সমুদ্রের নীল পানির নিচে স্বচ্ছ গম্বুজের ভেতর বেড়ে উঠছে সবুজ গাছপালা। সেখানে চাষ হচ্ছে তুলসী, টমেটো, শিমসহ নানা ধরনের উদ্ভিদ। গাছের শিকড়ে পানি পৌঁছাচ্ছে বিশেষ নলের মাধ্যমে। আর সেই পানির একটি উৎস তৈরি হচ্ছে গম্বুজের ভেতরেই, সমুদ্রের পানির বাষ্পীভবন ও ঘনীভবনের প্রক্রিয়ায়। দেখতে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো মনে হলেও ইতালির উপকূলে বাস্তবেই চলছে এমন পরীক্ষামূলক কৃষি প্রকল্প। ‘নিমোস গার্ডেন’ নামের এই উদ্যোগে সমুদ্রের ৫ থেকে ১১ মিটার গভীরে স্বচ্ছ গম্বুজ বসিয়ে গাছ চাষ করা হচ্ছে। লক্ষ্য— জমি ও মিঠাপানির সংকট যেখানে কৃষিকে কঠিন করে তোলে, সেখানে বিকল্প পদ্ধতিতে ফসল ফলানোর সম্ভাবনা খুঁজে বের করা।
শখ থেকে সমুদ্রের তলায় কৃষি
২০১২ সালে ইতালির নোলি উপকূলে এই প্রকল্পের যাত্রা শুরু করেন উদ্যোক্তা সার্জিও গামবেরিনি। তার দুটি শখ ছিল ডাইভিং ও বাগান করা। এই দুইয়ের সমন্বয়ে তার মনে প্রশ্ন জাগে, সমুদ্রের নিচে কি গাছ জন্মানো সম্ভব? সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় পরীক্ষামূলক চাষাবাদ। প্রথমে ছোট একটি স্বচ্ছ গম্বুজে তুলসী লাগানো হয়। পরে গম্বুজের আকার বাড়ানো হয়, যাতে মানুষ পানির নিচে প্রবেশ করে গাছের পরিচর্যা ও ফসল সংগ্রহ করতে পারে।
সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী জানায়, তখন প্রকল্পটিতে নয়টি স্বচ্ছ গম্বুজ কার্যকর ছিল। এগুলো সমুদ্রের তলদেশে শিকল দিয়ে আটকে রাখা হয়। প্রতিটি গম্বুজে প্রায় দুই হাজার লিটার বাতাস থাকে। গম্বুজগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ভেতরে গাছের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা যায়।
মাটি ছাড়াই জন্মায় গাছ
নিমোস গার্ডেনে প্রচলিত মাটির বদলে ব্যবহার করা হচ্ছে হাইড্রোপনিক পদ্ধতি। এ ব্যবস্থায় গাছের শিকড় প্রয়োজনীয় পানি ও পুষ্টি উপাদান পায় বিশেষ নলের মাধ্যমে। ফলে চাষের জন্য প্রচলিত কৃষিজমির প্রয়োজন হয় না।
গম্বুজের ভেতরে গাছের বীজ ও বীজতলা রাখার জায়গা, পানি সরবরাহের নল এবং বাতাস চলাচলের জন্য ছোট পাখা রয়েছে। গাছের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বাতাসের অবস্থা মাপার সেন্সরও ব্যবহার করা হয়। সেন্সর থেকে পাওয়া তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় পাঠানো হয়, যাতে ভেতরের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
সমুদ্রের পানি গম্বুজের বাইরের অংশ ঘিরে থাকায় ভেতরের তাপমাত্রা তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকে। তবে গাছের বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত আলোও জরুরি। এ কারণে গম্বুজের ছাদে অতিরিক্ত আলোর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
লবণপানি থেকে যেভাবে মিঠাপানি
প্রকল্পটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো পানি সংগ্রহের ব্যবস্থা। সমুদ্রের পানি লবণাক্ত হওয়ায় তা সরাসরি অধিকাংশ ফসলের সেচে ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু নিমোস গার্ডেনে সূর্যের আলো ও তাপ কাজে লাগিয়ে পানি সংগ্রহ করা হয়।
গম্বুজের ভেতরে তাপের প্রভাবে পানি বাষ্পে পরিণত হয়। বাতাসে জমে থাকা জলীয়বাষ্প গম্বুজের ভেতরের দেয়ালে ঠান্ডা হয়ে ছোট ছোট পানির ফোঁটা তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ঘনীভবন। ফোঁটাগুলো সংগ্রহ করে সেচের পানির ট্যাঙ্কে পাঠানো হয়। এরপর গাছের প্রয়োজন অনুযায়ী তাতে পুষ্টি উপাদান মিশিয়ে শিকড়ে পৌঁছে দেওয়া হয়।
অর্থাৎ গাছ বাঁচিয়ে রাখতে সমুদ্র থেকে সরাসরি লবণপানি তুলে শিকড়ে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে না। বরং বাষ্পীভবন ও ঘনীভবনের মাধ্যমে লবণ থেকে আলাদা হওয়া পানি সংগ্রহ করে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো বাইরের উৎস থেকে মিঠাপানি আনার প্রয়োজন কমানো।
তুলসী, টমেটো থেকে শিম
প্রথমদিকে তুলসী চাষ দিয়ে পরীক্ষা শুরু হলেও পরে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ নিয়ে কাজ করা হয়। প্রকল্পটিতে টমেটো, ঢ্যাঁড়শ, শিম, পুদিনা, বিভিন্ন সুগন্ধি গাছ ও ফুল চাষের পরীক্ষা চালানো হয়েছে। তবে সব গাছ সমানভাবে সফল হয়েছে, এমন দাবি করা যায় না। প্রতিটি উদ্ভিদের আলো, তাপমাত্রা, পানি ও পুষ্টির চাহিদা আলাদা।
এখানে গাছের বৃদ্ধি শুধু চোখে দেখে পর্যবেক্ষণ করা হয় না, বিভিন্ন সেন্সরের সাহায্যে পরিবেশের তথ্যও সংগ্রহ করা হয়। এতে বোঝার চেষ্টা করা হয়, কোন পরিস্থিতিতে গাছ ভালোভাবে বেড়ে ওঠে এবং কোন বিষয়গুলো উন্নত করা প্রয়োজন। ফসল সংগ্রহের সময় কর্মীরা ডুব দিয়ে গম্বুজে প্রবেশ করেন। পরে ফসল পানির ওপরে এনে সংরক্ষণ করা হয়।
২০২০ সালে এক সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় পানির নিচে জন্মানো তুলসীর সঙ্গে স্থলভাগে জন্মানো তুলসীর তুলনা করা হয়। গবেষকরা কিছু রাসায়নিক উপাদান ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যক্রমে পার্থক্য পেয়েছিলেন। তবে গবেষণাটি নির্দিষ্ট পরিবেশে তুলসী নিয়ে করা হয়েছিল। তাই পানির নিচে জন্মানো সব গাছ বেশি পুষ্টিকর— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
ভবিষ্যতে এর কার্যকারিতা কতটুকু?
জমি ও মিঠাপানির সংকট মোকাবিলায় নিমোস গার্ডেন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও পদ্ধতিটির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সমুদ্রের গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের আলো কমে যায়। ফলে সব ধরনের ফসলের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব নয়। গম্বুজ, সেন্সর, পাম্প ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং রক্ষণাবেক্ষণেও খরচ হয়। ঝড় ও উত্তাল সমুদ্রের কারণে কাঠামোর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এ ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে ফসল উৎপাদন করলে খরচের তুলনায় কতটা লাভ হবে, তা যাচাই করা প্রয়োজন। বর্তমানে এ প্রকল্পকে প্রচলিত কৃষির বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বলা যায় না, বরং সমুদ্রের বিশেষ পরিবেশ কাজে লাগিয়ে নতুন কৃষিপদ্ধতি তৈরির একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে দেখা যায়।
সমুদ্রের নিচে এই খামার সামুদ্রিক প্রাণীর জন্যও আশ্রয়ের জায়গা তৈরি করতে পারে। প্রকল্পটির আশপাশে মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর উপস্থিতি দেখা গেছে। তবে সামুদ্রিক পরিবেশে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বুঝতে আরও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তন, মিঠাপানির ঘাটতি ও চাষযোগ্য জমির সংকট কৃষিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। সে ক্ষেত্রে নিমোস গার্ডেনের মতো উদ্যোগ বিকল্প পথ খুঁজতে সাহায্য করতে পারে। সমুদ্রের নিচে সবজির খামার হয়তো আগামী দিনের কৃষির প্রধান পদ্ধতি হয়ে উঠবে না। তবে প্রকৃতির বিদ্যমান পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে নতুন উপায়ে খাদ্য উৎপাদন করা যায়, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার একটি ব্যতিক্রমী প্রচেষ্টা এটি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি