্ক করেছিল, যাতে তারা অসতর্কভাবে পদদলিত না হয় (সুরা নামল, আয়াত : ১৮)। এখানে মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে— প্রাণিজগতের জীবনও গভীর পর্যবেক্ষণের যোগ্য।
মৌমাছি : ক্ষুদ্র দেহে বিশাল সংগঠন
মৌমাছির জীবন কুরআনে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমার রব মৌমাছিকে প্রত্যাদেশ করেছেন— তুমি পাহাড়ে, গাছে এবং মানুষ যে ঘর নির্মাণ করে, তাতে বাসস্থান গ্রহণ করো’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৬৮)। এরপর আল্লাহ তায়ালা মধুর কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘তার উদর থেকে বিভিন্ন বর্ণের পানীয় বের হয়, যাতে মানুষের জন্য রয়েছে আরোগ্য’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৬৯)। একটি ক্ষুদ্র প্রাণীর জীবন ও তার উৎপাদিত মধুকে কুরআন মানুষের চিন্তার বিষয় বানিয়েছে। এটাই প্রমাণ করে আল্লাহর সৃষ্টিতে ছোট-বড় বলে অবহেলার কিছু নেই।
উট মরুভূমির বিস্ময়কর সৃষ্টি
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা কি উটের দিকে লক্ষ করে না কীভাবে তা সৃষ্টি করা হয়েছে’ (সুরা গাশিয়াহ, আয়াত : ১৭)। মরুভূমির কঠিন পরিবেশে উটের টিকে থাকার সক্ষমতা মানুষের জন্য দীর্ঘদিনের বিস্ময়ের বিষয়। তার দেহের গঠন, পানি ও শক্তি ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিকূল পরিবেশে চলার ক্ষমতা তাকে অনন্য প্রাণীতে পরিণত করেছে। কুরআন মানুষকে উটের দিকে তাকাতে বলেছে— শুধু দেখার জন্য নয়, সৃষ্টিকর্তাকে চিনতে শেখার জন্য।
গবাদিপশু মানুষের জন্য নেয়ামত
আল্লাহ তায়ালা গবাদিপশুর কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য গবাদিপশু সৃষ্টি করেছেন; তাতে তোমাদের জন্য উষ্ণতার উপকরণ এবং বহু উপকার রয়েছে, আর তা থেকে তোমরা আহার করো’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৫)। দুধ, মাংস, চামড়া, পরিবহন, কৃষিকাজসহ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রাণীদের অবদান বহু প্রাচীন। এসব নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া মুমিনের দায়িত্ব।
প্রাণীদের প্রতিও দয়া
ইসলাম মানুষকে শুধু মানুষের প্রতি দয়া করতে শেখায়নি; বরং প্রাণীদের প্রতিও সহমর্মিতা ও দায়িত্বশীল আচরণের নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এক নারী একটি বিড়ালকে আটকে রেখে খাদ্য-পানি না দেওয়ার কারণে শাস্তির সম্মুখীন হয়েছিল (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৩৬৫)। অন্যদিকে একটি তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে এক ব্যক্তির ক্ষমা লাভের কথাও হাদিসে এসেছে (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৩২১)। অর্থাৎ প্রাণীর প্রতি দয়া নিছক মানবিক সৌজন্য নয়, এটি আল্লাহর রহমত লাভেরও কারণ হতে পারে।
প্রাণীকে কষ্ট দেওয়া নয়
প্রাণী মানুষের প্রয়োজন পূরণে ব্যবহৃত হতে পারে, কিন্তু অকারণে তাকে নির্যাতন বা কষ্ট দেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রাণীর ওপর জুলুম ও অমানবিক আচরণ থেকে সতর্ক করেছেন। এমনকি প্রাণীকে লক্ষ্য বানিয়ে বিনোদন করাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, মানুষ সৃষ্টিজগতের ওপর দায়িত্বশীল। ক্ষমতা পেয়েছে বলে দুর্বল সৃষ্টির প্রতি নিষ্ঠুর হওয়ার অধিকার পায়নি।
প্রতিটি সৃষ্টির নিজস্ব ভূমিকা
প্রাণিজগতের প্রতিটি প্রাণীর ভূমিকা মানুষের কাছে স্পষ্ট নাও হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতির সামগ্রিক ব্যবস্থায় তাদের অনেকেরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাখি বীজ ছড়িয়ে দিতে পারে, মৌমাছি পরাগায়নে সহায়তা করে, বিভিন্ন প্রাণী খাদ্যশৃঙ্খলের ভারসাম্য রক্ষা করে। একটি প্রাণীর অস্তিত্ব অন্য অনেক প্রাণীর জীবনব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই কোনো প্রাণীকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে ধ্বংস করলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেককে যথাযথ পরিমাপ নির্ধারণ করেছেন।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ২)
প্রাণিজগৎ আমাদের কী শেখায়?
প্রাণিজগৎ শুধু দেখার বিষয় নয়, এখান থেকেও মানুষ শিক্ষা নিতে পারে। পাখি শেখায়— আল্লাহর ওপর ভরসা করে চেষ্টা করতে। মৌমাছি শেখায়— শৃঙ্খলা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে কল্যাণ সৃষ্টি করতে। পিঁপড়া শেখায়— সংগঠন ও সতর্কতার গুরুত্ব। উট শেখায়— প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার সক্ষমতা। গবাদিপশু শেখায়— আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ হতে। আর পুরো প্রাণিজগৎ শেখায়— সৃষ্টির বৈচিত্র্যের আড়ালে স্রষ্টার একত্ব ও অসীম ক্ষমতা উপলব্ধি করতে।
মানুষ সৃষ্টিজগতের দায়িত্বশীল অভিভাবক
মানুষকে আল্লাহ তায়ালা জ্ঞান, বিবেক ও দায়িত্বের বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। ফলে পৃথিবীর অন্যান্য সৃষ্টির সঙ্গে মানুষের আচরণও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। প্রকৃতি ধ্বংস, নির্বিচারে প্রাণী নিধন, আবাসস্থল নষ্ট করা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট করা শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনকেও বিপন্ন করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘স্থলে ও সমুদ্রে মানুষের কৃতকর্মের কারণে বিপর্যয় প্রকাশ পেয়েছে’ (সুরা রোম, আয়াত : ৪১)। তাই প্রাণী সংরক্ষণ শুধু পরিবেশের বিষয় নয়, এটি আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি আমাদের দায়িত্বেরও অংশ।
প্রাণিজগতের দিকে একটু গভীরভাবে তাকালেই বোঝা যায় এই পৃথিবী কোনো এলোমেলো ব্যবস্থার নাম নয়।
ক্ষুদ্র পিঁপড়া থেকে বিশাল হাতি, আকাশের পাখি থেকে সমুদ্রের প্রাণী— প্রত্যেকের জীবনেই রয়েছে বৈচিত্র্য, ভারসাম্য ও বিস্ময়। পবিত্র কুরআন আমাদের বারবার সৃষ্টিজগৎ নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান করেছে। কারণ প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টি যেন একটি খোলা কিতাব— যার প্রতিটি পৃষ্ঠা আল্লাহর কুদরত, হিকমত ও সৃষ্টিশীলতার সাক্ষ্য বহন করে। আমরা যদি প্রাণিজগৎকে শুধু ভোগের উপকরণ হিসেবে না দেখে আল্লাহর আমানত ও নিদর্শন হিসেবে দেখি, তা হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যাবে।
একটি পাখির উড্ডয়ন, একটি মৌমাছির মধু সংগ্রহ, একটি পিঁপড়ার সারিবদ্ধ চলা কিংবা একটি উটের মরুভূমি পাড়ি দেওয়া সবই যেন একই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে। সৃষ্টি যত বৈচিত্র্যময়, স্রষ্টার কুদরত ততই অসীম। আর সেই কুদরত উপলব্ধি করাই একজন মুমিনের জন্য প্রকৃত চিন্তার সৌন্দর্য।
লেখক : এমফিল গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়