এশিয়ান গেমসে এবার ব্যর্থ বাংলাদেশ। ২২ কোটি টাকা বাজেটের আসর আর ২৬০ জনের বিশাল বহরে প্রাপ্তি কেবল এক ব্রোঞ্জ। উশুকা জিন্নাত আক্তারের হাত ধরে এসেছে সেই পদক। এই প্রাপ্তিতে অবশ্য গর্বের জায়গাটা সেই অর্থে বিশাল নয়। তবে যে ইভেন্ট নিয়ে প্রকৃত অর্থে গর্ব করা যেতে পারে, সেটা আলোচনাই হয়নি কিংবা অনেকের চোখ এড়িয়ে গেছে। বলা হচ্ছে কুস্তির কথা। এশিয়ান গেমসে এবার ইতিহাস গড়েছে দেশের অবহেলিত ইভেন্ট কুস্তি। বাংলাদেশ যে ২২টি ডিসিপ্লিনে অংশ নিয়েছে ব্যক্তিগত ও দলগত ইভেন্ট মিলে, সেখানে সবচেয়ে ভালো ফল করেছে মূলত কুস্তিই। এশিয়ান গেমসে দুজন কুস্তিগির আব্দুস সাত্তার ও মাহবুব হোসেন অংশ নেন। দুজনই নিজ নিজ ওজন শ্রেণিতে জয় পেয়েছেন। এর মধ্যে মাহবুব অল্পের জন্য ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে থেকে ছিটকে গেছেন। সাত্তার তার প্রথম ম্যাচেই প্রতিপক্ষকে কোনো পয়েন্টই দেননি। ম্যাচে সাত্তার আর মাহবুব আলো ছড়ালেও এই সাফল্যের নেপথ্যের নায়ক কুস্তির দেশসেরা কোচ শিরিন সুলতানা। সাবেক এই তারকা কুস্তিগিরের কল্যাণেই এশিয়ান গেমসে কুস্তির ৪৬ বছরের ইতিহাসে একসঙ্গে দুই জয়ের মুখ দেখেছে বাংলাদেশ।
এশিয়ান গেমসে কুস্তির যাত্রাটা সহজ ছিল না। অনেক বাধাবিঘ্ন পার হয়েই গেমসে অংশ নেয় শিরিন সুলতানার দল। গেমসে অংশ নেওয়ার আগে প্রতিবেশী দেশ ভারত যেখানে তাদের কুস্তিগিরদের তিন বছরের দীর্ঘ ট্রেনিং দিয়েছে, জিতেছে স্বর্ণ, রুপা ও ব্রোঞ্জ পদক। সেখানে মাত্র দেড় মাসের ট্রেনিং নিয়ে তারপরও এশিয়াডে অংশ নিয়েছেন সাত্তার, মাহবুবরা। এ ব্যাপারে কুস্তির কোচ শিরিন সুলতানা বলেন, ‘সাফল্য পেতে হলে ট্রেনিংয়ের বিকল্প নেই। আজ ভারত এত ভালো ফলাফল করেছে তার পেছনে একমাত্র কারণ দীর্ঘমেয়াদি ট্রেনিং। ওরা যেখানে তিন বছরের ট্রেনিং নিয়ে এশিয়ান গেমসে অংশ নিয়েছে, সেখানে আমরা পেয়েছি মাত্র দেড় মাস। বাংলাদেশে সত্যি বলতে প্রতিভার কোনো অভাব নেই, অভাব কেবল নার্চারের।’
এ ব্যাপারে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের এক বিবৃতিকে টেনে শিরিন বলেন, ‘এশিয়ান গেমস শেষে আমাদের মাননীয় ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মহোদয় মূল্যায়ন কমিটি গঠনের কথা বলেছেন। এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। এশিয়ান গেমসে কে কেমন করল, সেটা অবশ্যই লিপিবদ্ধ থাকা উচিত। একই সঙ্গে মন্ত্রী মহোদয় এও বলেছেন, এসব আসরে সাফল্য পেতে হলে দীর্ঘমেয়াদি ট্রেনিংয়ের বিকল্প নেই। আমিনুল ভাইদের খেলা দেখে দেখেই আমরা কিন্তু বড় হয়েছি। ওনাদের হাত ধরে আন্তর্জাতিক সাফল্য এসেছে। ওনারা লাল-সবুজের গর্বের পতাকাকে বিশ্ব দরবারে উঁচিয়ে ধরেছেন। আমিনুল ভাই ক্রীড়াঙ্গনের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবগত। তাই ওনার সুরে আমিও দীর্ঘমেয়াদি ট্রেনিংয়ের দাবি রাখছি। হোক সেটা কুস্তি কিংবা অন্য ইভেন্ট।’
এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়ার আগে অনেক বাধার মুখে পড়তে হয়েছে শিরিন সুলতানার, যার বেশিরভাগই ব্যক্তিকেন্দ্রিক। গেমসে অংশ নেওয়ার দুই সপ্তাহ আগে কুস্তির অ্যাডহক কমিটির পদ হারান (যুগ্ম সম্পাদক)। এর বাইরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তোলেন নারী হয়ে পুরুষ টিমের কোচ হয়ে। এ ব্যাপারে সময়ের আলোকে শিরিন বলেন, ‘অ্যাডহক কমিটিতে কে থাকবে, না থাকবে সেটার সম্পূর্ণ এখতিয়ার জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের। এনএসসিতে এক যোগ্য ক্রীড়া পরিচালক দায়িত্বে আছেন। জাহেদ পারভেজ চৌধুরী ভাই। আমিনুল ভাইয়ের মতো তিনিও দেশের স্বনামধন্য অ্যাথলেট। জাহেদ ভাইসহ এনএসসিতে যারা আছেন, ওনারা যাকে যোগ্য ভেবেছেন তাকে কমিটিতে রেখেছেন। আমি শিরিন, খেলোয়াড় থেকে কোচ হয়েছি। যোগ্যতার মাপকাঠিতে আমার চেয়ে কেউ যদি বেশি যোগ্য হয়, সে কোচিংসহ কমিটিতে আসতে পারে। সেটা নিয়ে আমার কোনো রাগ-ক্ষোভ, খেদ নিয়ে। আমি জীবনে যুদ্ধ করেই এতদূর এসেছি। জীবনটা ফুলশয্যা নয়, এখানে লড়াই করেই আপনাদের টিকতে হবে।’
নারী হয়ে পুরুষ দলের কোচ প্রসঙ্গে কি বলবেন? গণমাধ্যম থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবখানে এ নিয়ে অনেক কথা শোনা গেছে। এ ব্যাপারে শিরিনের সোজাসাপ্টা জবাব, ‘আমি আসলে জেন্ডার বৈষম্য নিয়ে কখনো চিন্তা করি না। সবাই দেখে নারী-পুরুষ, আমি দেখি সবাই মানুষ। আমাকে ট্রেনিং করার জন্য আপনি যদি ১০০ জনও এনে দেন, আমি তাদের ট্রেনিং করানোর অ্যাবিলিটি রাখি। আমি জেন্ডার বৈষম্য হিসেবে দেখতে চাই না। আমি তাদের আমার স্টুডেন্ট হিসেবে তৈরি করতে চাই দেশের জন্য। আর সাংবাদিক ভাইবোনেরা আমার প্রতিপক্ষ নন। ওনাদের কল্যাণেই আজ আমি শিরিন সুলতানা হয়েছি। সাংবাদিকরা জাতির আয়না। সাংবাদিকরাই কিন্তু আমাকে নিয়ে অনেক নিউজ করেছেন যখন আমি নারী এবং পুুরুষ দলের কোচ ছিলাম। এসব আলোচনা আসলে সময় নষ্ট। আপনারা বরং সাত্তার এবং মাহবুব যে ভালো ফল করেছে, সেটা নিয়েই কথা বললে খুশি হব। ওরা অনেক পরিশ্রম করেছে। প্রথমবার এত বড় আসরে খেলেছে। ওরা সত্যিকার অর্থেই প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।’
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা