কওমি মাদরাসার আদর্শিক সংকট ও উত্তরণের পথ

অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী পীর সাহেব দেওনা

ইসলাম

আল্লাহ তায়ালা কোনো জাতিকে সম্মান, মর্যাদা ও প্রভাব দান করেন তাদের ঈমান, আমল, চরিত্র, আল্লাহ পাকের সঙ্গে সম্পর্ক এবং দায়িত্ব

2026-10-17T02:25:07+00:00
2026-10-17T02:25:07+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
ইসলাম
কওমি মাদরাসার আদর্শিক সংকট ও উত্তরণের পথ
অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী পীর সাহেব দেওনা
প্রকাশ: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ২:২৫ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
আল্লাহ তায়ালা কোনো জাতিকে সম্মান, মর্যাদা ও প্রভাব দান করেন তাদের ঈমান, আমল, চরিত্র, আল্লাহ পাকের সঙ্গে সম্পর্ক এবং দায়িত্ব পালনের ভিত্তিতে। তারা যখন নিজেদের দায়িত্ব ও বৈশিষ্ট্য থেকে দূরে সরে যায়। তখন ধীরে ধীরে তাদের মর্যাদার কারণগুলোও বিলুপ্ত হতে থাকে। তাই কওমি মাদরাসার বর্তমান সংকটের কারণ ও উত্তরণের পথ নির্ধারণ করতে হলে শুধু বাহ্যিক কারণ নয়, আমাদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলোর দিকেও তাকাতে হবে। 

কওমি মাদরাসার প্রকৃত পরিচয় : উপমহাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোর সবচেয়ে মূল্যবান ঐতিহ্য হলো, আকাবিরে দেওবন্দের চিন্তা-চেতনা, দ্বীনি মেজাজ, ইখলাস, তাকওয়া, সুন্নাহর অনুসরণ, আল্লাহমুখী জীবন এবং দ্বীনের খেদমতের মানসিকতা। কওমি মাদরাসার বৈশিষ্ট্য শুধু তার সিলেবাস বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে নয় বরং এসব প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হলো ইলমের গভীরতা, আমলে সৌন্দর্য, আল্লাহভীতি, ইখলাস ও দ্বীনের জন্য ত্যাগী ব্যক্তিত্ব তৈরি করা।

সনদ নয়, যোগ্য ও মুত্তাকি আলেম তৈরি : কওমি মাদরাসার মূল লক্ষ্য সনদের স্বীকৃতি আদায় কিংবা সার্টিফিকেট অর্জন নয়। বরং এর লক্ষ্য হচ্ছে, এমন যোগ্য মুত্তাকি ও দূরদর্শী আলেম তৈরি করা— যারা কুরআন-সুন্নাহ গভীরভাবে অনুধাবন করে দ্বীনের প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং সমাজের নতুন নতুন সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম হবেন। আকাবিরে দেওবন্দের অনেক আলেম শিক্ষা সমাপনান্তে কোনো সনদই গ্রহণ করেননি। কারণ তাদের লক্ষ্য কোনো সনদ ছিল না বরং তাদের লক্ষ্য ছিল নিজেকে যোগ্য ও মুত্তাকি আলেম হিসেবে গড়ে তোলা এবং নিজেকে দ্বীনের একজন সাচ্চা খাদেম হিসেবে গড়ে তোলা। 

সনদের স্বীকৃতি ও কর্মসংস্থান : সনদের স্বীকৃতি, উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই বিবেচনাযোগ্য। কিন্তু স্বীকৃতির নামে যদি কওমি মাদরাসার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা ক্ষুণ্ন হয়, দারুল উলুম দেওবন্দের আদর্শ মূলনীতি ও মত-পথের এবং বিদ্যমান আইনের পরিপন্থী হয় তা হলে সে স্বীকৃতি কওমি মাদরাসার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। কারণ আমাদের প্রধান চিন্তা হচ্ছে, ইলম, আমল, আখলাক ও যোগ্যতার সমন্বয়ে প্রকৃত মুত্তাকি আলেম তৈরি করা। পদ পজিশনের স্বার্থে আমাদের বিচ্যুতি কওমি মাদরাসার স্বকীয়তা বিনষ্ট ও ভবিষ্যৎ  লক্ষ্যচ্যুত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা অনিবার্য । 

স্বকীয়তা ও যুগ সচেতনতা : এর অর্থ আবার এমনটি নয় যে, কওমি মাদরাসার আলেমগণ যুগের পরিবর্তন ও সমকালীন সমস্যার ব্যাপারে অসচেতন থাকবেন। বরং কুরআন-সুন্নাহ ও ইসলামী ফিকহের আলোকে যুগের নতুন সমস্যা অনুধাবন এবং তার সমাধান দেওয়ার মতো যোগ্য আলেম তৈরি করাও জরুরি। যে ব্যক্তি নিজের যুগ ও সমকালীন মানুষের অবস্থা সম্পর্কে অবগত নয় তার জ্ঞান অসম্পূর্ণ। এই কথাটি আমাদের বিশেষভাবে স্মরণ রাখতে হবে। একইভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বা কর্মসংস্থানের উপযোগী করে শিক্ষা কারিকুলামকে আধুনিকায়নের নামে ঢেলে সাজালে দ্বীনি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। কওমি মাদরাসার স্বকীয়তা, নিজস্ব সিলেবাস, বাহ্যিক কাঠামো, ইখলাস, তাকওয়া, সুন্নাহর অনুসরণ, ইলমের গভীরতা ও আকাবিরে দ্বীনের রেখে যাওয়া আমানত রক্ষা করা দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। 

সনদের স্বীকৃতি ও কর্মসংস্থানের বৈষম্য : ২০১৮ সালে আইন পাসের মাধ্যমে দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল)-এর সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রির— ইসলামী স্টাডিজ ও আরবি সমমানের স্বীকৃতি দেওয়া হলেও, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কওমি আলেমদের সে অনুযায়ী মর্যাদা প্রদান করা হয়নি। একই মানের বা কখনো তুলনামূলক কম মানের সনদধারীরা যেখানে উচ্চতর গ্রেড ও পদোন্নতির সুযোগ পান, সেখানে কওমি আলেমদের চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ খুবই সীমিত রাখা হয়েছে। 

এনটিআরসিএ নিবন্ধন পরীক্ষায়ও কওমি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বাস্তব সমস্যা রয়েছে। তাদের মূল শিক্ষার বিষয় কুরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকাহ, আরবি, উর্দু, ফার্সি, নাহু-সরফ ইত্যাদি। কিন্তু সাধারণ পরীক্ষায় তাদের বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও সাধারণ জ্ঞানের ওপর প্রতিযোগিতা করতে হয়। 

এতে একটি বিশেষায়িত দ্বীনি শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষার্থীদের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়। মূলত অবাস্তব জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের বঞ্চিত অপবাদের একটি ফাঁদ পাতা হয়েছে। এ বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ছাড়া সহ-শিক্ষা বা এমন কর্ম পরিবেশ, যেখানে কওমি আলেমদের পর্দা ও দ্বীনি আদর্শ লালন করা কঠিন। সেখানে কওমি আলেমদের চাকরির সুযোগ নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের ইমান আমল ও ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।

মূল কিতাবকেন্দ্রিক শিক্ষা ফিরিয়ে আনা : কওমি মাদরাসার ঐতিহ্য ছিল মূল কিতাবকে কেন্দ্র করে ইলম চর্চা করা। শুধু নোট বা অনুবাদ নির্ভর পড়াশোনা নয়। বরং ইবারত পাঠ, নাহু-সরফের যথাযথ প্রয়োগ, মূল আরবি থেকে সরাসরি অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করার যোগ্যতা অর্জন করা। কিন্তু বর্তমানে নোট নির্ভরতা, অনুবাদনির্ভর পড়াশোনা, গাইড বুকের ব্যাপকতার কারণে ছাত্রদের মূল কিতাবের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে। তাই মূল কিতাবকে শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে হবে, যাতে করে ছাত্রদের আরবিতে এমন দক্ষতা তৈরি হয় যে— তার পাঠের বইতে ও যেকোনো আরবি সে হরকত ছাড়া পড়তে, অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়। 

দাওরায়ে হাদিস দুই বছর করা : দাওরায়ে হাদিসের সময়সীমা এক বছর নিয়ে পুনর্বিবেচনা জরুরি। এত অল্প সময়ে সিয়াহ-সিত্তার বিশাল হাদিস ভান্ডার যথাযথভাবে পড়ানো ও বোঝানো কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের ওপরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। বুখারি শরিফসহ গুরুত্বপূর্ণ কিতাবগুলো তাড়াহুড়ো করে শেষ করতে হয়। ত্বহাবি শরিফ, মুয়াত্তায়ে ইমাম মালেক (রহ.), মুয়াত্তায়ে ইমাম মুহাম্মদ রহ. কিতাবগুলোর জন্য আরও বেশি সময় বরাদ্দ করা দরকার। তাই দাওরায়ে হাদিসকে দুই বছরে বিভক্ত করা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

লেখক : নায়েবে আমির, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ
  বিষয়:   কওমি মাদরাসা  আদর্শিক সংকট  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: