জ্বালানির উৎস বহুমুখী করার ক্ষেত্রে পারমাণবিক বিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে। তুলনামূলক অল্প পরিমাণ পারমাণবিক জ্বালানি দিয়ে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতার প্রভাব এ কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয়ে তুলনামূলক কম পড়তে পারে। তবে জ্বালানি আমদানির নির্ভরতা পুরোপুরি দূর হবে না; বরং নির্ভরতার ধরন বদলাবে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ও মহাপরিকল্পনার বাস্তব রূপ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী আগামী নভেম্বরেই এই প্রকল্প থেকে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও প্রযুক্তিগতভাবে জটিল এই অবকাঠামোর কার্যক্রম শুরু হওয়া কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় নয়; বরং এটি দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, অর্থনৈতিক গতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
বিগত বছরগুলোতে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা কাগজে-কলমে বহুগুণ বাড়লেও জ্বালানি সংকটের কারণে প্রকৃত উৎপাদন বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহস্থালি— সব ক্ষেত্রেই লোডশেডিংয়ের অভিজ্ঞতা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ব্যাহত করেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে বিদ্যুৎ সরবরাহে স্থিতিশীলতা বাড়বে বলে আশা করা যায়। প্রচলিত তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহের প্রয়োজন না হওয়ায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। ফলে রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়া দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনও গ্যাস, কয়লা ও আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। দেশীয় গ্যাসের মজুদ কমে আসায় সরকারকে উচ্চমূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি তেল আমদানি করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ জাতীয় অর্থনীতির জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানির উৎস বহুমুখী করার ক্ষেত্রে পারমাণবিক বিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে। তুলনামূলক অল্প পরিমাণ পারমাণবিক জ্বালানি দিয়ে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতার প্রভাব এ কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয়ে তুলনামূলক কম পড়তে পারে। তবে জ্বালানি আমদানির নির্ভরতা পুরোপুরি দূর হবে না; বরং নির্ভরতার ধরন বদলাবে। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারমাণবিক বিদ্যুতের পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে কম কার্বন নিঃসরণভিত্তিক রূপান্তরের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কয়লা, তেল ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়।
বিপরীতে, পারমাণবিক চুল্লিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় সরাসরি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হয় না বললেই চলে। তবে ইউরেনিয়াম উত্তোলন, জ্বালানি প্রস্তুত, কেন্দ্র নির্মাণ, পরিচালনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ পুরো জীবন চক্রের নিঃসরণ বিবেচনায় নিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মতো সংকট বাংলাদেশের কৃষি, জীবিকা ও অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় উন্নয়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশের ওপর চাপ কমানোও জাতীয় স্বার্থের অংশ। রূপপুরের দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১২০০ মেগাওয়াট। পূর্ণ সক্ষমতায় কেন্দ্রটি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ যুক্ত হবে।
পারমাণবিক বিদ্যুতের আরেকটি সুবিধা হলো, আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের তুলনায় এটি দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীলভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সঙ্গে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা গেলে বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা বাড়বে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে এসব পরিবেশগত সুফল নিশ্চিত করতে পারমাণবিক নিরাপত্তা, তেজস্ক্রিয় বর্জ্যরে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, নদীর পানির সুরক্ষা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নিরাপত্তাব্যবস্থায় সামান্য অবহেলাও বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। চেরনোবিল ও ফুকুশিমার দুর্ঘটনা এ বিষয়ে বিশ্বকে সতর্ক করেছে।
রূপপুরে রাশিয়ায় নির্মিত ভিভিইআর-১২০০ ধরনের চুল্লি ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে একাধিক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। তা সত্ত্বেও শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে কেন্দ্র পরিচালনার প্রতিটি পর্যায়ে কঠোর নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নির্দেশনা মেনে চলার পাশাপাশি ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্যরে ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত চুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ মানুষের ঘরে ও শিল্প-কারখানায় পৌঁছাতে না পারলে বিপুল বিনিয়োগের সুফল পাওয়া যাবে না। একসঙ্গে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে সঞ্চালন লাইন ও উপকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি। পদ্মা নদী অতিক্রম করে ঢাকাসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার জন্য নির্মীয়মাণ সঞ্চালন অবকাঠামো যথাসময়ে প্রস্তুত করতে হবে। সঞ্চালনব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে যেন জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয় না ঘটে, সেদিকে কঠোর নজর রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা, উৎপাদন ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে গ্রিড ব্যবস্থাপনা আধুনিক করা জরুরি।
রূপপুরের নির্মাণব্যয় ও রাশিয়ার ঋণ পরিশোধের বিষয়টিও জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। প্রকল্প চালু হওয়ার পর পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুতের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ হবে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে ঋণ পরিশোধের দায় মেটাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ মাশুলের চাপ না পড়ে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকৃত ব্যয়, ঋণের কিস্তি, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতের অন্যান্য ব্যয় ও অপচয় কমানোর উদ্যোগও নিতে হবে।
এই প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য দেশীয় দক্ষ জনবল গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চপ্রযুক্তির এ বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় বর্তমানে বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীদের সহায়তা প্রয়োজন হচ্ছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে কেন্দ্রটির পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের নিজস্ব বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও কারিগরি দলকে সক্ষম করে তুলতে হবে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশি তরুণ প্রকৌশলীদের বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা ইতিবাচক। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিশিক্ষার পরিধি বাড়ানো, গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি এবং দক্ষ জনবল তৈরির ধারাবাহিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এতে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমবে এবং দেশীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়বে।
রূপপুর প্রকল্পের সুফল বাড়াতে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা যেতে পারে। দ্বিতীয় ইউনিট চালু হওয়ার পর উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা, বিশেষত কম চাহিদার মৌসুমে, গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সে ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো, অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্যের সুযোগ পর্যালোচনা করা যেতে পারে। তবে এ ধরনের উদ্যোগের আগে দেশের নিজস্ব চাহিদা, সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা, আর্থিক লাভ এবং আঞ্চলিক চুক্তির শর্তগুলো সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে।
রূপপুর প্রকল্পের প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়; এটি স্থানীয় অবকাঠামো ও আঞ্চলিক অর্থনীতির বিকাশেও ভূমিকা রাখতে পারে। প্রকল্পকে কেন্দ্র করে পাবনা ও আশপাশের এলাকায় যোগাযোগ, আবাসন, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এসব ইতিবাচক প্রভাব টেকসই করতে স্থানীয় মানুষের দক্ষতা উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং পরিকল্পিত শিল্পায়নের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। উৎপাদিত বিদ্যুতের সুবিধা কাজে লাগিয়ে সম্ভাবনাময় শিল্প গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়বে এবং জাতীয় অর্থনীতিও উপকৃত হবে। তবে এ ক্ষেত্রে পরিবেশ সুরক্ষা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
যেকোনো বৃহৎ প্রকল্পের সার্থকতা নির্ভর করে জনকল্যাণে তার অবদানের ওপর। রূপপুর থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে শিল্প-কারখানায় পৌঁছালে উৎপাদন ব্যয় কমানো ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার সুযোগ তৈরি হবে।
একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি কমিয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষও এ প্রকল্পের সুফল পাবে। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিরাপত্তা, আর্থিক শৃঙ্খলা, পরিবেশ সুরক্ষা, দক্ষ জনবল এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। রূপপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সূচনা বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। যথাযথ পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীল পরিচালনার মাধ্যমে এ সম্ভাবনাকে বাস্তব জনকল্যাণে রূপান্তর করাই এখন প্রধান কাজ।
লেখক : সাংবাদিক ও সমাজ গবেষক
*মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/জেডআই