জয়ের জন্য শেষ দিনে প্রয়োজন ছিল মাত্র ৭ উইকেট। প্রতিপক্ষের সামনে পাহাড়সম ৩৪৭ রানের লক্ষ্য। পরিস্থিতি বিবেচনায় আবুধাবি টেস্টে বাংলাদেশের জয় তখন সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে হচ্ছিল। একের পর এক উইকেট তুলে নিয়ে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবের দিকে এগিয়েও নিচ্ছিলেন বাংলাদেশের বোলাররা।
কিন্তু প্রতিটি উইকেট পতনের পরই জুটি গড়ে লড়াইয়ে ফিরেছে আফগানিস্তান। সেদিকউল্লাহ আতালের দীর্ঘ প্রতিরোধ ভাঙার পরও শেষ পর্যন্ত জয় নিশ্চিত করতে পারেনি নাজমুল হোসেন শান্তর দল। একের পর এক সুযোগ হাতছাড়া আর আফগান ব্যাটারদের অবিশ্বাস্য দৃঢ়তায় জয়ের দুয়ারে দাঁড়িয়েও হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে বাংলাদেশকে। ইয়ামিন আহমাদজাই ও কায়েস আহমেদের প্রতিরোধে শেষ পর্যন্ত ড্র হয়েছে আবুধাবি টেস্ট।
তৃতীয় দিনের শেষ বিকালে ২৮ রানে ২ উইকেট হারানো আফগানিস্তান চতুর্থ দিন শেষে দ্বিতীয় ইনিংসে ৩ উইকেটে ১৩২ রান তুলেছিল। জয়ের জন্য শেষ দিনে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ৭ উইকেট, আর আফগানদের করতে হতো আরও ৩৪৭ রান। এত বড় লক্ষ্য তাড়া করা কঠিন বুঝেই শুরু থেকে ম্যাচ বাঁচানোর দিকে মনোযোগ দেয় সফরকারীরা।
পঞ্চম দিনের সকালে আগের দিনের দুই অপরাজিত ব্যাটার সেদিকউল্লাহ আতাল ও হাশমতউল্লাহ শহিদি দেখেশুনে খেলতে থাকেন। একাধিকবার বোলিং পরিবর্তন করেও সাফল্য পাচ্ছিলেন না অধিনায়ক শান্ত। বিশেষ করে বাংলাদেশের স্পিনাররা প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হন। শেষ দিনে উইকেটে বেশ কিছু ফাটল দেখা গেলেও সেগুলো থেকে বড় ধরনের সুবিধা আদায় করতে পারেননি তাইজুল ইসলাম, মেহেদী হাসান মিরাজ ও নাঈম হাসান। আবুধাবির উইকেটে স্পিনারদের জন্য খুব বেশি সহায়তা না থাকায় তাদের বোলিংয়ে সেই ধারও দেখা যায়নি, যা ম্যাচ দ্রুত শেষ করে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল।
তবে টেস্টের শেষ দিনে শুধু উইকেটের চরিত্রই নয়, প্রচ- গরমও দুই দলের ক্রিকেটারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। টানা ব্যাটিংয়ের ধকল সামলাতে না পেরে প্রথম সেশনেই স্ক্র্যাম্পের কারণে মাঠ ছাড়তে হয় শহিদিকে। ৩৩ বলে ২০ রান করে ফিরে যান তিনি। তাতে বাংলাদেশের সামনে আবারও সুযোগ তৈরি হয়, কিন্তু সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি দল।
লাঞ্চের কিছুক্ষণ আগে অবশেষে উইকেটের দেখা পায় বাংলাদেশ। ৭৮তম ওভারের প্রথম বলে লেগ স্টাম্পের বাইরে খাটো লেংথে বল করেন এবাদত হোসেন। পুল করতে গিয়ে ব্যাটের বাইরের কানায় বল লাগান ইকরাম আলিখিল। উইকেটের পেছনে ডানদিকে ঝাঁপিয়ে দুর্দান্ত ক্যাচ নেন লিটন দাস।
৬৯ বলে ৩৩ রান করে সাজঘরে ফেরেন ইকরাম। এই উইকেটে বাংলাদেশের প্রত্যাশা ছিল, এবার হয়তো দ্রুত ভেঙে পড়বে আফগানিস্তানের প্রতিরোধ।
কিন্তু আফগানরা সহজে হাল ছাড়েনি। পঞ্চম উইকেটে আতাল ও ইসমত আলম মিলে গড়ে তোলেন ৪০ রানের জুটি। সেই জুটি ভাঙেন মেহেদী হাসান মিরাজ। তার বলে অধিনায়ক শান্তর হাতে ক্যাচ তুলে দিয়ে ফেরেন ইসমত। ৬০ বল খেলে মাত্র ৪ রান করেন তিনি। এরপর আবার ব্যাট করতে নামেন প্রথম সেশনে রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে মাঠ ছাড়া শহিদি।
এবারও উইকেট এনে দেন মিরাজ। তার বলে হাসান মাহমুদের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরার আগে শহিদি করেন ৬৯ বলে ৩৬ রান।
আফগানিস্তানের উইকেট পড়ছিল ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির জায়গা ছিল না। কারণ প্রতিবারই নতুন জুটি গড়ে ম্যাচ বাঁচানোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন আতাল। এক প্রান্ত আগলে রেখে অসাধারণ ধৈর্যের পরিচয় দেন এই ওপেনার। বাংলাদেশের বোলারদের দীর্ঘ সময় সামলে ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি তুলে নেন তিনি। ৩৩২ বলের ইনিংসে ১১১ রান করেন আতাল। তার ইনিংসে ছিল ৯টি চার ও ৩টি ছক্কা।
আতালের উইকেট পাওয়ার পর বাংলাদেশের জয়ের আশা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিতে পারেনি শান্তর দল। শেষ দিকে ইয়ামিন আহমাদজাই ও কায়েস আহমেদ ব্যাট হাতে দৃঢ়তা দেখিয়ে বাংলাদেশের বোলারদের হতাশ করেন।
তাদের প্রতিরোধে আফগানিস্তান ম্যাচ বাঁচাতে সক্ষম হয়। যে ম্যাচে শেষ দিনে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল মাত্র ৭ উইকেট, সেই ম্যাচই শেষ পর্যন্ত ড্রয়ে শেষ হওয়া বাংলাদেশের জন্য বড় হতাশার।
বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ৩টি করে উইকেট নেন এবাদত হোসেন ও মেহেদী হাসান মিরাজ। হাসান মাহমুদ ও নাঈম হাসান পান একটি করে উইকেট। উইকেট এসেছে, প্রতিপক্ষের ওপর চাপও তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেই চাপকে জয়ে রূপ দিতে পারেনি বাংলাদেশ।
এই ড্রয়ের হতাশা তাই শুধু জয়ের সুযোগ হাতছাড়া করার নয়, বরং ম্যাচের শেষ দিনে তৈরি হওয়া সুবিধা ধরে রাখতে না পারারও। আফগানিস্তানকে দ্রুত অলআউট করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেও শেষ পর্যন্ত তাদের প্রতিরোধ ভাঙতে পারেনি বাংলাদেশ। আতালের দীর্ঘ ইনিংস, শেষ দিকে ইয়ামিন ও কায়েসের দৃঢ়তা এবং বাংলাদেশের সুযোগ কাজে লাগাতে না পারার ব্যর্থতা মিলিয়েই আবুধাবি টেস্টে জয় অধরাই থেকে গেল।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে