এবার পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা আব্দুল রহিমকে (৩৭) বাংলাদেশে পুশইন করল ভারতীয় পুলিশ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত-সংলগ্ন ভাটোল পুলিশ ফাঁড়ি ভারতীয় নাগরিক আব্দুল রহিমকে আটক করে পরবর্তী সময়ে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইন করে। ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ‘বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ’ (মাসুম) এই বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে গত ৮ অক্টোবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে। ওই অভিযোগের একটি কপি এই প্রতিবেদক হাতে পেয়েছেন।
ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ‘বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ’ (মাসুম) গত ৮ অক্টোবর দেশটির জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে দেওয়া লিখিত অভিযোগপত্রে জানায়, আব্দুল রহিম (বয়স প্রায় ৩৭ বছর), পিতা মি. লাল মোহাম্মদ, গ্রাম কুইলারা অনন্তপুর, ভাটোল গ্রাম পঞ্চায়েত, থানা রায়গঞ্জ, জেলা উত্তর দিনাজপুর, পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা— তার কথিত অবৈধ গ্রেফতার, গোপন আটক এবং পরবর্তীকালে অদৃশ্য-স্থানান্তর এক গুরুতর ঘটনা।
পরিস্থিতি দৃঢ়ভাবে ইঙ্গিত দেয় যে ভারতের সংবিধান দ্বারা নিশ্চিত মৌলিক অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন ঘটেছে এবং এটি অত্যন্ত গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে— একজন ভারতীয় নাগরিক-বাসিন্দাকে কোনো আইনানুগ পদ্ধতি অনুসরণ না করেই দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে কি না। আব্দুল রহিম ধান ব্যবসায়ী এবং তার স্ত্রী ও চার সন্তানের সঙ্গে বাস করেন। তার পিতা লাল মোহাম্মদ (পিতা সাজ্জাদ আলি) জনৈক ভারত রায়ের কাছ থেকে যথাযথভাবে নিবন্ধিত বিক্রয় দলিলের মাধ্যমে এক খণ্ড জমি ক্রয় করেন। আব্দুল রহিম পরবর্তীকালে সেই সম্পত্তির ওপর স্থায়ী পাকা বাসগৃহ নির্মাণ করেন, যেখানে তিনি ও তার পরিবার বসবাস করে আসছেন।
পরিবারটি ভারতের মধ্যে প্রকাশ্যে বসবাস করে আসছে এবং আব্দুল রহিমের কাছে আধার কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র, প্যান কার্ড ও রেশন কার্ডসহ একাধিক নথি রয়েছে, যা তাকে ভারতীয় বাসিন্দা-নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করে। গত ২ জুন রাত ১১টার দিকে পুলিশ, বিএসএফ এবং সিভিক পুলিশ কর্মীদের একটি দল গাড়ি ও মোটরসাইকেলসহ আব্দুল রহিমের বাসগৃহে প্রবেশ করে তাকে বাড়ির ভেতরে না পেয়ে তারা কথিতভাবে তার বড় ছেলে আবু কালামকে (প্রায় ২৬ বছর) গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। আবু কালামের বিষয়ে পরিবারকে কোনো গ্রেফতারি মেমো দেওয়া হয়নি এবং গ্রেফতারের আইনি কারণ সম্পর্কেও স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
গত ৩ জুন লাল মোহাম্মদ (আব্দুল রহিমের পিতা), সিরাজুল হক (চাচা), ইউসুফ (ভাটোল গ্রাম পঞ্চায়েতের উপ-প্রধান), নাইয়েম আকতার (একই গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য) এবং বেশ কয়েকজন স্থানীয় গ্রামবাসী আবু কালামের মুক্তির জন্য ভাটোল পুলিশ আউটপোস্টে যান। আউটপোস্টে পুলিশ আব্দুল রহিমকে হাজির করতে বলে। এমন সময় সদ্ভাব রেখে এবং লুকানোর কিছু নেই ভেবে আব্দুল রহিম নিজেই উপরোক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে এবং তার পরিচয়পত্র নিয়ে ভাটোল পুলিশ আউটপোস্টে যান। ওই পুলিশ তার কাছ থেকে আধার কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র, প্যান কার্ড, রেশন কার্ড এবং অন্যান্য পরিচয়পত্রের নথিগুলো নিয়ে নেয়। কিন্তু কোনো জব্দ তালিকা বা রসিদ প্রস্তুত করা হয়নি বা আব্দুল রহিম কিংবা তার পরিবারকে দেওয়া হয়নি। এরপর পরিচয় যাচাইয়ের পর বাড়ি ফিরে যাওয়ার অনুমতি না দিয়ে আব্দুল রহিমকে কথিতভাবে পুলিশ লকআপে রাখা হয়।
অভিযোগ পত্রে জানানো হয়, আব্দুল রহিম সংক্রান্ত পুরো ঘটনাটি গত ৩ জুন সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে ঘটেছে। এরপর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ভাটোল পুলিশ আব্দুল রহিমকে আটকের তথ্য অস্বীকার করে। পরবর্তীকালে তার পরিবার বিভিন্ন তারিখ ও সময়ে বাংলাদেশ থেকে আব্দুল রহিমের টেলিফোন কল পেয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। এই টানাপোড়েন কমিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা চলছে। দুই দেশের শীর্ষ প্রধানের মধ্যে বৈঠকের চেষ্টা চলছে। কিন্তু এমন প্রচেষ্টার মধ্যেও দিল্লির পুশইন থামছে না। শেষ পর্যন্ত দিল্লি তাদের ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশি বলে পুশইন করেছে, যা ভারতেরই মানবাধিকার সংগঠন অভিযোগ উত্থাপন করেছে। এমন কর্মকাণ্ডে প্রশ্ন জাগে যে প্রকৃতপক্ষে ভারত কি বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক চায়? এমন ঘটনা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বার্তা দেয় না।
ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠন ‘বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ’র (মাসুম) সেক্রেটারি কিরিটি রায় দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, ‘ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হেফাজতে বা নিয়ন্ত্রণে থাকা অবস্থায় কোনো বৈধ আদেশ বা আইনসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ না করেই আব্দুল রহিমকে ভারত থেকে সরিয়ে নেওয়ায় ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, বেআইনি আটক এবং সরকারি ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তিনি যদি বিদেশি নাগরিগ হয়েও থাকেন তারপরও শুধু একটি নথিবিহীন নির্বাহী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে বিদেশি হিসেবে গণ্য করা যায় না এবং এরপর এমন পরিস্থিতিতে তাকে বহিষ্কার করা যায় না।’
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই ভারত বাংলাদেশে পুশইন করছে। এবার ভারত নিজেদের নাগরিককেই পুশইন করেছে বলে জানা যাচ্ছে। পুশইনের মত ঘটনা চলমান থাকলে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না। যেখানে দুই পক্ষই দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সেখানে এমন ঘটনায় ভারতের আন্তরিকতার প্রশ্নের জন্মের দেয়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও