আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পুরোনো ঋণ কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে নতুন কর্মসূচিতে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে সংস্থাটির কাছ থেকে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার নতুন ঋণ পাওয়ার বিষয়ে ব্যাংককে অনুষ্ঠেয় বার্ষিক সভায় আলোচনা করবে বাংলাদেশ। তবে নতুন ঋণ পেতে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের সংস্কার, ভর্তুকি কমানো ও বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার মতো বিষয়ে আইএমএফের শর্ত পূরণের চাপ রয়েছে। আলোচনা সফল হলে আইএমএফের নতুন ঋণের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের ১৫০ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা এবং জলবায়ু তহবিলের অর্থ পাওয়ার পথও সুগম হতে পারে।
আগামীকাল ১২ অক্টোবর থেকে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে শুরু হচ্ছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সাত দিনব্যাপী বার্ষিক সভা, যা চলবে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত। এ সভায় যোগ দিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল থাইল্যান্ডে যাওয়ার কথা রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা এবং সংস্থাটির সংস্কার সংক্রান্ত শর্তগুলো নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোই হবে প্রতিনিধি দলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
পুরোনো কর্মসূচি বাতিল, নতুন ঋণের আলোচনা
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদন করে আইএমএফ। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কর্মসূচিটির আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। এ কর্মসূচির আওতায় কয়েকটি কিস্তিতে অর্থ ছাড় হয়েছে। তবে নির্ধারিত সংস্কার বাস্তবায়নে অগ্রগতি না হওয়া এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের কারণে কর্মসূচিটির পরবর্তী কিস্তি ছাড় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
পুরোনো ঋণ বাতিল হলো কেন
পুরোনো কর্মসূচির আওতায় ২০২৭ সালের মধ্যে পুরো ঋণের অর্থ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত এপ্রিলে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভায় বর্তমান সরকার পুরোনো কর্মসূচি আর এগিয়ে নিতে আগ্রহী নয় বলে জানায়। সরকারের যুক্তি, আগের কর্মসূচির কিছু শর্ত বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সরকারের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকি কমানো কিংবা জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে কঠিন।
এরপর গত ৩ জুন নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আইএমএফের কাছে আবেদন করে সরকার। সংস্থাটিও নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। আইএমএফের মিশনপ্রধান আইভো ক্রজনার ওই সময় জানান, নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও নতুন সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিয়ে সংস্কার পরিকল্পনা তৈরি করার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের ঋণ পাওয়ার সম্ভাব্য পরিমাণ ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার। ব্যাংককে প্রাথমিক সমঝোতা হলে অক্টোবরের শেষ দিকে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসতে পারে। এরপর নভেম্বরে বিস্তারিত আলোচনা ও দরকষাকষি এবং আগামী বছরের জানুয়ারিতে সংস্থাটির পর্ষদে কর্মসূচি অনুমোদনের সম্ভাবনা রয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনামতো এগোলে নতুন অর্থবছরের মাঝামাঝি থেকে ঋণের অর্থ ছাড় শুরু হতে পারে। সম্ভাব্য কর্মসূচিতে তিন বছরে সাত কিস্তিতে অর্থ ছাড়ের আলোচনা চলছে।
নতুন ঋণের অর্থ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে আইএমএফের সঙ্গে সমঝোতা হলে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকেও অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।
রাজস্ব আদায়ে সবচেয়ে বেশি চাপ
নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় আইএমএফের অন্যতম প্রধান শর্ত হবে রাজস্ব আদায় বাড়ানো। বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। আইএমএফের লক্ষ্য, এ হার বাড়িয়ে ৯ দশমিক ২ শতাংশে নেওয়া। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপরও জোর দিচ্ছে সংস্থাটি।
পুরোনো কর্মসূচিতে প্রতি বছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অতিরিক্ত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের সমপরিমাণ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল। পাশাপাশি করছাড় যৌক্তিক করা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঠামোগত সংস্কারের শর্তও দেওয়া হয়েছিল। তবে এসব ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এনবিআর বিলুপ্ত করে রাজস্বনীতি ও রাজস্ব আদায় বিভাগ আলাদা করার শর্ত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারি করলেও বর্তমান সরকার তা আইনে পরিণত করেনি। বিষয়টি পর্যালোচনায় প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন এখনও পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে যৌক্তিকভাবে সব ধরনের করছাড় প্রত্যাহারের শর্ত থাকলেও এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি সীমিত। নতুন কর্মসূচিতে রাজস্ব আদায়ের বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ এবং তা অর্জনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।
রাজস্ব আদায় বাড়াতে সরকার বাংলা কিউআর, ই-ইনভয়েসিং ও এনবিআরের অটোমেশনসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরতে পারে। তবে এসব পদক্ষেপের বাস্তবায়ন ও রাজস্ব আদায়ে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।
ব্যাংক খাত সংস্কারেও কঠোর শর্ত
রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি ব্যাংক খাতের সংস্কারও আইএমএফের অন্যতম অগ্রাধিকার। দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা নিরূপণ, খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা বাড়ানোর বিষয়ে সংস্থাটির চাপ রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে ১১টি দুর্বল ব্যাংকের সম্পদের প্রকৃত মান যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় ব্যাংক রেজুলেশন আইন প্রণয়ন এবং পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। তবে আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করতে এসব উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
আইএমএফের দৃষ্টিতে, ব্যাংক খাতে সুশাসন ও আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ছাড়া সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা কঠিন। তাই নতুন ঋণ কর্মসূচিতে ব্যাংক খাতের সংস্কারের সময়সীমা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ভর্তুকি কমানো ও বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার চাপ
বিদ্যুৎ, সার ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমানোর বিষয়েও আইএমএফের শর্ত রয়েছে। তবে এক ধাপে বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিবর্তে দুই বছরে পর্যায়ক্রমে ভর্তুকি কমানোর বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। সরকার ইতিমধ্যে বিদ্যুতের দাম ১৫ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
বিনিময় হার আরও নমনীয় করার বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে। বর্তমানে ক্রলিং পেগ পদ্ধতিতে ডলারের বিনিময় হার নির্ধারণ করা হচ্ছে। আইএমএফ চায়, বাজারের চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে বিনিময় হার আরও বেশি নির্ধারিত হোক। তবে এ ধরনের পরিবর্তনের ফলে আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও ব্যবসায়িক খরচে কী প্রভাব পড়তে পারে, তা বিবেচনায় রাখতে হবে সরকারকে।
অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আইএমএফ কিছু বিষয়ে নমনীয় হলেও রাজস্ব আদায়, ব্যাংক খাত সংস্কার, ভর্তুকি ও বিনিময় হার নিয়ে সংস্থাটির অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। নতুন কর্মসূচির আলোচনা সফল করতে এসব বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা তুলে ধরতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের ১৫০ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা
আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতা হলে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছ থেকে বাজেট সহায়তা পাওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের জন্য দুটি খাতে অর্থায়নের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। এর মধ্যে ব্যাংক খাতের সংস্কারে ৫০ কোটি ডলার এবং সামাজিক সুরক্ষা ও জ্বালানি খাতে ১০০ কোটি ডলার সহায়তার সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে এ অর্থের পরিমাণ ১৫০ কোটি ডলার। তবে অর্থায়নের চূড়ান্ত পরিমাণ ও ছাড়ের সময় নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি এবং শর্ত পূরণের ওপর।
জলবায়ু তহবিল ও অন্যান্য সহায়তা
এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও সহনশীলতা বাড়াতে বিশ্বব্যাংকের কাছে ১০০ কোটি ডলারের তহবিল চেয়েছে বাংলাদেশ। ব্যাংককের বার্ষিক সভায় এ বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।
আইএমএফের অর্থের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আস্থার সংকেত
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আইএমএফ প্রোগ্রাম না থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমবে। রিজার্ভ বাড়ানো কঠিন হবে। বিশ্বব্যাংক ও এডিবির বাজেট সাপোর্ট আটকে যাবে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আইএমএফের টাকাটা বড় নয়, ৫ বিলিয়ন ডলার ৩ বছরে। কিন্তু আইএমএফের সিল থাকলে অন্য দাতারা টাকা দেয়। এটি একটি সনদপত্রের মতো। তাই ব্যাংকক বৈঠক বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও