গোলাভরা ধান তবু খালি হাত

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

সকালের আলো ফোটার আগেই ব্রহ্মপুত্রের চরে নেমে পড়েন স্থানীয় কৃষকরা। বালুর বুক চিরে জেগে ওঠা সবুজ ভুট্টাক্ষেত, মরিচের সারি আর

2026-10-16T00:17:53+00:00
2026-10-16T00:17:53+00:00
 
  শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬,
৩১ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
আজ বিশ্ব খাদ্য দিবস
গোলাভরা ধান তবু খালি হাত
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:১৭ এএম 
ব্রহ্মপুত্রের চরে বালুর বুক চিরে জেগে ওঠা সবুজ ফসলের মাঠ কৃষকদের ঘামেরই সাক্ষ্য দেয়। ছবি : সময়ের আলো
সকালের আলো ফোটার আগেই ব্রহ্মপুত্রের চরে নেমে পড়েন স্থানীয় কৃষকরা। বালুর বুক চিরে জেগে ওঠা সবুজ ভুট্টাক্ষেত, মরিচের সারি আর সোনালি ধানের মাঠ যেন তাদের ঘামেরই সাক্ষ্য। গাইবান্ধা কাগজে-কলমে খাদ্যে স্বয়ম্ভর, উদ্বৃত্তও বটে। অথচ যারা দেশের মানুষের পাতে ভাত তুলে দেন, দিনশেষে তাদের নিজেদের থালায় কী জোটে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। আজ ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবসে ক্ষুধামুক্ত সমাজের অঙ্গীকার যখন উচ্চারিত হচ্ছে, তখন জেলার চাষিরা নীরবে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, খাদ্য নিরাপত্তা মানে শুধু গুদাম ভরা শস্য নয়, প্রতিটি মানুষের পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য কেনার সামর্থ্যই আসল পরীক্ষা।

গোলাভরা ধান তবু খালি হাত : কৃষি বিভাগের হিসাবে এ মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ২৯ হাজার ২০ হেক্টরে বোরো আবাদ হয়েছে, উৎপাদন ৮ লাখ ৯২ হাজার ১৭৩ মেট্রিক টন। নিজেদের চাহিদা মিটিয়েও গড়ে প্রায় ৯৭ হাজার ৯২৩ মেট্রিক টন ধান উদ্বৃত্ত থাকে। কিন্তু এই প্রাচুর্যের মাঝেই চাষির ঘরে উৎসবের বদলে দুশ্চিন্তা। সরকার প্রতি মণ বোরো ধানের দাম ১ হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারণ করলেও খোলাবাজারে মোটা ধান বিকোচ্ছে ৮৫০ টাকায়, চিকন ৯৫০ টাকায়। অর্থাৎ মণে ৪৯০ থেকে ৫৯০ টাকা কম। উৎপাদন খরচই তুলতে পারছেন না অনেকে। সরকারি সংগ্রহেও প্রশ্ন রয়ে গেছে। এবার প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ৫৬৩ মেট্রিক টন। খাদ্য বিভাগ ১৪ হাজার ৩৯৬ মেট্রিক টন কিনে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ ক্রয় বন্ধ করে দেয়। অথচ জেলার ১১টি খাদ্য গুদামের ধারণক্ষমতা ৪৩ হাজার মেট্রিক টন, তখন মজুদ ছিল ৩৯ হাজার মেট্রিক টন। জায়গা থাকা সত্ত্বেও ক্রয় স্থগিত হওয়ায় হাজারো কৃষক সরকারি দামের সুযোগ পাননি। লটারি ও তালিকা প্রণয়নেও অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত চাষিদের নাম লটারিতে না উঠলেও জমি নেই এমন অনেকের নামে সিøপ ইস্যু হয়েছে। অভিযোগ আছে, স্থানীয় মহাজন ও ফড়িয়ারা এসব সিøপ ২ থেকে ৪ হাজার টাকায় কিনে কম দামে কেনা ধান গুদামে দিয়ে মুনাফা করছেন। যার ধান, তার হাতেই পৌঁছায় না সরকারি দামের সুবিধা।

চরের মাটিতে সবুজের ঢেউ : সদর, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে যমুনা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র। এই নদ-নদীগুলোর বুকে জেগে থাকা প্রায় ১৬৫টি চর একসময় পড়ে ছিল অনাদরে। এখন উর্বর পলিমাটির গুণে সেখানে অর্থকরী ফসলের বাম্পার ফলন। এই সম্ভাবনাকে তুলে ধরতে ২০১৮ সালে জেলা প্রশাসন ভুট্টা, মরিচ ও রসমঞ্জুরিকে জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের অন্তর্ভুক্ত করে। সেøাগানটি তাই মুখে মুখে ফেরে— ‘স্বাদে ভরা রসমঞ্জুরির ঘ্রাণ, চরাঞ্চলের ভুট্টা-মরিচ গাইবান্ধার প্রাণ’। চরের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় বদল এনেছে ভুট্টা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ১৩ হাজার ৩০০ হেক্টরের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এবার ১৩ হাজার ৪৪৫ হেক্টরের বেশি জমিতে ভুট্টা চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্য প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার ৬৮২ মেট্রিক টন। কৃষকরা বলছেন, বিঘাপ্রতি ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা খরচ করে ৩৫ থেকে ৪০ মণ ভুট্টা মেলে। কাঁচা গাছ গবাদিপশুর খাদ্য, শুকনা ডাঁটা জ্বালানি; একই ফসলে তাই মেলে বাড়তি স্বস্তি। ভুট্টার পাশাপাশি চরে বাড়ছে মরিচ ও চিনাবাদামের আবাদ। জেলায় ১ হাজার ৭২৫ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষ হয়েছে, উৎপাদন প্রায় ২ হাজার ৮১৩ মেট্রিক টন। ফুলছড়ির পুরোনো উপজেলা সদর মাঠে প্রতি শনি ও মঙ্গলবার বসে ঐতিহ্যবাহী মরিচের হাট, যেখানে দেশের শীর্ষ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন জেলার পাইকাররা সরাসরি কেনাকাটা করেন। প্রায় ২ হাজার ৭৫ হেক্টরে চিনাবাদাম চাষে বিঘাপ্রতি ১৭ থেকে ২০ হাজার টাকা মুনাফা মিলছে বলে কৃষকদের দাবি। বস্তায় আদা ও মালচিং পদ্ধতিতে উচ্চমূল্যের সবজি চাষও শুরু হয়েছে।

নদী যা দেয় নদীই কেড়ে নেয় : নদ-নদীবিধৌত গাইবান্ধা জেলায় বছরের বড় একটি সময় ভাঙন চলে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, গত এক বছরে ১৬২ দশমিক ৩ হেক্টরের বেশি ফসলি জমি নদীগর্ভে গেছে। আবাদি জমি ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫৪৭ হেক্টর থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩৮৫ হেক্টরে। প্রাকৃতিকভাবে ৭৫০ হেক্টর নতুন চর জাগলেও তা চাষের উপযোগী হতে লাগে দীর্ঘ সময়। এর মধ্যেই ভিটেমাটি হারিয়ে অনেক কৃষক রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে শহরের পথে পা বাড়াচ্ছেন। অসময়ের অতিবৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া ও আকস্মিক বন্যায় ধান-সবজির ক্ষতি বাড়ছে। কৃষি মৌসুমে ঘনঘন লোডশেডিং, সেচের বাড়তি খরচ ও কোথাও কোথাও সারের সংকট উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। সাঘাটা ও ফুলছড়িতে ৮৩০ কোটি টাকার নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ চললেও চরবাসীর অভিযোগ, জিও-ব্যাগ ও জিও-টিউবের সাময়িক ঠেকায় টেকসই সমাধান মিলছে না।

পেট ভরে, পুষ্টি জোটে না : উৎপাদনে উদ্বৃত্ত হলেও পুষ্টিতে পিছিয়ে চরাঞ্চল। অনিয়মিত আয় ও দারিদ্র্যের কারণে অনেক পরিবারের পাতে পর্যাপ্ত আমিষ, ফলমূল ও সুষম খাবার ওঠে না। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নারী ও শিশুদের ওপর। ঋতুবদলের সময় নিউমোনিয়া, জ্বর ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুতে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতাল উপচে পড়ে; মেঝে ও বারান্দায় শয্যা পেতে চিকিৎসা নিতে হয়। সম্প্রতি সুন্দরগঞ্জের সর্বানন্দ ইউনিয়নে রোগাক্রান্ত গাভির মাংস ভাগ করে খেয়ে নারী-শিশুসহ অন্তত ২০ জন অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ হয়েছেন। সচেতনতা ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের ছাড়পত্রের অভাবই এর কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। সামাজিক সুরক্ষাতেও ফাটল স্পষ্ট। চার উপজেলার চরাঞ্চলে প্রায় ৩৭ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকে ঝরে পড়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব আর জীবিকার চাপে শিশুরা জড়িয়ে পড়ছে শিশুশ্রমে, কেউ কেউ বাল্যবিয়েতে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় চাল-আটা মিললেও তা দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনে যথেষ্ট নয়।

বিশেষজ্ঞ ও চরবাসীর মতে, শুধু উৎপাদনের পরিসংখ্যান বাড়ালে চলবে না। সবার আগে দরকার স্বচ্ছ ধান ক্রয়। অনলাইন অ্যাপ ও ডিজিটাল ডাটাবেজের মাধ্যমে প্রকৃত চাষির কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনতে পারলে ভুয়া কার্ড ও লটারি সিন্ডিকেট নির্মূল করা সম্ভব। একই সঙ্গে ভুট্টা, মরিচ ও বাদামের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা ও হিমাগার গড়ে তোলার তাগিদ দিচ্ছেন তারা। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমবে, চাষিরা পাবেন ন্যায্য দাম। ভাঙন ঠেকাতে তাদের দাবি, জলবায়ু তহবিলের অর্থে সাঘাটা, ফুলছড়ি, সুন্দরগঞ্জ ও সদরে দায়সারা কাজের বদলে সিসি ব্লক ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হোক, যাতে কৃষিজমি বিলীন হওয়া থামে। পাশাপাশি বন্যা, খরা ও জলাবদ্ধতা সহনশীল ধান ও রবিশস্যের বীজ স্বল্পমূল্যে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং আধুনিক সেচ ও কৃষি প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ বাড়ানোও জরুরি। সামাজিক সহায়তায় দানাশস্যের পাশাপাশি অণু পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার ও স্বাস্থ্যসেবা যুক্ত করার কথা বলছেন তারা। দুর্গম চরে স্কুল ও শিক্ষকদের আবাসন জোরদার করা গেলে ঝরে পড়ার হারও কমবে।

যারা দেশের মানুষের পাতে ভাত তোলেন, তাদের থালায়ও যেন ন্যায্য দাম আর পুষ্টিকর খাবার পৌঁছায়, এই দাবিই এবারের খাদ্য দিবসে গাইবান্ধার চরের। কৃষক বাঁচলে খাদ্য নিরাপত্তাও বাঁচবে। তাদের কঠোর পরিশ্রমকে রাষ্ট্রীয় নীতি ও বাজারব্যবস্থার সমন্বয়ে সুরক্ষা দিতে পারলে গাইবান্ধা শুধু খাদ্য উৎপাদনে নয়, সুষম পুষ্টি ও সমৃদ্ধ গ্রামীণ অর্থনীতিরও আদর্শ মডেল হয়ে উঠতে পারে।

সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   বিশ্ব খাদ্য দিবস  গোলাভরা ধান  খালি হাত  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: