সরকারবিরোধী চক্রান্ত, সহিংসতায় উসকানি, অবৈধ অর্থায়ন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের অভিযোগে করা মামলায় অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তা কাজী গুলশান আরা ও বিজয় দেবাশীষ নারায়ন পালকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। চার দিনের রিমান্ড শেষে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান এ আদেশ দেন।
কারাগারে আটক রাখার আবেদন করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের পরিদর্শক শেখ বশির আহমেদ জানান, রিমান্ডে আসামিদের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অভিযোগের বিষয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদ এবং ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে পরবর্তী সময়ে তাদের আবারও রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হতে পারে।
এর আগে গত সোমবার (১২ অক্টোবর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলমের আদালত তাদের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা তাদের সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছিলেন।
গত রোববার (১১ অক্টোবর) রাতে পল্লবী জোনাল টিমের একটি দল অভিযান চালিয়ে রাত সাড়ে ১২টার দিকে নিজ বাসা থেকে লেফটেন্যান্ট (অব.) কাজী গুলশান আরাকে গ্রেফতার করে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাত আড়াইটার দিকে বনানীর বাসা থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) দেবাশীষকে গ্রেফতার করা হয়।
শুক্রবারের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কাওসার আহমেদ আসামিদের জামিনের বিরোধিতা করেন। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. আতাউর রহমান খান রুকু ও মো. মশিউর রহমান জামিনের পক্ষে যুক্তি দেন। শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন নাকচ করে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী আতাউর রহমান খান রুকু বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলার অভিযোগে যা বলা হয়েছে
মামলার এজাহার অনুযায়ী, আসামিরা পল্লবীতে কাজী গুলশান আরার বাসায় অবস্থান করে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাপোর্টার্স আলফা ১’ ও ‘বিবিএম ট্রান্সপারেন্সি’ নামের প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরকারবিরোধী হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তহবিল সংগ্রহ এবং সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
এজাহারে আরও বলা হয়, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ‘ইউনিটি কেয়ার অ্যান্ড পাবলিক পার্লামেন্ট’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন আসামিরা।
এ ছাড়া ‘আজকাল ডটকম’ নামে একটি পেজ খুলে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে উসকানিমূলক কনটেন্ট প্রচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। কাজী গুলশান আরার ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম প্রচার ও পরিচালনা করা হতো বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারের তথ্যমতে, ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর জাতীয় নির্বাচনের আগে দেড় শতাধিক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি প্রকাশ্যে আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন কাজী গুলশান আরা। পরে সহযোগীদের নিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু সেনা পরিষদ’ নামে একটি কমিটি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।
ওই সংগঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়ানো, দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টকশোতে সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও অবজ্ঞা ছড়ানোর অভিযোগ করা হয়েছে। এজাহারে আরও দাবি করা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আসামিরা সহযোগীদের নিয়ে সরকার ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং কুৎসামূলক প্রচার চালিয়ে আসছিলেন। তাঁদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি গুপ্তচরদের যোগাযোগ থাকার অভিযোগও রয়েছে।
এসব অভিযোগে পল্লবী থানার পুলিশ পরিদর্শক মো. আলী আকবার দণ্ডবিধির ১২৪ক ধারা, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের আওতায় মামলাটি করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ১০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ