যুক্তরাজ্যের একটি সামরিক বিমানঘাঁটির কাছে কথিত হামলার ষড়যন্ত্রে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জড়িত বলে ব্রিটিশ সরকারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অভিযোগকে ‘মিথ্যা পতাকা অভিযান’ হিসেবে অভিহিত করেছে। দেশটির দাবি, পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে বৃহত্তর প্রচারণার অংশ হিসেবে এ ধরনের অভিযোগ সামনে আনছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম পার্লামেন্টে বলেন, গত মাসে ইংল্যান্ডের ফেয়ারফোর্ড শহরে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (আরএএফ) বিমানঘাঁটিকে ঘিরে সন্দেহজনক ষড়যন্ত্রটি ‘সম্ভবত ইরানে সমন্বিত হয়েছিল’ এবং ‘প্রায় নিশ্চিতভাবেই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের নির্দেশনায় পরিচালিত হয়েছিল’।
তিনি ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে বর্ণিত অপরাধী নেটওয়ার্ক এবং সেগুলোর অর্থায়নের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন।
এ ঘটনার পর যুক্তরাজ্য দক্ষিণ ইংল্যান্ডের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিতে কথিত ‘শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগে দুই ইরানি নাগরিকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমান অবস্থান করা ওই ঘাঁটির কাছে বিস্ফোরকসংক্রান্ত অপরাধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির সন্দেহে বিশের কোঠায় বয়সী পাঁচ ব্রিটিশ নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন না করেই পুলিশি জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। এ ছাড়া আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তবে ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটিকে ঘিরে কথিত নিরাপত্তা হুমকি এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর প্রকৃত বিবরণ এখনো স্পষ্ট নয়।
অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই
সোমবার রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্রিটিশ অভিযোগকে ‘কুৎসিত ষড়যন্ত্র’ বলে উল্লেখ করে। তেহরানের দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণের দায় এড়াতেও এ ধরনের অভিযোগ ব্যবহার করা হতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাজ্য। তেহরান এই অভিযোগকে ‘অদক্ষ মিথ্যা পতাকা অভিযান’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অন্য দেশগুলোর বিরুদ্ধে নিরাপত্তাসংক্রান্ত অভিযোগ তৈরির ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের অতীত কর্মকাণ্ড সুপরিচিত। ইরানের দাবি, এ ধরনের অভিযোগ পশ্চিম এশিয়ায় অতীতে উত্তেজনা ও সংঘাত বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
তবে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেছেন, তদন্তকারীরা কথিত ষড়যন্ত্রের সমন্বয়কারী হিসেবে ইরানে অবস্থানরত একজন পরিচিত ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছেন। কিন্তু তিনি ওই ব্যক্তির পরিচয় কিংবা অভিযোগের সমর্থনে থাকা যোগাযোগের তথ্য, আর্থিক নথি বা গোয়েন্দা তথ্য প্রকাশ করেননি।
ইরান যুদ্ধে ব্যবহৃত মার্কিন বিমানঘাঁটি
আরএএফ ফেয়ারফোর্ড যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানকে ঘিরে যে যুদ্ধ শুরু হয়, সেই সংঘাতে অংশ নেওয়া মার্কিন সামরিক বিমানও এই ঘাঁটিতে অবস্থান করেছে।
ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ দেশটির বেশ কয়েকজন নেতা ও কর্মকর্তা নিহত হন।
ফেয়ারফোর্ডের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর যুক্তরাষ্ট্র ঘাঁটিটি থেকে প্রায় এক ডজন বি-১ বোমারু বিমান সরিয়ে নেয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাতে জানায়, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী ছোট ড্রোন হামলায় এসব বোমারু বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও অক্টোবরের শুরুতে প্রকাশ্যে দাবি করেন, তার সরকার ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিকে ঘিরে সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রের বিষয়ে যুক্তরাজ্যকে সতর্ক করেছিল।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, তারা ব্রিটিশদের সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছিলেন এবং হামলাটি ইরানের পৃষ্ঠপোষকতায় হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তার দাবি, এর পরদিনই যুক্তরাজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিরোধিতা করে যুক্তরাজ্যের নেওয়া পদক্ষেপের সমালোচনা করতে গিয়ে নেতানিয়াহু এসব মন্তব্য করেন।
অন্যান্য ঘটনাকেও ষড়যন্ত্রের অংশ বলছে তেহরান
চলতি মাসের শুরুতে ইরান ফেয়ারফোর্ডের ঘটনাটিকে ফ্লাইদুবাইয়ের ককপিটে হামলার অভিযোগের সঙ্গে একই প্রসঙ্গে উল্লেখ করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল, ওই ঘটনায় একটি বিমানকে ইসরায়েলের তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত করার উদ্দেশ্যে ‘আত্মঘাতী’ অভিযান চালানোর চেষ্টা হয়েছিল।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ওই বিমানসংক্রান্ত ঘটনাকে অত্যন্ত অপেশাদারভাবে সাজানো হয়েছে বলে মন্তব্য করেন। তাঁর যুক্তি, এ ধরনের ঘটনা তৈরি করে ইরানের ওপর দায় চাপানো এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে জনসমর্থন হারাতে থাকা যুদ্ধকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম ইরনা গত সপ্তাহে এক বিশ্লেষণে দাবি করে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) গভর্নর বোর্ডে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানোর পক্ষে পশ্চিমা দেশগুলোর ভোটও তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টির বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।
সংবাদমাধ্যমটির দাবি, ইয়েমেনে হুথিদের সামরিক অগ্রগতির পেছনে ইরানের ভূমিকা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে, সেগুলোও আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তাহীনতার প্রধান কারণ হিসেবে ইরানকে তুলে ধরার প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়।
ইরনার ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সন্দেহজনক ঘটনাগুলোর জন্য প্রমাণ ছাড়াই ইরানকে দায়ী করা হচ্ছে এবং এগুলো দেশটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার একটি সমন্বিত প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে।
নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত
ইরানের অস্বীকৃতি সত্ত্বেও ফেয়ারফোর্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তেহরানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাজ্য।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছেন। পাশাপাশি আইআরজিসির কাউন্টার-এস্পিওনাজ বিভাগের প্রধান হিসেবে চিহ্নিত একজন ব্যক্তি এবং একটি অপরাধী নেটওয়ার্কের কার্যক্রমে সহায়তাকারী হিসেবে বর্ণিত আরেকজনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার মধ্যে সম্পদ জব্দ এবং ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে ওই দুই ব্যক্তিকে ফেয়ারফোর্ডের কথিত ষড়যন্ত্রের সরাসরি সংগঠক হিসেবে স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা হয়নি।
জুলাই মাসে যুক্তরাজ্য আইআরজিসিকে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।
এ ছাড়া গত শুক্রবার যুক্তরাজ্যসহ ৩২টি দেশ ইরানের বিরুদ্ধে সহিংস হামলা, প্রাণঘাতী ষড়যন্ত্র, অগ্নিসংযোগ, নাশকতা, সাইবার হামলা এবং অন্যান্য গোপন তৎপরতার নিন্দা জানায়। ওই যৌথ বিবৃতিতে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রও ছিল।
বিবৃতিতে বলা হয়, ২৭ সেপ্টেম্বর আরএএফ ফেয়ারফোর্ডের ঘটনায় ইরানের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে যুক্তরাজ্যের মূল্যায়নকে তারা স্বীকৃতি দিচ্ছে। দেশগুলোর মতে, ঘটনাটি দেশের সীমানার বাইরে গোপন নেটওয়ার্ক ও সহযোগীদের মাধ্যমে শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় আইআরজিসির আগ্রহের বিষয়টিও তুলে ধরে।
তবে ইরান অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য ও তার মিত্ররা এসব অভিযোগের ভিত্তিতে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ চালিয়ে যাচ্ছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ