চোখ ভিজে উঠেছে জলে, গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে আনন্দের অশ্রু। দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে যে স্কুলের আঙিনায় হাজারো শিশুকে তিনি বর্ণমালা শিখিয়েছেন, সেই চিরচেনা প্রাঙ্গণ ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তটি একদিকে যেমন বেদনার ছিল, অন্যদিকে তেমনই ছিল রাজকীয় সম্মানের।
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার খয়খাটপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জয়নাল আবেদীন তার বর্ণিল কর্মজীবনের সমাপ্তি টেনেছেন এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) অবসরে যাওয়ার এই বিশেষ দিনে এই গুণী শিক্ষককে একটি সুসজ্জিত প্রাইভেটকারে বসিয়ে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে তার বাড়িতে পৌঁছে দেন সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী।
শিক্ষকতার পেশায় জয়নাল আবেদীনের পথচলা শুরু হয়েছিল ত্যাগের এক অনন্য মহিমায়। ১৯৮৯ সালে নিজের জমানো জমি দান করে তিনি নিজ এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘চান্দামারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। এরপর ১৯৯০ সালের ১ জানুয়ারি তিনি সেখানেই শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ওই প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দীর্ঘ ২৯ বছর দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে ২০১৯ সালে তিনি খয়খাটপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং সেখান থেকেই আজ তার ৩৭ বছরের বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা জীবনের ইতি ঘটল।
ওই দিন সকালে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির উদ্যোগে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক বর্ণাঢ্য বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। প্রিয় স্যারকে বিদায় জানাতে বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের উপচেপড়া ভিড়ে অনুষ্ঠানটি এক আবেগঘন মিলনমেলায় পরিণত হয়। এ সময় জয়নাল আবেদীনকে ফুলের শুভেচ্ছা, মানপত্র, সম্মাননা স্মারকসহ বিভিন্ন উপহারে ভূষিত করা হয়।
বিদায়ি বক্তব্য দেওয়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন জয়নাল আবেদীন। তিনি বলেন, এই স্কুলটিই ছিল আমার পুরো পৃথিবী। শিশুদের কচি মুখগুলোর মাঝেই আমি খুঁজে পেয়েছিলাম আমার জীবনকে। আজ শারীরিকভাবে চলে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আমার মনটা এই প্রাঙ্গণেই পড়ে রইল। আমি কথা দিচ্ছি, সপ্তাহে অন্তত একটি দিন হলেও আমি এই প্রাঙ্গণে ফিরে আসব।
অনুষ্ঠান শেষে এই প্রবীণ শিক্ষককে ফুলে সজ্জিত একটি প্রাইভেটকারে বসিয়ে তার নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। বাড়ি ফেরার পথে রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে শত শত গ্রামবাসী ও খুদে শিক্ষার্থীরা হাত নেড়ে এবং ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে তাদের প্রিয় অভিভাবককে শেষ বিদায় ও শ্রদ্ধা জানান।
ব্যক্তিগত জীবনে দুই সন্তানের জনক জয়নাল আবেদীনের বড় ছেলে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন আইনজীবী এবং ছোট ছেলে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।
তেঁতুলিয়ার এই প্রান্তিক জনপদে একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতি মানুষের এমন খাঁটি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের এই ঘটনাটি দীর্ঘদিন এলাকার মানুষের হৃদয়ে এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে বেঁচে থাকবে।
সময়ের আলো/আতা