আত্মহত্যা শুধু একটি জীবনের অবসান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবার ও সমাজের দীর্ঘস্থায়ী বেদনা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিষয়টি আশঙ্কাজনক উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। পুলিশ সদর দফতরের প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে ৭৬,৩৬১ জন আত্মহত্যা করেছেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আরও ১৩,৪৯১ জনের আত্মহত্যার তথ্য পাওয়া গেছে।
এই পরিসংখ্যান থেকেই পরিষ্কার বোঝা যায় যে, দেশে আত্মহত্যা একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে, ধারাবাহিকভাবে যা প্রায় মহামারির আকার ধারণ করছে। সামান্য তুচ্ছ কারণে কিংবা সামান্য ক্ষতেই এখন মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। বর্তমানে পাবলিক পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পাওয়া, পারিবারিক কলহের জের ধরে স্বামী বা স্ত্রীর আত্মহনন কিংবা ব্যবসায় লোকসান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যাই এখন নিত্যদিনের ঘটনা। অথচ একজন মুসলিম হিসেবে তো নয়ই, অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীরও উচিত নয় আত্মহত্যার মতো জঘন্য পথ বেছে নেওয়া।
ইসলাম মানুষের জীবনকে মহান আল্লাহর দেওয়া পবিত্র আমানত হিসেবে দেখে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের হত্যা করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু’ (সুরা নিসা : ২৯)। অর্থাৎ আমাদের জীবন আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান আমানত, এর খেয়ানত করার কোনো অধিকার আমাদের নেই। এই আমানতের খেয়ানত করলে আমরা কঠিন গুনাহগার হিসেবে বিবেচিত হব। এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) আত্মহত্যার ব্যাপারে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এক ব্যক্তি তীরের ফলার মাধ্যমে নিজেকে হত্যা করেছিল। তাকে নবী (সা.)-এর কাছে আনা হলে তিনি তার জানাজা পড়েননি।’ (সহিহ মুসলিম : ৯৭৮)
আত্মহত্যার পেছনে নানা ব্যক্তিগত, সামাজিক ও মানসিক কারণ থাকে। এর মধ্যে মানসিক হতাশা, মাত্রাতিরিক্ত বা অপূর্ণ প্রত্যাশা অন্যতম। এসব কঠিন পরিস্থিতিতে ইসলাম মানুষকে আত্মবিনাশের দিকে নয়, বরং ধৈর্য ও আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না’ (সুরা আয-যুমার : ৫৩)। তিনি আরও বলেন, ‘যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট’ (সুরা তালাক : ৩)। অতএব, বিপদের সময় হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা ও ধৈর্য ধরা আবশ্যক। প্রতিটি বিপদই আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা মাত্র আর এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াই প্রকৃত মুমিনের পরিচয়।
আত্মহত্যার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধে আমাদের সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও পারিবারিক দায়িত্ব রয়েছে। মানসিকভাবে সংকটে থাকা মানুষের কথা আমাদের মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে, তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করে এবং সংকটাপন্ন মানুষের জন্য জরুরি সহায়তা সেল চালু করে এই ব্যাধি মোকাবিলায় বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। মনে রাখতে হবে, জীবন যত কঠিনই হোক না কেন, আত্মহত্যা কখনোই কোনো সমাধান হতে পারে না। একটি সাময়িক কঠিন মুহূর্ত পুরো জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত হতে পারে না। তাই যেকোনো সংকটে থামুন, কথা বলুন, সাহায্য নিন এবং আল্লাহর রহমতের ওপর পূর্ণ ভরসা রাখুন। জীবন আল্লাহর পরম আমানত; তাই জীবনকে বিনাশ নয়, রক্ষাই হোক আমাদের মূল অঙ্গীকার।
শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সময়ের আলো/মহু