কেন হুতিদের ঠেকাতে পারছে না সৌদি আরব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের একের পর এক প্রাণঘাতী হামলার মুখে পড়েছে সৌদি আরব। গত শনি ও রোববার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক

2026-10-12T23:24:58+00:00
2026-10-13T00:08:42+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬,
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
কেন হুতিদের ঠেকাতে পারছে না সৌদি আরব
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:২৪ পিএম  আপডেট: ১৩.১০.২০২৬ ১২:০৮ এএম
সংগৃহীত ছবি
ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের একের পর এক প্রাণঘাতী হামলার মুখে পড়েছে সৌদি আরব। গত শনি ও রোববার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশটির প্রধান বিমানবন্দরে এটিকে সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। 

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় বিদেশি কূটনৈতিক মিশনগুলো তাদের নাগরিকদের ওই বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর রিয়াদ সেখানে সামরিক তৎপরতা বাড়ায়। এর পর থেকেই উত্তেজনা বাড়তে থাকে। 

ইয়েমেনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড হুতিদের নিয়ন্ত্রণে, যেখানে দেশটির ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ বসবাস করে। গত মাসে লোহিত সাগর উপকূলের কয়েকটি কৌশলগত এলাকা হুতিরা দখল করে নিলে সৌদি আরব তাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায় এবং ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর পাল্টা অভিযানে সমর্থন দেয়। এর জবাবে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা ও পর্যটন অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করে হুতিরা।

তবে হুতিদের ক্রমাগত পাল্টা হামলায় সৌদি আরবের শত শত কোটি ডলারের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এসেছে। একই সঙ্গে তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে বহুমুখী করতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান রিয়াদকে বিনিয়োগ ও ব্যবসার নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তিও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

সৌদি ও হুতিদের সামরিক সক্ষমতা

বিশ্বের অন্যতম সুসজ্জিত সামরিক বাহিনী রয়েছে সৌদি আরবের। ২০২৫ সালে দেশটি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬.৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৮৩ বিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করেছে। সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে এটি বিশ্বের অষ্টম সর্বোচ্চ অবস্থান।

সম্প্রতি তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করলেও নিজস্ব সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে সৌদি আরবের সক্ষমতা সীমিত। এ কারণে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো পশ্চিমা দেশের তৈরি উন্নত অস্ত্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

সৌদি সামরিক বহরে রয়েছে এফ-১৫ ইগল ও ইউরোফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমান। পাশাপাশি দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

অন্যদিকে, ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর থেকে নিজেদের অস্ত্রভান্ডার উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করেছে হুতিরা। তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ইয়েমেন থেকে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরের ইসরায়েলেও আঘাত হানতে সক্ষম।

আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে হুতিরা একই সঙ্গে বিভিন্ন গতি ও সক্ষমতার ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। তাদের অস্ত্রভান্ডারে মাঝারি পাল্লার হাইপারসনিক সক্ষমতাসম্পন্ন ‘প্যালেস্টাইন-২’, ইরানের কদর ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নত সংস্করণ ‘তুফান’ এবং ‘বোরকান’ ও ‘বদর’ সিরিজের স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।

যেভাবে ফাঁকি দিচ্ছে সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা

প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও হুতিদের হামলা পুরোপুরি ঠেকাতে পারছে না সৌদি আরব। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অন্যতম প্রধান কারণ দেশটির বিশাল ভৌগোলিক আয়তন।

অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বিশ্লেষক থমাস জুনো বলেন, সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হুতিদের কিছু হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও দেশটি এত বড় যে সব এলাকায় ধারাবাহিকভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন।

প্রায় ২২ লাখ ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশটিতে রিয়াদ, বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি এবং ধর্মীয় পবিত্র শহরগুলো সুরক্ষিত রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু প্যাট্রিয়ট বা থাডের মতো প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে এত বিস্তৃত এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

লন্ডনভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান মেনা অ্যানালিটিকার অ্যান্ড্রেয়াস ক্রিগ বলেন, প্যাট্রিয়ট, থাড, যুদ্ধবিমান ও সেন্সর মিলিয়ে একাধিক স্তরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হলেও সৌদি আরবের মতো বিশাল দেশে সম্পূর্ণ নিরাপদ আকাশ প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করা সম্ভব নয়।

এদিকে, ধারাবাহিক হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে সৌদি আরবের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদও দ্রুত কমে আসছে। বিশ্বজুড়েই এসব ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ ও মজুদ নিয়ে সংকট রয়েছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে হামলা চলতে থাকলে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।

কেন হামলা বাড়াচ্ছে হুতিরা

বিশ্লেষক অ্যান্ড্রেয়াস ক্রিগের মতে, নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য হুতিদের প্রতিবারই সৌদির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করতে হবে, এমন নয়। মাঝেমধ্যে দু-একটি হামলা সফল হলেই রিয়াদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

থমাস জুনোর মতে, হুতিরা সংঘাতের প্রচলিত নিয়ম বদলে দিতে চাইছে। সৌদি বিমানবাহিনী সানার বিমানবন্দরে হামলা চালানোর পর হুতিরাও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।

জুনো বলেন, হুতিদের বার্তা স্পষ্ট—শান্তি বজায় রাখার মূল্য দিন দিন বাড়ছে। তাঁর মতে, সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন, কারণ দেশটি কয়েক বছর ধরে ইয়েমেন যুদ্ধ থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল।

রিয়াদ বিমানবন্দর কেন সৌদি আরবের জন্য বড় উদ্বেগ

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু রিয়াদ। শহরটিকে আন্তর্জাতিক পর্যটন, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং বড় বড় আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে চায় সৌদি সরকার।

এ কারণে রিয়াদের বিমানবন্দর দেশটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থাপনা। বিমানবন্দরে হামলা শুধু নিরাপত্তার জন্যই হুমকি নয়, বরং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অ্যান্ড্রেয়াস ক্রিগ সতর্ক করে বলেন, বিমানবন্দরে হামলায় সরাসরি সামরিক ক্ষতি কম হলেও এর অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

রিয়াদে ‘ডব্লিউপিসি এনার্জি কংগ্রেস’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আয়োজনের ঠিক আগেই শনিবারের প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে। ফলে দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

হামলার আগে কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠালেও সম্প্রতি তা বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। শনিবারের হামলার পর সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রাথমিক বিবৃতি আসার আগেই কয়েকটি দেশের দূতাবাস তাদের নাগরিকদের রিয়াদ বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়। এতে কূটনৈতিক অস্বস্তিও আরও বেড়েছে।

সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের উন্নত অস্ত্র ও বিশাল প্রতিরক্ষা বাজেট থাকা সত্ত্বেও হুতিদের ধারাবাহিক হামলা দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছে। বিশাল ভূখণ্ডের সুরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলোকে নিরাপদ রাখার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করাই এখন রিয়াদের জন্য বড় পরীক্ষা।


সময়ের আলো/ইউএমএইচ

  বিষয়:   হুতি  সৌদি আরব  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: