সব মসজিদে অভিন্ন খুতবার প্রস্তাব, কাশ্মিরে সরকারি হস্তক্ষেপ নিয়ে ক্ষোভ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মিরের ওয়াকফ বোর্ড অঞ্চলটির সব মসজিদে শুক্রবারের জুমার নামাজে একই খুতবা পাঠের প্রস্তাব দেওয়ায়

2026-10-15T21:35:01+00:00
2026-10-15T21:35:01+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬,
৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
সব মসজিদে অভিন্ন খুতবার প্রস্তাব, কাশ্মিরে সরকারি হস্তক্ষেপ নিয়ে ক্ষোভ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:৩৫ পিএম 
কাশ্মিরে সব মসজিদে অভিন্ন খুতবার প্রস্তাব। সংগৃহীত ছবি
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মিরের ওয়াকফ বোর্ড অঞ্চলটির সব মসজিদে শুক্রবারের জুমার নামাজে একই খুতবা পাঠের প্রস্তাব দেওয়ায় ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এ উদ্যোগের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কাশ্মিরের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতারা। তাদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে মুসলিমদের ধর্মীয় কার্যক্রমের ওপর কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে। 

জম্মু ও কাশ্মির ওয়াকফ বোর্ডের প্রধান দরখশান আন্দ্রাবি ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) স্থানীয় নেত্রী। ২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদি সরকার অঞ্চলটির বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা বাতিল করে জম্মু ও কাশ্মিরকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করে। মুসলিমদের ওয়াকফ সম্পত্তি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বোর্ডটি গত সপ্তাহে সব মসজিদে অভিন্ন খুতবা চালুর প্রস্তাব দেওয়ার পর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মহলে প্রতিবাদ শুরু হয়।

কাশ্মিরের শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় পণ্ডিতেরা এ প্রস্তাবকে কাশ্মিরি মুসলিমদের ধর্মীয় বিষয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীন হস্তক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন।

মাদকের বিস্তার ঠেকাতে উদ্যোগ, দাবি ওয়াকফ বোর্ডপ্রধানের

সমালোচনার মুখে প্রস্তাবটির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে দরখশান আন্দ্রাবি একটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, মাদকাসক্তির বিস্তার ও সমাজের বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় এ উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জুমার খুতবা অনুমোদনের দায়িত্বে থাকা ওয়াকফ বোর্ডের কমিটিতে শুধু ধর্মীয় পণ্ডিতেরা থাকবেন, কোনো সরকারি কর্মকর্তা সেখানে যুক্ত থাকবেন না।

তবে এ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন কাশ্মিরের আলেমরা। গত রোববার ওয়াকফ বোর্ড প্রায় দেড় হাজার আলেমকে নিয়ে একটি বৈঠক আহ্বান করে। রাজৌরি জেলা থেকে ভার্চুয়ালি ওই বৈঠকে অংশ নেওয়া এক আলেম জানান, দরখশান আন্দ্রাবি নির্দেশ দিয়েছেন, জুমার নামাজে মিম্বর থেকে কেবল অনুমোদিত একটি খুতবাই পাঠ করা যাবে। কিন্তু সেই খুতবা অনুমোদনকারী কমিটিতে কারা থাকবেন, তা পরিষ্কার করা হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই আলেম বলেন, তারা আপত্তি জানিয়ে বলেছিলেন, নির্দেশনাটি ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থি হলে তা মেনে নেওয়া হবে না। কিন্তু তাঁদের উদ্বেগকে গুরুত্ব না দিয়ে কথা বলার সুযোগও দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, চার বছরের আলোচনার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ওয়াকফ বোর্ডের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন

এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন কাশ্মিরের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নাঈম আখতার। তাঁর মতে, মধ্যযুগে সুলতান বা খলিফার নামে কেন্দ্রীয় খুতবা প্রচলিত ছিল এবং সে সময়ের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এর বিশেষ তাৎপর্য ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে কাশ্মির একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের অংশ।

নাঈম আখতার প্রশ্ন তোলেন, ওয়াকফ বোর্ডের দায়িত্ব মূলত প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা। আলেমদের ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া বা তাঁদের খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা বোর্ডের কাজ নয়। তিনি আরও প্রশ্ন করেন, ভারতের কোনো মুসলিম রাজনৈতিক দল কি হিন্দু পুরোহিত বা খ্রিষ্টান যাজকদের ধর্মীয় আচার পালনের নিয়ম নির্ধারণ করে দিতে পারে?

কাশ্মিরের শীর্ষ ধর্মীয় নেতা মীরওয়াইজ উমর ফারুকও এ উদ্যোগকে সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন আলেমদের যৌথ প্ল্যাটফর্ম ‘মুত্তাহিদা মজলিস-ই-উলেমা’ জানিয়েছে, জুমার খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণের দায়িত্ব ইসলামি পণ্ডিতদের, কোনো প্রশাসনিক বোর্ডের নয়।

এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন জম্মু ও কাশ্মিরের নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী এবং ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতা ওমর আবদুল্লাহও।


সমালোচনার মুখে অবস্থান পরিবর্তন

বিভিন্ন মহল থেকে ব্যাপক সমালোচনা আসার পর ওয়াকফ বোর্ডের প্রধান দরখশান আন্দ্রাবি তাঁর আগের অবস্থান থেকে সরে আসেন। তিনি জানান, আত্মহত্যা, মানসিক চাপ ও মাদকাসক্তির মতো সামাজিক সমস্যা নিয়ে খুতবায় আলোচনা করার বিষয়টি স্বাধীন আলেম ও খতিবদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের অধীনে স্থানীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এমন উদ্যোগ আগেও দেখা গেছে।

২০২২ সালে দরগা ও মাজারে স্বেচ্ছায় দেওয়া নজর-নিয়াজের অর্থ সংগ্রহের দীর্ঘদিনের প্রথা বন্ধ করে ওয়াকফ বোর্ড নিজস্ব দানবাক্স স্থাপন করেছিল। চলতি বছরের জানুয়ারিতেও পুলিশকে দিয়ে কাশ্মিরের মসজিদগুলোর ইমাম ও খতিবদের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহের জন্য ফরম বিতরণ করা হয়।

কাশ্মিরের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ নূর আহমেদ বাবা বলেন, বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান এবং মুসলিমদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, চার দশক ধরে কাশ্মিরের সংঘাত নিয়ে কাজ করা শ্রীনগরের এক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যে কাশ্মিরে সম্ভাব্য প্রতিবাদ আগেভাগে নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেও মসজিদগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

সব মিলিয়ে, জুমার খুতবা অভিন্ন করার প্রস্তাব কাশ্মিরে ধর্মীয় স্বাধীনতা, ওয়াকফ বোর্ডের ক্ষমতার সীমা এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।



সময়ের আলো/ইউএমএইচ


  বিষয়:   মসজিদ  খুতবা  প্রস্তাব  কাশ্মির  সরকারি  হস্তক্ষেপ  ক্ষোভ 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: