ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর ঝলমলে আলোকসজ্জায় উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে গোপালগঞ্জে। মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তদের আনাগোনা, প্রতিমা দর্শন আর নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) মহাষষ্ঠীর পূজার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এ উৎসব জেলার পাঁচ উপজেলা ও চার পৌরসভার ১ হাজার ২৮৮টি মণ্ডপে উদ্যাপিত হচ্ছে।
কৈলাশ ছেড়ে মর্ত্যে পিতৃগৃহে এসেছেন দেবী দুর্গা। তার সঙ্গে রয়েছেন চার সন্তান—গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী ও সরস্বতী। ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এ উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে আগামী বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে।
দুর্গোৎসবের প্রাক্কালে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) পঞ্চমীর সন্ধ্যায় মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীর বোধন ও বন্দনা অনুষ্ঠিত হয়। পুরাণ অনুসারে, দক্ষিণায়নে নিদ্রিত দেবী দুর্গার নিদ্রা ভাঙানোর জন্য বোধনের মাধ্যমে তার আরাধনা করা হয়। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টায় মহাষষ্ঠীতে ষষ্ঠীবিহিত পূজা, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল আনুষ্ঠানিকতা।
এ বছর সপ্তমী তিথি দুই দিন হওয়ায় ছয় দিন ধরে চলবে দুর্গোৎসব। শনিবার ও রোববার মহাসপ্তমী, সোমবার মহাষ্টমী, মঙ্গলবার মহানবমী এবং বুধবার বিজয়া দশমীর পূজা অনুষ্ঠিত হবে। শনিবার সপ্তমীতে মণ্ডপে দেবী দুর্গার মুখ উন্মোচন ও পূজার আনুষ্ঠানিকতা ঘিরে ভক্তদের মধ্যে বাড়তি উৎসাহ দেখা যাবে।
বৃহস্পতিবার রাত থেকেই গোপালগঞ্জ শহরের মণ্ডপগুলোতে উৎসবের আমেজ জমে ওঠে। মন্দির প্রাঙ্গণে তৈরি করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন প্যান্ডেল, প্রবেশপথ ও আলোকসজ্জা। প্রতিটি মণ্ডপের সাজসজ্জায় রয়েছে ভিন্নতা। ঝলমলে আলোয় সজ্জিত মণ্ডপগুলোতে দেবী দর্শনে আসছেন ভক্ত ও দর্শনার্থীরা। কেউ প্রতিমার সঙ্গে ছবি তুলছেন, কেউ প্রণাম করছেন, আবার কেউ নাচ-গানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করছেন আনন্দ। মণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, ত্রেতাযুগে স্ত্রী সীতাকে উদ্ধারের জন্য ভগবান রাম দেবী দুর্গার অকালবোধন করেছিলেন। ব্রহ্মার নির্দেশনা অনুযায়ী দেবীর আরাধনা করে রাবণকে বধ ও সীতাকে উদ্ধার করেন তিনি। শরৎকালে রামের এই দেবী আহ্বানের স্মৃতি থেকেই শারদীয় দুর্গাপূজার প্রচলন বলে ধর্মীয় বিশ্বাসে উল্লেখ রয়েছে। শরৎকালে দেবীকে জাগ্রত করার এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় অকালবোধন।
গোপালগঞ্জ জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় সিকদার বলেন, সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়ার দিন কন্যারূপে ধরায় আসেন দশভূজা দেবী দুর্গা। বিসর্জনের মধ্য দিয়ে তাকে এক বছরের জন্য বিদায় জানানো হয়। তার আগমন ও প্রস্থানের মধ্যবর্তী সময়ে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত দুর্গোৎসবের আয়োজন চলে।
শহরের সাহাপাড়া মন্দিরের পুরোহিত দীপংকর চক্রবর্তী বলেন, পঞ্জিকামতে, এবার দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যে এসেছেন। এর ফল ‘ছত্রভঙ্গ’, যার অর্থ সামাজিক, রাজনৈতিক বা সামরিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা বাড়তে পারে। দেবী বিদায় নেবেন নৌকায়। এর ফল ‘শস্যবৃদ্ধিস্তথা জলম’, অর্থাৎ প্রচুর শস্য উৎপাদন এবং ভালো বর্ষণের ইঙ্গিত বহন করে বলে ধর্মীয় বিশ্বাস রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শাস্ত্র অনুযায়ী দেবীর আগমন ও গমনের বাহন এক হলে তা অশুভ বলে বিবেচিত হয়। এ বছর আগমনের বাহন ঘোড়া ও গমনের বাহন নৌকা আলাদা। তবে ভক্তদের আরাধনায় দেবী তুষ্ট হলেই বিশ্বে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠিত হবে বলে তার বিশ্বাস।
গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজের স্নাতক (সম্মান) শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী অরিন্দম সরকার বলেন, পঞ্চমীর রাতে তিনি শহরের ১০টি মণ্ডপ ঘুরেছেন। সব মণ্ডপের সাজসজ্জা তার ভালো লেগেছে। মণ্ডপগুলোতে উৎসবের আমেজের পাশাপাশি ভক্তিপূর্ণ পরিবেশও তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
জেলার পাঁচ উপজেলা ও চার পৌরসভার ১ হাজার ২৮৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উৎসবের আবহ বিরাজ করছে। পূজা, আরাধনা ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে আগামী বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব।
সময়ের আলো/জোই