রংপুরে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ছে, রমেকে নেই রেডিওথেরাপি

সাইফুল ইসলাম, রংপুর ব্যুরো

সারাদেশ

স্তনে গুটি বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলেও লজ্জা, ভয় ও সামাজিক সংকোচে অনেক নারী চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন। কারও

2026-10-16T15:59:04+00:00
2026-10-16T15:59:04+00:00
 
  শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬,
৩১ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
রংপুরে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ছে, রমেকে নেই রেডিওথেরাপি
সাইফুল ইসলাম, রংপুর ব্যুরো
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৫৯ পিএম 
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ছবি : সংগৃহীত
স্তনে গুটি বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলেও লজ্জা, ভয় ও সামাজিক সংকোচে অনেক নারী চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন। কারও মধ্যে আবার স্তন ক্যান্সার মানেই মৃত্যু—এমন ভ্রান্ত ধারণা কাজ করে। ফলে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হচ্ছে, অনেক রোগী হাসপাতালে আসছেন জটিল অবস্থায়। এতে চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ছে, বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি। অন্যদিকে, উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে স্তন ক্যান্সারের অস্ত্রোপচার ও কেমোথেরাপি চালু থাকলেও নেই রেডিওথেরাপি মেশিন। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দিতে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছেন চিকিৎসকেরা।

সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত প্রায় ১ হাজার ২০০ রোগীর অস্ত্রোপচার হয়েছে। হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে এ রোগের চিকিৎসার বড়ো একটি অংশজুড়ে রয়েছে এসব অস্ত্রোপচার। বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসার এই চিত্র একদিকে স্তন ক্যান্সার মোকাবিলায় হাসপাতালটির গুরুত্ব তুলে ধরছে, অন্যদিকে রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক চিকিৎসাসুবিধা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তাও সামনে আনছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্তন ক্যান্সার মানেই মৃত্যু নয়। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করে যথাযথ চিকিৎসা নেওয়া গেলে অনেক রোগী সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। কিন্তু উপসর্গ গোপন রাখা, কুসংস্কার এবং চিকিৎসা নিতে দেরি করার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই রোগ জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তাই সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সব সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।

গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রংপুর মেডিকেল কলেজের সার্জারি বিভাগের আয়োজনে ‘স্তন ক্যান্সার সচেতনতা মাস’ উপলক্ষ্যে দিনব্যাপী কর্মসূচিতে এসব বিষয় তুলে ধরেন চিকিৎসকেরা। সকালে কলেজ প্রাঙ্গণে বেলুন উড়িয়ে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আনোয়ার হোসেন।

সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. শরিফুল ইসলাম নন্তুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান, কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. জহিরুল হক এবং সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সৈয়দা শাহনাজ নাসরুল্লাহ ইলোরাসহ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা। এ সময় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে স্তন ক্যান্সার থেকে সুস্থ হওয়া কয়েকজন নারী নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

লজ্জা ও অবহেলায় দেরিতে শনাক্ত হচ্ছে রোগ

চিকিৎসকদের ভাষ্য, স্তন ক্যান্সারের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরও অনেক নারী সামাজিক সংকোচ, ভয় ও অসচেতনতার কারণে চিকিৎসা নিতে চান না। কেউ স্তনে গুটি বা চাকা অনুভব করেও বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেন না। আবার অনেকে পরিবারের সদস্যদের কাছে বিষয়টি প্রকাশ করতেও অস্বস্তি বোধ করেন। এসব কারণে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, স্তন ক্যান্সার হলে মানুষ মারা যায়—সমাজে এমন একটি ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। অথচ যথাসময়ে শনাক্ত করে উপযুক্ত চিকিৎসা নেওয়া হলে রোগীরা সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

তিনি বলেন, স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত এক বছরে প্রায় ১ হাজার ২০০ স্তন ক্যান্সার রোগীর অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। এ রোগ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং উপসর্গ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

চিকিৎসকদের মতে, রোগ শনাক্ত হতে দেরি হলে চিকিৎসার ধরন আরও জটিল হতে পারে। রোগের পর্যায়, শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় তখন দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। তাই লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

স্তনে গুটি মানেই ক্যান্সার নয়, পরীক্ষা জরুরি

স্তনে নতুন কোনো গুটি বা চাকা, আকার কিংবা আকৃতিতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন, ত্বকে টান বা পরিবর্তন, নিপল ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া কিংবা নিপল থেকে অস্বাভাবিক স্রাব—এসব লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে স্তনে গুটি হলেই ক্যান্সার হয়েছে, এমন নয়। বিভিন্ন কারণে স্তনে গুটি বা পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া এর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে বয়স বা অন্য কোনো বিষয় বিবেচনায় নিজে থেকে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

স্তন ক্যান্সার শনাক্ত করতে চিকিৎসকের শারীরিক পরীক্ষা, প্রয়োজন অনুযায়ী ইমেজিং এবং বায়োপসির মতো পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি বিবেচনায় চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন। স্তনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে পরবর্তী মাসিক পর্যন্ত অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

রমেকে রেডিওথেরাপি নেই, পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসায় সীমাবদ্ধতা

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের বহির্বিভাগে স্তন ক্যান্সার রোগীদের পরামর্শ ও প্রাথমিক মূল্যায়নের জন্য একটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। সেখানে স্তন পরীক্ষা, স্ক্রিনিং-সংক্রান্ত পরামর্শ এবং রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। হাসপাতালটিতে স্তন ক্যান্সার রোগীদের অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি কেমোথেরাপি কার্যক্রমও চালু রয়েছে।

তবে রেডিওথেরাপি মেশিন না থাকায় স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি রয়ে গেছে। রোগের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী অনেক রোগীর চিকিৎসায় রেডিওথেরাপির প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে স্তন সংরক্ষণমূলক অস্ত্রোপচারের পর রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়। এ সুবিধা না থাকলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সম্পন্ন করতে রোগীদের অন্য প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।

চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেডিওথেরাপি সেবা চালু, আধুনিক রোগনির্ণয়ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা গেলে রংপুরসহ আশপাশের জেলার রোগীরা উপকৃত হবেন। এতে উন্নত চিকিৎসার জন্য দূরের হাসপাতালে যাতায়াতের চাপ ও ভোগান্তিও কমতে পারে।

সচেতনতাই বাঁচাতে পারে জীবন

স্তন ক্যান্সার সচেতনতা মাসের কর্মসূচিতে চিকিৎসকেরা এ রোগ নিয়ে ভয়, লজ্জা ও সামাজিক সংকোচ দূর করার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে, পরিবার, সমাজ ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের সম্মিলিত উদ্যোগে নারীদের জন্য এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে তাঁরা কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে নির্দ্বিধায় চিকিৎসা নিতে পারেন।

স্তন ক্যান্সারের সব ঝুঁকি প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও উপসর্গ সম্পর্কে ধারণা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে রোগের জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি কমানো সম্ভব। এ জন্য সচেতনতা কার্যক্রমকে হাসপাতাল ও শহরকেন্দ্রিক উদ্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গ্রামপর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।

রংপুর অঞ্চলে স্তন ক্যান্সার মোকাবিলায় তাই দুটি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ—একদিকে রোগের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়িয়ে চিকিৎসা নিতে দেরি করার প্রবণতা কমানো, অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় আধুনিক চিকিৎসাসুবিধা নিশ্চিত করা। দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, সহজলভ্য চিকিৎসা ও রেডিওথেরাপির মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা সম্প্রসারণ করা গেলে আরও অনেক নারীকে সুস্থ জীবনে ফেরার সুযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।

সময়ের আলো/এনএন
  বিষয়:   স্তন ক্যান্সার  রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল  রমেক  ক্যান্সার চিকিৎসা  রেডিওথেরাপি  নারীস্বাস্থ্য  স্বাস্থ্যসেবা  ক্যান্সার সচেতনতা  রংপুর  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: