সম্পত্তির ভাগ নিয়ে ভাইবোনের বিরোধে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে এক কৃষকের জানাজা ও দাফন প্রায় ১৬ ঘণ্টা আটকে ছিল। ন্যায্য অংশ না পাওয়া পর্যন্ত বাবার দাফনে সম্মতি দেবেন না, এমন অবস্থান নেন মেয়ে হালিমা বেগম। দিনভর কাফনে মোড়ানো মরদেহ বাড়ির উঠানে খাটিয়ায় পড়ে থাকে। পরে স্থানীয়ভাবে সমঝোতা হয়। ভাই ইদ্রিস আলী দেড় লাখ টাকার একটি ব্যাংক চেক দিলে হালিমা দাফনের অনুমতি দেন।
ঘটনাটি সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নের বোয়ালিদহ বকশিগঞ্জ গ্রামের। মারা যাওয়া নাজির উদ্দিন ব্যাপারীর (৭৫) বয়স হয়েছিল। তিনি পেশায় কৃষক ছিলেন। পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, রোববার দিবাগত রাত দুইটার দিকে, অর্থাৎ সোমবার ভোরে, নিজ বাড়িতে তার মৃত্যু হয়।
পরিবারের পক্ষ থেকে সোমবার সকাল ১০টায় বাড়ির আঙিনায় জানাজার সময় ঠিক করে এলাকায় মাইকিং করা হয়েছিল। জানাজা ও দাফনের সব প্রস্তুতি শেষ হলে আপত্তি তোলেন হালিমা বেগম। তার অনড় অবস্থানের কারণে নির্ধারিত সময়ে জানাজা হয়নি। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পেরিয়ে গেলেও কোনো সুরাহা হয়নি।
প্রতিবেশীরা জানান, নাজির উদ্দিনের এক ছেলে ইদ্রিস আলী ও এক মেয়ে হালিমা বেগম। হালিমার অভিযোগ, বাবা দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার সুযোগে ইদ্রিস কৌশলে সব সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নিয়েছেন। ফলে পৈতৃক সম্পত্তিতে আইনি ও শরিয়তসম্মত অধিকার থেকে তিনি পুরোপুরি বঞ্চিত হয়েছেন। বাবার সম্পত্তিতে এই অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দাফনের অনুমতি দেবেন না বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন।
ঘটনায় পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে উত্তেজনা ও ক্ষোভ তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এগিয়ে আসেন। প্রথম দফায় হালিমাকে দেড় লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তিনি তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তার দাবি ছিল, টাকার বিনিময়ে নয়, দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তিতে তার স্থায়ী ও আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
ধাপেরহাট ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউপি সদস্য রুহুল আমিন বলেন, ঘটনাস্থল তার বাড়ির পাশেই। খবর পেয়ে তিনি দুই পক্ষকে নিয়ে বসে সমাধানের চেষ্টা করেন। কিন্তু হালিমার অনড় অবস্থানের কারণে তাৎক্ষণিক সুরাহা হয়নি।
বিকেল পাঁচটার দিকে উভয় পক্ষকে নিয়ে আবার বৈঠক বসে। সেখানে ছিলেন ইউপি সদস্য জিল্লুর রহমান, রুহুল আমিন, ধাপেরহাট পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) রেজাউল করিমসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। বৈঠকে ইদ্রিস আলী বোনকে দেড় লাখ টাকা দিতে রাজি হন। পরে ব্যাংক চেক হাতে পেয়ে হালিমা দাফনের অনুমতি দেন। সিদ্ধান্ত হয়, বাদ মাগরিব জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে মরদেহ দাফন করা হবে।
ইউপি সদস্য জিল্লুর রহমান বলেন, ভাইবোনসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বৈঠক হয়। আলোচনার একপর্যায়ে ইদ্রিস আলী তার বোনকে বাবার সম্পত্তি বাবদ দেড় লাখ টাকা দিতে রাজি হন। পরে একটি ব্যাংক চেক দেওয়া হলে হালিমা দাফনের অনুমতি দেন।
ধাপেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শহিদুল ইসলাম শিপন বলেন, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে বাবার মরদেহ আটকে রাখার মতো ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। খবর পাওয়ার পর থেকেই আমরা স্থানীয়ভাবে আপসের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম।
তিনি জানান, সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগে মরদেহ দাফন করা হবে, তারপর সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এএসআই রেজাউল করিম বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে যাই। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধের সমাধান হয়েছে।’ ধাপেরহাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ ইফতেখার মাহমুদ বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে।
সাদুল্লাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম হাবিবুর রহমান বলেন, স্থানীয়দের মাধ্যমে বিষয়টি জেনে পুলিশ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছিল। সামাজিকভাবে মীমাংসা না হলে অভিযোগ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতো।
সম্পত্তি হস্তান্তরের বিষয়ে ইদ্রিস আলীর বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সম্পত্তি হস্তান্তর বৈধ ছিল কি না, তা তার বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র যাচাইয়ের পর স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় লোকজন।
সময়ের আলো/আতা