মায়ের শাড়ি, মেয়ের স্টাইল

তাসলিমা নীলু

ফিচার

আলমারির পাল্লা খুললেই যেন সময় পিছিয়ে যায় এক নিমেষে। ন্যাপথলিনের সুবাস ভেদ করে ভেসে আসে ভালোবাসার এক পুরোনো সুবাস। কোনো

2026-10-13T13:25:05+00:00
2026-10-13T13:25:05+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬,
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
ফিচার
মায়ের শাড়ি, মেয়ের স্টাইল
তাসলিমা নীলু
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১:২৫ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
আলমারির পাল্লা খুললেই যেন সময় পিছিয়ে যায় এক নিমেষে। ন্যাপথলিনের সুবাস ভেদ করে ভেসে আসে ভালোবাসার এক পুরোনো সুবাস। কোনো তাকে যত্ন করে রাখা ভারী বেনারসি, কোথাও ফিকে হয়ে আসা জামদানি, আবার কোথাও তুলে রাখা মায়ের সেই প্রিয় সিল্কের শাড়ি। বদলানো ট্রেন্ড, সময়ের হিসাব কিংবা শরীরের মাপের কারণে হয়তো সেসব শাড়ি এখন আর পরা হয় না। তবু শাড়িগুলো ফেলা যায় না। কারণ, এগুলো স্রেফ একখণ্ড কাপড় নয়— মায়ের জীবনের মূল্যবান স্মৃতি।

যে শাড়িতে মা একদিন উৎসবের সকালে সেজেছিলেন কিংবা বিশেষ কোনো দিনে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে হেসেছিলেন, সেই শাড়িটিই আজ মেয়ের আলমারির নতুন আকর্ষণ। কখনো আধুনিক ব্লাউজ, কখনো বা স্কার্ট, কুর্তি, জ্যাকেট কিংবা কো-অর্ড সেটে বদলে যাচ্ছে শাড়ির রূপ। এটি যেন মায়ের কাঠের আলমারি থেকে মেয়ের আধুনিক ওয়ার্ডরোবে ভালোবাসার এক নিঃশব্দ পদচারণা।

পুরোনো শাড়িতে নতুন রূপকথা
ফ্যাশনের মূল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে পুরোনোকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার মধ্যে। আর সেই ভাবনা থেকেই এখন রাজত্ব করছে পুরোনো শাড়ির নতুন রূপ। মায়ের শাড়ির জমকালো পাড়টি সুন্দরভাবে বসিয়ে দেওয়া যায় ট্রেন্ডি কোনো ব্লাউজে। মূল শাড়ি থেকে বানিয়ে নেওয়া যায় লং জ্যাকেট বা কুর্তি। আবার সুতি শাড়ির নরম ছোঁয়া নিয়ে তৈরি হতে পারে আরামদায়ক সামার ড্রেস। সিল্ক কিংবা বেনারসি বদলে যেতে পারে পার্টি স্কার্ট, কেপ কিংবা আকর্ষণীয় ব্যাগে।

সবচেয়ে চমৎকার বিষয় হলো— নতুন রূপ দিতে গিয়ে শাড়ির মূল সত্তা হারিয়ে যায় না। ঐতিহ্যবাহী আঁচল কিংবা পাড়ের কিছুটা অংশ থেকে যায়, যা পোশাকটিকে একাধারে আধুনিক ও শিকড়সংলগ্ন করে তোলে।

মায়ের শাড়িতে মেয়ের ব্যক্তিত্ব
মা যে শাড়িটি হয়তো সাদামাটা ব্লাউজ আর গহনা দিয়ে পরতেন, মেয়েটি সেটিই পরতে পারে একেবারে অন্যভাবে। সাদা স্নিকার্স, মিনিমাল জুয়েলারি আর ছোট ব্যাগের সঙ্গে শাড়ির তৈরি টপ। কিংবা মায়ের পুরোনো তাঁতের শাড়ি দিয়ে বানানো কুর্তির সঙ্গে ডেনিম। বেনারসি পাড়ের ব্লাউজের সঙ্গে একরঙা শাড়ি। আবার শাড়ির আঁচল থেকে তৈরি কেপের সঙ্গে ওয়েস্টার্ন পোশাক। একই কাপড়। অথচ সম্পূর্ণ আলাদা স্টাইল। এখানেই প্রজন্মের ফ্যাশন-সংযোগটি সবচেয়ে সুন্দরভাবে ধরা পড়ে। মায়ের কাছে যে শাড়ি ছিল ঐতিহ্যের প্রতীক, মেয়ের কাছে সেটিই হয়ে উঠতে পারে নিজের ব্যক্তিত্ব প্রকাশের মাধ্যম।

শুধু ফ্যাশন নয়, স্মৃতিও
ভাবুন, মেয়েটি কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানে এমন একটি ব্লাউজ পরেছে, যার কাপড়টি এসেছে মায়ের বহু পুরোনো শাড়ি থেকে। অনুষ্ঠানে কেউ হয়তো জানেই না পোশাকটির গল্প। কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েটি জানে— এই কাপড় একদিন তার মায়ের গায়ে ছিল। এই অনুভূতিটিই পোশাকটিকে অন্য সব পোশাক থেকে আলাদা করে দেয়। একটি পোশাক তখন আর শুধু ‘কী পরেছি’— এই প্রশ্নের উত্তর থাকে না। হয়ে ওঠে ‘কার স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে চলেছি’ তারও উত্তর।

মায়ের শাড়ির একটি অংশ হয়তো মেয়ের বিয়ের পোশাকে থাকতে পারে। কোনো শাড়ির পাড় দিয়ে তৈরি হতে পারে তার বিশেষ দিনের ব্যাগ। আবার মায়ের প্রিয় শাড়ি থেকে তৈরি একটি ছোট স্কার্ফও হয়ে উঠতে পারে মেয়ের কাছে মূল্যবান স্মারক। ফ্যাশন তখন ব্যক্তিগত ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।

আলমারি থেকে টেকসই ফ্যাশনে
পুরোনো শাড়িকে নতুন পোশাকে ব্যবহার করার আরেকটি বড় দিক হলো— এটি টেকসই ফ্যাশনের সঙ্গে সুন্দরভাবে মিলে যায়। ফ্যাশন দুনিয়ায় পোশাকের দ্রুত পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত ভোগের বিপরীতে এখন পুরোনো পোশাক পুনর্ব্যবহার, পুনর্নির্মাণ ও দীর্ঘদিন ব্যবহার করার প্রবণতা গুরুত্ব পাচ্ছে। আমাদের ঘরের পুরোনো শাড়িগুলো সেই ধারণাকে অনেকটাই সহজ করে দিতে পারে। যে শাড়িটি হয়তো বছরের পর বছর আলমারিতে পড়ে থাকবে, সেটিকে নতুন পোশাকে রূপ দিলে তার ব্যবহার আরও কয়েক বছর বাড়তে পারে। অর্থাৎ পুরোনোকে বিদায় না দিয়ে তাকে নতুন জীবন দেওয়া। আর এই পুনর্ব্যবহারে যদি জড়িয়ে থাকে মায়ের স্মৃতি, তা হলে তার মূল্য তো আরও বেশি।

‘মায়ের মতো’ নয়, ‘মায়ের কাছ থেকে’
প্রজন্মের পার্থক্য কখনো পোশাকেই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। মায়ের সময়ের ফ্যাশন হয়তো মেয়ের কাছে পুরোনো মনে হতে পারে। আবার মেয়ের পোশাক দেখে মায়ের মনে হতে পারে— ‘এটা আবার কেমন স্টাইল!’

কিন্তু একটি পুরোনো শাড়ি যখন দুজনের মাঝখানে আসে, তখন সেই দূরত্বটা যেন একটু কমে যায়। মেয়ে মায়ের পোশাক হুবহু অনুকরণ করছে না। সে নিজের মতো করে পরছে। নিজের সময়, নিজের রুচি আর নিজের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিশিয়ে নিচ্ছে মায়ের স্মৃতিকে। এটাই সম্ভবত সবচেয়ে সুন্দর উত্তরাধিকার— মায়ের মতো হয়ে ওঠা নয়, মায়ের কাছ থেকে কিছু নিয়ে নিজের মতো হয়ে ওঠা।

একটি শাড়ির দীর্ঘ যাত্রা
একটি শাড়ির জীবন হয়তো শুরু হয়েছিল মায়ের জন্য কেনা দিয়ে। কোনো বিশেষ দিন থেকে সেটি পেয়েছিল স্মৃতি। বছরের পর বছর আলমারিতে থেকে একসময় সেটি হয়ে উঠেছিল ‘পুরোনো’। কিন্তু গল্প সেখানেই শেষ নয়।

একদিন মেয়ের হাতে সেটি নতুন করে কাটা হলো। তৈরি হলো একটি ব্লাউজ। অথবা একটি কুর্তি। কিংবা একটি ব্যাগ। মা যখন মেয়েকে সেই পোশাকে দেখলেন, হয়তো এক মুহূর্তের জন্য নিজের তরুণ বয়সটাকেই দেখতে পেলেন। সেই মুহূর্তে ফ্যাশন আর শুধু ফ্যাশন থাকে না। এটি হয়ে ওঠে সময়ের সেতু। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে চলে যাওয়া ভালোবাসার দৃশ্যমান রূপ।

কোন শাড়ি কীভাবে ব্যবহার করবেন?
সব শাড়ি দিয়ে একই ধরনের পোশাক তৈরি করা সম্ভব নয়। কাপড়ের ধরন, পাড়ের নকশা এবং শাড়ির অবস্থার ওপর নির্ভর করে ডিজাইন নির্বাচন করাই ভালো।

জামদানি বা তাঁত : কুর্তি, টপ, কেপ কিংবা আধুনিক কাটের ব্লাউজে দারুণ মানাবে।

বেনারসি : পার্টি ওয়্যার ব্লাউজ, জ্যাকেট, স্কার্ট, কেপ বা ক্লাচে ব্যবহার করা যেতে পারে।

সিল্ক : এ ধরনের শাড়ি দিয়ে তৈরি হতে পারে এলিগ্যান্ট কুর্তি, জ্যাকেট কিংবা ড্রেস।

সুতি শাড়ি : গরমের জন্য আরামদায়ক টপ, কুর্তি, স্কার্ট বা ঘরোয়া পোশাকে ব্যবহার করা যায়। আর যদি পুরো শাড়িটি কাটতে মন না চায়, তা হলে শুধু আঁচল বা পাড় ব্যবহার করেও তৈরি করা যায় ছোট কোনো ফ্যাশন অ্যাকসেসরিজ।

ফ্যাশন বদলায়। ট্রেন্ড আসে, ট্রেন্ড চলে যায়। রং, কাট, ডিজাইন সবই সময়ের সঙ্গে পাল্টে যায়। কিন্তু কিছু পোশাক সময়ের কাছে হার মানে না। মায়ের শাড়ি তেমনই একটি জিনিস। আজকের মেয়ের কাছে সেটি হয়তো নতুন ডিজাইনের উপকরণ। কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে আছে মায়ের গল্প, পরিবারের গল্প, একটি সময়ের গল্প। তাই পুরোনো শাড়ি যখন নতুন পোশাকে ফিরে আসে, তখন আসলে পুরোনো কিছুই ফিরে আসে না। ফিরে আসে স্মৃতি, নতুন রঙে, নতুন কাটে, নতুন প্রজন্মের স্টাইলে। মায়ের শাড়ি পুরোনো হতে পারে, কিন্তু তার গল্প কখনো পুরোনো হয় না।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও
  বিষয়:   মায়ের শাড়ি  মেয়ের স্টাইল 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: