কোল্লাপাথরের টিলায় শায়িত ৫০ বীরের সমাধিস্থল

ইয়াসিন মনি খান, কসবা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)

সারাদেশ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার বায়েক ইউনিয়নের লালমাটির টিলা ঘেরা গ্রাম কোল্লাপাথর। ছোট্ট এই টিলার ওপর গড়ে উঠেছে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ ৫০

2026-10-11T19:04:52+00:00
2026-10-11T19:04:52+00:00
 
  রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬,
২৬ আশ্বিন ১৪৩৩
রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
কোল্লাপাথরের টিলায় শায়িত ৫০ বীরের সমাধিস্থল
ইয়াসিন মনি খান, কসবা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
প্রকাশ: রোববার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:০৪ পিএম 
কোল্লাপাথরের টিলায় শায়িত ৫০ বীরের সমাধিস্থল। ছবি : সময়ের আলো
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার বায়েক ইউনিয়নের লালমাটির টিলা ঘেরা গ্রাম কোল্লাপাথর। ছোট্ট এই টিলার ওপর গড়ে উঠেছে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ ৫০ বীর সেনানীর সমাধিস্থল। বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান হিসেবে পরিচিত কোল্লাপাথর।

কসবা একটি সীমান্তবর্তী উপজেলা। মুক্তিযুদ্ধের সময় এটি ছিল ২ নম্বর সেক্টরের আওতাধীন। কসবার পাশেই ভারতের আগরতলা। মুক্তিযুদ্ধের সময় সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। প্রশিক্ষণ ক্যাম্প থাকায় এ অঞ্চলটি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অন্যতম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় কুমিল্লা-আখাউড়া, ভৈরব ও ঢাকা শহর, ফরিদপুর এবং নোয়াখালী জেলার অংশবিশেষ ছিল ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে। এই সেক্টরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমান্ডার ছিলেন মেজর খালেদ মোশারফ (এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর) এবং মেজর এ এম এন নূরুজ্জামান (সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর)।

২ নম্বর সেক্টরকে ছয়টি সাব-সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। এই তিনটির একটি সাব-সেক্টরের অন্তর্গত ছিল কোল্লাপাথর। যুদ্ধের সময় মুক্তাঞ্চল হওয়ায় কোল্লাপাথর ছিল মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের অন্যতম আশ্রয়স্থল।

কোল্লাপাথরের এই জায়গাটি যিনি দান করেছিলেন, সেই আব্দুল মান্নানের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল করিম বলেন, ১৯৭১ সালের ৬ জুন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আর্টিলারি শেলে মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় শহিদ হন হাবিলদার তৈয়ব আলী।

চতুর্থ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের ২ নম্বর সেক্টরের ২ নম্বর সাব-সেক্টরের ক্যাপ্টেন গাফফার তাকে ডেকে নিয়ে লাশ দাফনের জন্য নিরাপদ জায়গা খুঁজে বের করতে বলেন। তখন তিনি তাদের পারিবারিক একটি কবরস্থানের কথা জানান। ক্যাম্পের কয়েকজন এসে জায়গাটি পছন্দ করেন। পরে তিনি তার বাবা-মায়ের হাতে লাশ বুঝিয়ে দেন এবং গ্রামবাসীর সহযোগিতায় পারিবারিক কবরস্থানে হাবিলদার তৈয়ব আলীকে দাফন করা হয়।

সেই থেকেই শুরু। একে একে সেখানে দাফন করা হয় আরও শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের। একসময় পারিবারিক কবরস্থানটি হয়ে ওঠে ৫০ বীর সেনানীর সমাধিস্থল।

কোল্লাপাথর সমাধিস্থলে সমাহিত শহিদদের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মো. আবদুল জব্বার (মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এখনো স্বীকৃতি পাননি), মো. ফকরুল আলম, মো. ফারুক আহম্মদ, মোজাহিদ নুরু মিয়া, মো. নোয়াব আলী, মো. আবদুল অদুদ, মো. আবদুল কাইয়ুম, ল্যান্স নায়েক, মো. আ. খালেক, মো. রফিকুল ইসলাম, মো. মোরসেদ মিয়া, মো. তাজুল ইসলাম, মো. শওকত, মো. আবদুস সালাম সরকার, মো. আমির হোসেন, শ্রী পরেশ চন্দ্র মল্লিক, মো. আবদুল আউয়াল, মো. জাবেদ আহাম্মদ, মো. মতিউর রহমান, মো. আবদুর রশিদ এবং সিপাহি শহিদুল হক।

কুমিল্লার সিপাহি আক্কাছ আলী, সিপাহি জসিম উদ্দীন, মো. আবদুল কাসেম (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী), মো. মোশারফ হোসেন, নায়েক সুবেদার মইনুল হোসেন (বীর উত্তম), সিপাহি হুমায়ুন কবির, ল্যান্স নায়েক আজিজুর রহমান, মো. তারু মিয়া, মো. জামাল উদ্দিন, মো. সিরাজুল ইসলাম, মো. ফরিদ মিয়া, মো. সাকিল মিয়া, সিপাহি মো. আবদুল বারী খন্দকার।

চাঁদপুরের সিপাহি মো. নুরুল হক, মো. জাহাঙ্গীর আলম, আনসার ইলাহী বক্স পাটোয়ারী (বীর প্রতীক), সিলেটের হাবিলদার তৈয়ব আলী, ঠাকুরগাঁও জেলার সৈনিক দর্শন আলী, ঢাকার আর কে মিশন রোডের মো. জাকির হোসেন, বগুড়ার ল্যান্স নায়েক আবদুস সাত্তার (বীর বিক্রম), ময়মনসিংহের নায়েক মোজাম্মেল হক, নোয়াখালীর নায়েক সুবেদার মো. আবদুল সালাম (বীর বিক্রম), ফরিদপুরের সিপাহি মুসলীম মৃধা, শরিয়তপুরের প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম, চট্টগ্রামের নায়েক সুবেদার বেলায়েত হোসেন (বীর উত্তম), কিশোরগঞ্জের শ্রী আশু রঞ্জন দে। এ ছাড়া রয়েছেন সিপাহি আনোয়ার হোসেন এবং অজ্ঞাত তিনজন।

প্রত্যেকের কবরের সামনে তাঁদের নাম-ঠিকানা লেখা রয়েছে। সমাধিস্থলে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে শহিদদের নাম-ঠিকানাসংবলিত শ্বেত পাথরের দুটি বড় ফলক। ‘একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে বীর শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা’ শিরোনামের ফলকে ৪৭ জন শহিদের নাম রয়েছে। বাকি তিনজন অজ্ঞাত।

মমতায় আগলে রেখেছেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল করিম
টিলার ওপরের সমাধিস্থলটি সাদামাটা হলেও সর্বত্র রয়েছে মমতার ছোঁয়া। মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল করিম প্রতিদিন সমাধিস্থল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, দর্শনার্থীরা এলে তাঁদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরা এবং আপ্যায়নে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। সমাধিস্থলের উন্নয়নের জন্য দেশের বিশিষ্টজনদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন তিনি।

আব্দুল করিম জানান, এখানে সমাহিত শহিদদের স্বজনরা মাঝে-মধ্যে সমাধিস্থলে আসেন। তারা প্রিয়জনের কবর জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁদের অধিকাংশের আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। বিশেষ করে স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে শহিদ পরিবারের সদস্যরা এখানে এসে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

সমাধিস্থলে শরিয়তপুরের প্রকৌশলী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে একটি কবরের সমান জায়গা খালি রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল করিম জানান, নজরুল ইসলাম একটি হাসপাতালে মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি বলে গিয়েছিলেন, তাকে যেখানেই সমাহিত করা হোক না কেন, তার পাশে যেন স্ত্রীকে দাফনের জন্য জায়গা রাখা হয়। তার স্ত্রী এখনও জীবিত এবং ঢাকায় থাকেন। তাই তার কবরের পাশের জায়গাটি এখনো ফাঁকা রাখা হয়েছে।

১৯৭২ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমা প্রশাসক ও অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতায় কোল্লাপাথরের এই স্থানটি সংরক্ষণ করা হয়। পরে এখানে রেস্ট হাউস, তোরণ ও পুকুরের পাকা ঘাট নির্মাণ করে সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা হয়।

এখানে সমাহিত নায়েক সুবেদার মইনুল হোসেনের নামেই ঢাকা সেনানিবাস এলাকার পরিচিত ‘মইনুল সড়ক’-এর নামকরণ করা হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল করিম সমাধিস্থলের পাশেই নিজের পৈতৃক ভিটায় বসবাস করেন। আট মেয়ে ও তিন ছেলের বাবা আব্দুল করিমের মনে মাঝেমধ্যে দুশ্চিন্তা জাগে, তার অবর্তমানে কোল্লাপাথরের এই সমাধিস্থলটি একইভাবে মমতায় আগলে রাখা হবে কি না।

তবুও শেষ জীবনের স্বপ্ন দেখেন তিনি। পাহাড়ি সৌন্দর্যমণ্ডিত এই ঐতিহাসিক স্থানের আশপাশের জমি অধিগ্রহণ করে এখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আরও সাড়ে ১১শ’ মুক্তিযোদ্ধার কবরকে একত্রিত করা, জাতীয় চার নেতা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি স্থাপন এবং একটি হেলিপ্যাডসহ সমাধিসৌধ ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলাই তার স্বপ্ন।

সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   ব্রাহ্মণবাড়িয়া  কসবা  উপজেলা  লালমাটি  টিলা  কোল্লাপাথর  মুক্তিযুদ্ধ  শহিদ  সমাধিস্থল  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: