চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি অপারেটর, জিসিবি পরিচালনা নিয়ে ধোঁয়াশা

সাইফুদ্দিন তুহিন, চট্টগ্রাম

জাতীয়

চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থের (জিসিবি) পরিচালনা নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে এনসিটি পরিচালনা দেওয়ার পর জিসিবির অপারেটর

2026-10-13T02:57:17+00:00
2026-10-13T02:57:17+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬,
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি অপারেটর, জিসিবি পরিচালনা নিয়ে ধোঁয়াশা
সাইফুদ্দিন তুহিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৫৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থের (জিসিবি) পরিচালনা নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে এনসিটি পরিচালনা দেওয়ার পর জিসিবির অপারেটর নিয়ে জোরালো হচ্ছে আলোচনা। বন্দর সংশ্লিষ্টদের সন্দেহ বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়া হচ্ছে জিসিবি। তবে বন্দর কর্মকর্তা এবং বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা জিসিবির পরিচালনা ছেড়ে দেওয়া নিয়ে নিশ্চিত নন। তারা বলছেন, আমরা কনটেইনার টার্মিনাল বেসরকারি বা বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার বিষয় জানি। জিসিবির ব্যাপারে এখনও নিশ্চিই নই। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশি-বিদেশি অপারেটরের আলোচনায় সব সময় বাইরে ছিল জিসিবি। ওয়ান ইলেভেন পর চট্টগ্রাম বন্দর কার্যক্রমে অনেক পরিবর্তন হয়। ভেঙে দেওয়া হয় ডক শ্রমিক পরিচালনা পরিষদ। ২০০৭ সালের মে মাসে স্টিভিডোরিং প্রথা বিলুপ্ত করে চালু করা হয় বার্থ অপারেটর সিস্টেম। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এনসিটির নির্মাণ শুরু হয়। ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে টার্মিনালটির পাঁচ জেটির নির্মাণ সম্পন্ন হয়। বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ করা এই টার্মিনাল চালু হয় ২০১৫ সালে। যাত্রার শুরু থেকেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনা হয়ে আসছে। একই সঙ্গে সিসিটিও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনা হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে এনসিটি পরিচালনা করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। সিসিটিতে এখনও আছে দেশীয় অপারেটর সাইফ পাওয়ার টেক। নতুন কনটেইনার টার্মিনালগুলো বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালিত হবে বা হচ্ছে। এনসিটিতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ নিয়ে তুমুল আলোচনার মধ্যে জিসিবি প্রসঙ্গ চমক সৃষ্টি করেছে। 

সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার তোড়জোড় চলছে। পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালও (পিসিটি) বিদেশি অপারেটরের হাতে। কিন্তু আলোচনায় না থাকা জিসিবির পরিচালনাও বিদেশিদের হাতে যাচ্ছে বলে মনে করছে শ্রমিক সংগঠনগলো। তারা বলছেন, আমরা মনে করছি এনসিটি-সিসিটি-পিসিটির মতো জিসিবিও বিদেশি অপারেটর পরিচালনা করবে। 

জিসিবি বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়া হচ্ছে এই আলোচনার একটি বড় ভিত্তি হচ্ছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠি। সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব ফারজানা হোসেন স্বাক্ষরিত এই চিঠির অনুলিপি আসে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের কাছে। গেল ২৮ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত এই চিঠি দেওয়া হয় ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর। চিঠিতে বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়, বন্দর কর্তৃপক্ষের সিসিটি, জেনারেল কার্গো বার্থ এবং দি বে পোর্ট মাল্টিপারপাস টার্মিনাল প্রকল্পসমূহ পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের বিষয়ে বেসরকারি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল আগ্রহ ব্যক্তকরণ বিষয় সংক্রান্ত। সূত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ কর্তৃপক্ষের পত্র নম্বর ০৩. ১১. ০০০০.০০০. ৮৫৬.৮২.০০০১. ১৮.৬৮, তারিখ-১৯.০৮.২০২৬। এই চিঠিতে অন্য টার্মিনালের সঙ্গে জিসিবির নাম উল্লেখ থাকায় পরিচালনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। চিঠি বন্দরে পৌঁছার পরই বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ নেতারা জানতে পারেন। এরপর এনসিটির আন্দোলনে জিসিবির বিষয়টিও যুক্ত করা হয়। চলমান আন্দোলনে বার বার জিসিবির প্রসঙ্গ যেভাবে বলা হয়েছে অতীতে কখনো বলা হয়নি বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও শ্রমিক নেতারা। 

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম সময়ের আলোকে বলেন, জিসিবিতে বিদেশি অপারেটর দেওয়া হবে এরকম একটা কথা শুনেছি। কিন্তু এই ধরনের কোনো সিদ্ধান্তের বিষয় বা চিঠি আমার কাছে নেই। যেহেতু বিষয়টি মিনিস্ট্রি থেকে আসছে সেখানে যোগাযোগ করলে ভালো হয়। তারপরও জিসিবির বিষয়টি আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জেনে নেব। 

বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, জিসিবি দীর্ঘদিন ধরে বন্দরের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়োগ করা ১২ জন অপারেটর জিসিবিতে হ্যান্ডলিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বন্দরের অধীনে সরাসরি পরিচালিত জিসিবি অতীতে কখনো দেশি-বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার কথা শুনিনি। আমরা এখন শুনতে পারছি জিসিবি বিদেশি অপারেটরকে দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে পরিচালনাকারী বার্থ অপারেটরদের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বন্দরের কাছে। প্রস্তাবে জিসিবির বার্থ অপারেটরদের হাতে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। এই আবেদন বা চিঠির ব্যাপারে বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো জবাব এখনও পায়নি।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, এনসিটি-সিসিটিতে বিদেশি অপারেটরের কাছে দেওয়ার বিষয় আমরা জানি। ইতিমধ্যে এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে পরিচালনার ভার দেওয়া হয়েছে। তবে জিসিবি দেওয়া হচ্ছে কিনা কেন দেওয়া হবে তা আমরা নিশ্চিত নই। 

বন্দর শ্রমিক দলের নেতা এবং বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, অন্য টার্মিনালের মতো জিসিবি বিদেশি অপারেটরের কাছে হস্তান্তর হবে বলে আমরা শুনেছি। চট্টগ্রাম বন্দরের জিসিবি কখনো দেশি অপারেটরের হাতে ছিল না। বন্দর নিয়োজিত বার্থ অপারেটররা এটি পরিচালনা করে আসছে। তবে মনে হয় জিসিবিও বিদেশি অপারেটরকে দিয়ে দেওয়া হবে। 

চট্টগ্রাম বন্দরে বৃহত্তম টার্মিনাল হিসেবে পরিচিত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। বন্দরের ৪০ ভাগ কনটেইনার এককভাবে এই টার্মিনালে হ্যান্ডেল হয়। চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে (পিসিটি) পৃথক অপারেটর পরিচালনা করছে। এরমধ্যে সিসিটি পরিচালনা করছে বিতর্কিত অপারেটর সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেড। আর পিসিটি পরিচালনা করছে সৌদি আরবভিত্তিক অপারেটর রেড সি গ্যাটওয়ে টার্মিনাল বা আরএসজিটি। তিনটি কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে একটি বিদেশি অপারেটরের পরিচালনার চুক্তি হয়েছে। আরেকটি বিদেশি অপারেটর পরিচালনা করছে। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরের জিসিবিতে কখনো দেশি-বিদেশি অপারেটর ছিল না। জিসিবি ছিল বন্দরের অধীনে।

বন্দরের নিয়োগ করা ১২ জন বার্থ অপারেটর জিসিবি পরিচালনা করছে। জিসিবিতে মোট ছয়টি বার্থ আছে। এরমধ্যে ছয়টি খোলা পণ্যবাহী জাহাজের। বাকি ছয়টি কনটেইনার জাহাজের বার্থ। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে জিসিবির খোলা পণ্যের বার্থে কনটেইনার জাহাজ এবং কনটেইনারের বার্থে খোলা পণ্যের জাহাজ ভিড়তে পারে। জিসিবিতে খোলা পণ্য এবং কনটেইনার দুই ধরনের পণ্য খালাস করা যায়। জিসিবিতেই দুই ধরনের পণ্যবাহী জাহাজ ভেড়ার সুবিধা আছে। এনসিটি, সিসিটি এবং পিসিটিতে এই সুবিধা নেই। সেখানে শুধু কনটেইনারবাহী জাহাজ ভিড়তে পারে। খোলা পণ্য বা বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ ভিড়তে পারে না। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জিসিবিতে কাজ করে অন্তত ১০ হাজার শ্রমিক। এসব শ্রমিকদের মধ্যে আছে ডক শ্রমিক, ল্যাসিং আনলেসিং শ্রমিক, হুইন্সম্যান থেকে পরিবহন কাজে নিয়োজিত বিভিন্ন ক্যাটাগরির শ্রমিক। বিদেশি অপারেটরের হাতে গেলে এসব দক্ষ শ্রমিকের চাকরি থাকবে কিনা তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়।

চুক্তি বাতিল দাবিতে অনশন
এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ১৫ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত ও চুক্তি স্বাক্ষরের প্রতিবাদে অনশন পালন করেছে শ্রমিক সংগঠনগুলো। সোমবার (১২ অক্টোবর) চট্টগ্রাম নগরীর কাস্টমস ভবনের বিপরীতে সকাল ১১টা থেকে এ কর্মসূচি শুরু হয়। বিকাল পর্যন্ত চলে অনশন। অনশনে শ্রমিক সংগঠনের নেতা থেকে সাধারণ কর্মচারী অনেকেই অংশ নেন। ‘বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’ এবং ‘জাতীয়তাবাদী বন্দর রক্ষা কমিটি ও শ্রমিক দল’ যৌথ উদ্যোগে এ প্রতিবাদ কর্মসূচি পরিচালিত হয়। 

সংগঠনের নেতারা বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে সরকার ভুল করেছে। গত ৮ অক্টোবর জনমত সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এবং বন্দর ব্যবহারকারী কিংবা শ্রমিকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই একতরফাভাবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। 

শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেন, বন্দরকে বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি, ভৌগোলিক নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বকে চরম ঝুঁঁকিতে ফেলা হয়েছে। সরকার বন্দর পরিচালনায় আধুনিকায়ন ও দুর্নীতিমুক্ত করার কথা বললেও মূলত এটি একটি বিদেশি গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার কৌশল।

বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে ইজারা দেওয়ার পর বন্দরে কর্মরত দুই শতাধিক কর্মচারীর কাজের ধরন ও চাকরির ভবিষ্যৎ কী হবে সে বিষয়ে চুক্তিতে কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা দেওয়া হয়নি। যে শ্রমিকদের রক্ত ও ঘামে চট্টগ্রাম বন্দর আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে আজ তাদেরই জীবিকার নিরাপত্তা সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। অবিলম্বে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি বাতিল করা না হলে পরবর্তীতে আরও কঠোর ও ধারাবাহিক কর্মসূচি দেওয়া হবে। 

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   চট্টগ্রাম বন্দর  জেনারেল কার্গো বার্থ  জিসিবি  ধোঁয়াশা  ডিপি ওয়ার্ল্ড  এনসিটি  পরিচালনা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: